হায়রে, মানবজনম!

Post ID # 027

বসুন্ধরা সিটির সাত তলায় কেনাকাটা করছি।
এক সিকিউরিটি গার্ডকে চোখে পড়লো। কম দামি মোবাইল ফোনের ক্যামেরায় শপিং মলের ভিডিও করছে। চলন্ত সিঁড়ি, গম্বুজাকৃতির ছাদ, বাদ যাচ্ছে না আলো ঝলমলে বাতিও । পুরো উপমহাদেশজুড়ে যে হারে জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটছে তাতে চোখের সামনে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ভিডিও হতে দেখলে বুকের ভেতর ছ্যাৎ করে ওঠে!
পেশায় সাংবাদিক তাই কৌতুহলও বেশি। লোকটার কাছে গিয়ে জানতে চাইলাম, ঘটনা কী ভাই?
লোকটা চমকে উঠে আমার দিকে তাকালো। বয়স ত্রিশের কোটা পেরোয়নি মনে হয়। চোখেমুখে অবাক এক সারল্য। কাচুমাচু ভঙিতে লোকটা বললো, ভিডিও করতেছি স্যার!
আমি বললাম, তাতো দেখতেই পাচ্ছি। কিন্তু কেন ভিডিও করছেন?
লোকটা এই কথার কোন জবাব দিলো না অথবা দিতে চাইলো না। মাথা নিচু করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো। ভঙিটা এমন যেন বড় কোন অপরাধ করেছে। এবার আমার একটু খারাপই লাগলো। স্মার্ট ফোনের এই যুগে যে কেউ যে কোন কিছুই দেদারসে ক্যামেরাবন্দী করছে। কেউ তো বাধা দিচ্ছে না। সমাজের নিচু স্তরের বলেই কী আমি তার ব্যাপারে বাধা দিচ্ছি? উচু স্তরের কেউ হলে কী আমার এই কৌতুহল হতো?
এইসব ভাবনা পাশ কাটিয়ে আমি লোকটার নাম জানতে চাইলাম। বললো, আশরাফ।
পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে আমি হেসে দিয়ে বললাম, ঘাবড়ানোর কিছু নাই। এমনিতেই জানতে চাইলাম। বাড়ি কই, এখানে কী করেন?
আশরাফ বললেন, আমাগের বাড়ি যশোর। এইখানে এটিএম বুথের সিকিউরিটি গার্ডের চাকরি করি।
‘ঠিকাছে ভিডিও করেন’ বলে আর কথা বাড়ালাম না। চলে যেতে উদ্যত হতেই আশরাফ নিজ থেকেই বলতে শুরু করলেন, আসলে স্যার, আগে আমার কোন ক্যামেরা মোবাইল আছিল না। এই মোবাইল নতুন কিনছি।
আমি বললাম, বুঝতে পারছি, এজন্যই যা দেখছেন তাই ভিডিও করছেন। আমি যেবার প্রথম দামি ফোন কিনেছিলাম, আমিও করেছি। অসুবিধা নাই আশরাফ, আপনি আপনার কাজ করেন।
আশরাফ লজ্জায় লাল হয়ে গিয়ে বললেন, না না স্যার। সেই কারণে না। ভিডিও করার অন্য কারণ আছে।
আমি এবার থমকে দাঁড়ালাম। বললাম, অন্য কী কারন?
আশরাফ বাধো বাধো গলায় বললেন, আমি আসলে নতুন বিয়া করছি। বউ থাকে গিরামে। সে শুনছে বড় মার্কেটে চাকরি করি। শুনছে, এই মার্কেটের সিঁড়ির উপর দাঁড়াইলে আপনা-আপনিই মানুষ উপরের দিকে উইঠা যায়। হাটা লাগে না। সে তাজ্জাব হয়া গেছে। আমার বউ কোনদিন এতো বড় মার্কেট দ্যাখে নাই। তাই আমারে বলছে, আমি যেন সব কিছু ভিডিও কইরা নিয়া আসি। সে বইসা বইসা সব দেখবে। তাই আমি ভিডিও করতেছি স্যার। আমার তো তেমন টাকা পয়সা নাই। টাকা পয়সা হইলে একদিন স্বশরীরে তারে এইখানে নিয়া আসার ইচ্ছা আছে!
আশরাফের এই গল্প শুনে আমি কোন কথা বলতে পারলাম না। ভালোলাগার একটা শীতল স্রোত কেবল বয়ে গেল বুকের গহীনে। মনটা ভরে গেল অপার এক মুগ্ধতায়। আমি মুগদ্ধতা নিয়ে তাকিয়ে রইলাম লজ্জাবনত আশরাফের দিকে…!
আমাদের আশে-পাশে মুগ্ধ হবার এমন কতো-শতো ভালোবাসার গল্প আছে, কত যে মমতার গল্প আছে, ইতিবাচক জীবনের গল্প আছে- আমরা তার খোঁজ রাখি না। বিপুল কৌতুহলে আমরা খোঁজ রাখি, চারিধারের ভালোবাসাহীন, মমতাহীন কুৎসিত সব গল্পের। প্রবল আগ্রহে জীবন সমুদ্র থেকে আমরা বেছে বেছে কেবল তুলে আনি, অসীম বেদনা আর কষ্টমাখা হাহাকার। অথচ যত্নে গাথা ঝিনুকের মালা থেকে যায় আমাদের চোখের আড়ালে! হায়রে, মানবজনম!
from Abdullah Al Imran

দুদিন পর আপুর জন্মদিন…

Post ID # 026

দুদিন পর আপুর জন্মদিন। খুব সুন্দর কিছু একটা গিফট করতে চাই। কিন্তু কী দিব বুঝতে পারছি না। স্কুল ছুটি শেষে বন্ধু হাসানকে বললাম,

‘মার্কেটে যাবি?’

‘কেন?’

‘একটা গিফট কিনব।’

‘দোস্ত আজকে না। প্রচন্ড গরমে আমি ক্লান্ত। কাল বিকালে চল?’

‘আচ্ছা। কাল বিকালে তোর বাসায় চলে আসব।’

হাসানকে বিদায় দিয়ে একটা রিকশা নিয়ে বাসার দিকে রওয়ানা দিলাম।

বাসায় পৌঁছে কলিংবেল বাজালাম। আপু দরজা খুলে দিল। তারপর হাসি মুখে বলল,

‘কিরে তনয়, আজ এত দেরী করলি যে?’

জুতা খুলতে খুলতে বললাম, ‘আর বলো না আপু। এত গরমে রিকশায় পাওয়া যায় না।’

‘আচ্ছা তুই বোস। আমি তোর জন্য শরবত এনে দিচ্ছি।’

ব্যাগটা শোফার উপর ফেলে ফ্যানটা ছেড়ে ধপাস করে শোফার উপর বসলাম। একটু পরেই আপু আমার জন্য শরবত করে আনলো। গ্লাসটা হাতে নিয়ে বললাম,

‘ভার্সিটি থেকে কখন আসলা আপু?’

‘তোর আসার পাঁচ মিনিট আগে। এসেই ভাত চড়িয়েছি।’

‘কতবার বললাম শরবতে লেবু দিও না। তুমি আমার কথাই শোন না।’

‘হিহি। আজকে খেয়ে নে। কাল থেকে আর দিব না।’

প্রতিদিন আপু একই কথা বলে। তারপরেও শরবতে লেবু দিবেই।

‘এখন যা গোসল করে ফ্রেশ হ। আব্বু চলে আসবে। আমি ততক্ষণ খাবার রেডি করি।’

বাসার সব কাজ আপুই করে। মাঝে মাঝে আপুর দিকে অবাক হয়ে তাকাই। কিভাবে করে আপু? আমি যখন ক্লাস টু তে পড়ি তখন আমার মা মারা যায়। এখন আমি ক্লাস টেনে পড়ি। আট বছর কেটে গেছে। মায়ের স্মৃতিগুলোও ভুলে গেছি। তখন থেকেই আপু আমাকে বড় করছে।

আব্বু ছোটখাট একটা চাকরি করে। মধ্যবিত্ত পরিবার। আব্বুর সামান্য বেতনে পরিবারটা চলছে এবং খুব ভালই চলছে। আমি, আপু আর আব্বু। ছিমছাম হাসিখুশি একটা পরিবার। বেশ কেটে যাচ্ছে।

২.

কাল আপুর জন্মদিন। ড্রয়ার খুলে আমার খাতার ভাঁজ থেকে কিছু টাকা বের করলাম। আপুর জন্য কিছু কিনব বলে অনেকদিন ধরেই টাকা জমাচ্ছি। প্রায় দুশো টাকা। এর মাঝেই ভাল কিছু কিনতে পারব আশা করি।

বিকাল পাঁচটা। রেডি হয়ে গেলাম তাড়াতাড়ি। হাসানের বাসায় গিয়ে তার সাথে মার্কেটে যাব। আপুর রুমে ঢুকে দেখি আপু শুয়ে শুয়ে গল্পের বই পড়ছে। আমি বললাম,

‘আপু দরজাটা লাগিয়ে দিও।’

‘কোথায় যাচ্ছিস রে?’

‘এইতো খেলতে যাচ্ছি।’

‘আচ্ছা যা। সন্ধ্যার আগে চলে আসিস।’

‘আচ্ছা।’

মিথ্যা কথা বলে বাসা থেকে বের হলাম। সত্যি কথা বলতে লজ্জা লাগছে তাই!

আমি আর হাসান মার্কেটে ঘুরছি। কিন্তু কেনার মত তেমন কিছু পেলাম না। হাসান আর আমি পছন্দ করে একটা কার্ড কিনলাম।

পরদিন খুব ভোরে উঠলাম। স্কুল শুরু হবে সাড়ে সাতটায়। আব্বু প্রতিদিন সকালে বারান্দায় বসে রবীন্দ্র সংগীত শোনেন। আর আপু ঘুমাচ্ছে। ফ্রিজ থেকে পাউরুটি বের করে গরম করে নিলাম। তারপর খেয়েদেয়ে স্কুলে যাওয়ার জন্য রেডি হয়ে গেলাম। যাওয়ার আগে আপুর রুমে টেবিলে কার্ডটা রেখে দিলাম।

কার্ডে লিখেছি, ‘শুভ জন্মদিন, আপু।’

জন্মদিনের দিনটা প্রতিদিনের মতই। মনে হচ্ছে না আজ আপুর বার্থডে। নিশ্চয় আপু কার্ড পেয়ে অনেক খুশি। মুখে কিছু না বললেও বোঝা যায়। রাতে আব্বু যখন অফিস থেকে আসলো তখন আব্বুর হাতে দেখি কেকের ছোট্ট প্যাকেট। তারপর কী মজাটাই না হল! আপু কেক কেটে আব্বুকে খাইয়ে দিলেন। তারপর আমাকে খাইয়ে গালে মেখে দিলেন। আমিও বা কম কিসে! আমিও আপুর গালে কেক মাখিয়ে দিলাম।

৩.

খুব সুন্দর কাটছে দিনগুলো। দেখতে দেখতে আমার এসএসসি পরীক্ষা চলে এল। আপু তখন আমাকে নিয়েই বেশি ব্যস্ত হয়ে গেল। একদিন ডিনার করার সময় আপুকে বললাম,

‘আপু আমি কিন্তু সব জেনে গেছি।’

‘কি জেনে গেছিস?’

‘ইয়ে মানে দুলাভাইয়ের কথা বলছি।’

‘এই ফাজিল কি বলিস এগুলা?’

‘হ্যাঁ। তুমি যখন রান্নাঘরে ছিলে দুলাভাই তোমাকে কল দিয়েছিল। আমি তখন কথা বলেছিলাম।’

‘দুলাভাই দুলাভাই করছিস কেন? আমরা কি বিয়ে করেছি নাকি?’

‘ঐতো হবে একদিন। যাই হোক, উনাকে আমার বেশ পছন্দ হয়েছে। রসিক মানুষ।’

‘হয়েছে। সামনে তোর পরীক্ষা। এখন ভাল করে পড়।’

আমি আপুর দিকে তাকিয়ে শয়তানি হাসি দিলাম।

৪.

দেখতে দেখতে রেজাল্টের দিন চলে আসলো। আজ আমার রেজাল্ট। সকালে আপু আমাকে বিছানা থেকে টেনে তুলল।

‘ঐ ওঠ। আজ তোর রেজাল্ট না?’

‘ইশ আপু আরেকটু ঘুমাই না?’

‘দশটা বাজে। আর কত ঘুমাবি? টেবিলে নাস্তা দেয়া আছে। খেয়েদেয়ে রেজাল্ট নিয়ে আয়। আজতো তোর খুশির দিন।’

‘আমি ফেল করব।’

‘তাই নাকি? ফেল করলে আজকেই তোর বিয়ে দিয়ে দিব। হিহি।’

‘এই অফারটা আগে বলবা না?’

‘আমি জানি তুই এ প্লাস পাবি। তোর উপর আমার বিশ্বাস আছে। এখন উঠে রেডি হ।’

আপুর চোখেমুখে আমার স্বপ্ন দেখতে পেলাম। জানি না ভাগ্যে কী আছে? আপুর বিশ্বাস কি রাখতে পারব?

অবশেষে রাখতে পেরেছি। কল দিয়ে আপুকে যখন রেজাল্ট জানালাম তখন আপু চিত্‍কার দিয়ে উঠল। আমার চেয়ে আপুকেই বেশি খুশি মনে হচ্ছে। বাসায় গিয়ে দেখলাম উত্‍সব উত্‍সব ভাব। আপু আমাকে মিষ্টি খাইয়ে দিল। আপুর চোখ ছলছল করছে। আনন্দের অশ্রু।

৫.

রেজাল্টের কয়েক মাস পর আপুর বিয়ে ঠিক হয়ে গেল। আজ ছেলেপক্ষ দেখতে এসেছে। যাকে দুলাভাই দুলাভাই বলে ডাকতাম সেই ছেলেটার সাথেই আপুর বিয়ে হচ্ছে। দুজনকে বেশ মানিয়েছে। সামনের মাসে বিয়ের দিন তারিখ ঠিক হল।

ইদানিং আপুর মন খারাপ থাকে। কোন কিছু নিয়ে চিন্তা করে। একদিন আপুকে বললাম,

‘তুমি কি কোন কিছু নিয়ে চিন্তিত?’

‘নারে ভাই। তোদের কথা চিন্তা করছি। আমি চলে গেলে তোকে কে দেখবে? বাবাকে কে দেখবে?’

‘এত চিন্তা করলে হবে? আর তোমাকে বিদায় করতে পারলে শান্তি। অন্তত টিভি শান্তি করে দেখতে পারব। রিমোর্ট নিয়ে মারামারি করতে হবে না।’

‘ও। খুব শান্তি না? দরকার হলে বিয়ের পর এখানেই থেকে যাব। তবুও তোকে শান্তিতে থাকতে দিব না।’

‘হাহা। সেটা পরে দেখা যাবে। এখন খেতে চলো।’

দেখতে দেখতে বিয়ের দিন ঘনিয়ে এল। কাল আপুর বিয়ে। আজ আমার মন খারাপ লাগছে। আসলেই আমি একা হয়ে যাব। সব স্মৃতিগুলো ভেসে উঠছে। যখন আমি অসুস্থ থাকতাম তখন সারারাত আপু আমার পাশে জেগে থাকত। এখন অসুস্থ হলে কে থাকবে? কাল থেকে রিমোর্ট নিয়ে আর মারামারি হবে না, সকালে ঘুম থেকে উঠিয়ে দিবে না। বারান্দায় বসে এসবই ভাবছিলাম আমি।

৬.

বিয়েটা বেশ ধুমধাম ভাবে হয়েছিল। বিদায় বেলায় আপুর সে কী কান্না! আব্বুকে ধরে কাঁদছে তো কাঁদছেই। আব্বুকে ছেড়ে যখন আমার দিকে এগিয়ে আসলো তখন একটু হাসি দিল। আমাকে জড়িয়ে বলল,

‘এবার তো তুই শান্তিতে থাকবি। আব্বুর প্রতি খেয়াল রাখিস। আর নিজের যত্ন নিস।’

বিয়ের প্রায় দুমাস কেটে গেল। আপু সেই আগের মতই আছে। চঞ্চল হাসিখুশি। প্রতিদিন আমার সাথে কথা বলতো। সারাদিন কি কি করছি সব শুনতো। মাঝে মাঝে সময় পেলে চলে আসত আমাদের বাসায়।

আজ আমার জন্মদিন। অথচ আপু আমাকে উইশ করেনি। ভীষণ রাগ লাগছে। বিয়ের পর এমনই হয়। আপু হয়তো ভুলেই গেছে।

কলেজ থেকে এসে আমি আর আব্বু একসাথে খেতে বসলাম। আব্বু বললেন,

‘তনয় তোর জন্য একটা গিফট আছে।’

‘কিসের?’

‘জন্মদিনের। তোর আপু পাঠিয়েছে।’

‘আপু? সত্যি?’

‘হ্যাঁ রে। তোর ড্রয়ারে রেখেছি।’

আমি তাড়াতাড়ি খেয়েদেয়ে রুমে আসলাম। ড্রয়ার খুলে প্যাকেট থেকে গিফটটা বের করলাম। একটা টেপ রেকর্ডার। আমি সেটা অন করলাম।

‘হ্যাপি বার্থডে তনয়। অনেক ভালবাসি। অনেক ভালবাসি আমার ছোট দুষ্টু ভাইটাকে। তোর প্রতিটি দিন আনন্দে কাটুক। অনেক দোয়া রইল তোর জন্য। অনেক ভালবাসি আমার লক্ষ্মী ভাইটাকে। অনেক অনেক ভাল থাকিস ভাই আমার।’

রেকর্ডিংটা প্রায় চার পাঁচবার শুনলাম। আমার জীবনে পাওয়া শ্রেষ্ঠ গিফট।

৭.

প্রায় চার বছর কেটে গেল। কলেজ পাশ করে এখন আমি ভার্সিটিতে পড়ি। খুলনা ভার্সিটিতে চান্স পেয়েছিলাম। সেখানেই মেসে থেকে পড়ছি।

দিনগুলো অনেক পাল্টে যাচ্ছে। ইদানিং আপুও অনেক কম কথা বলে। মাঝে মাঝে দেখে আসতে ইচ্ছা করে। কিন্তু পড়ালেখার ব্যস্ততার কারণে সময় বের করতে পারি না।

রাত নয়টা বাজে। মেসে আড্ডা দিচ্ছিলাম। এসময় আপু কল করে। কল ধরে বললাম,

‘আসসালামুআলাইকুম আপু। কেমন আছ?’

‘এইতো আছি ভালোই। কি করিস রে? খেয়েছিস?’

‘না। একটু পরে খাবো। আপু তোমার কি হয়েছে বলবা? ইদানিং তুমি খুব কম কথা বলো! কণ্ঠও শুকনো। তুমি কি অসুস্থ?’

‘নারে কিছু হয়নি। খেয়ে নিস। এখন রাখি।’

আপু কলটা কেটে দিল। আপুর কিছু একটা হয়েছে। আমার কাছে লুকাচ্ছে। আব্বু দুলাভাই কেউই আমাকে কিছু বলছে না।

পরদিন রাত দশটায় দুলাভাই আমাকে কল দিল।

‘কী খবর দুলাভাই? এতদিন পর শালাবাবুকে মনে পড়ল?’

‘একটা খবর আছে। বলব?’

‘হুম বল।’

‘আমাদের একটা মেয়ে হয়েছে। তুই মামা হয়ে গেছিস।’

‘কি? সত্যি আমি মামা হয়ে গেছি? অভিনন্দন দুলাভাই। আপু কী করছে? আপুকে দাও।’

দুলাভাই চুপ। কোন কথা বলছে না। আমি আবার বললাম,

‘কি হল দুলাভাই? আপুকে দাও।’

‘তোর আপু আর নেই।’

একথা শুনে দাঁড়িয়ে থাকার মত শক্তি আমার ছিল না। বিছানায় বসে পড়লাম। কান্নাজড়িত কন্ঠে দুলাভাই কথা বলে যাচ্ছেন। আমি চুপচাপ শুনছি।

‘ডাক্তার আগেই বলে দিয়েছিল যেকোন একজন বাঁচবে। হয় বাচ্চা না হলে তোর আপু। তোর আপুকে বলেছিলাম আমাদের সন্তান লাগবে না। কিন্তু সে আমার কথা শুনল না। তোকে আগে থেকে কেন বলা হয়নি জানিস? কারণ তুই কষ্ট পাবি। তোর আপু এটা দেখতে পারবে না। তাই আমাকে বলতে দেয়নি। কাল চলে আসিস তনয়। দুপুরে কবর দেয়া হবে।’

সারারাত আমার ঘুম হল না। আপুর রেকর্ডিংটা বারবার শুনছি। আমি কাঁদছি। আপু তুই কি শুনতে পাচ্ছিস? কেন আমাকে ছেড়ে চলে গেলি? কেন?

পরদিন খুব সকালের ট্রেন ধরলাম। আপুর দেয়া পান্জাবীটা পড়লাম। গত ঈদে আপু এটা দিয়েছিল। আজ আর কাঁদব না। আজ খুশির দিন। আমি মামা হয়েছি।

বাসায় পৌঁছালাম প্রায় দুপুরের দিকে। সব আত্নীয়স্বজন চলে এসছে। চারিদিকে কান্নার রোল! কফিনে রাখা লাশটা আমি দেখিনি। আব্বু মানা করলেন। বললেন,

‘তোর স্মৃতিতে বেঁচে আছে তোর আপু। তুই চোখ বন্ধ করলেই সেই হাসিখুশি মুখটা ভেসে উঠবে। সেটাই থাকুক না?’

আমি কিছু বললাম না। আব্বুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলাম।

কবর দেয়া শেষে আমরা হাসপাতালে গেলাম। পিচ্চিটা তার দাদীর কোলে। আমি পিচ্চিকে কোলে তুলে নিলাম। ওর দিকে তাকিয়ে একটু হাসলাম। পিচ্চিটা দেখতে হুবুহু আমার আপুর মত। হ্যাঁ একদম আমার আপুর মত। দুলাভাইকে বললাম,

‘দেখো দেখো পিচ্চিটা দেখতে একদম আমার আপুর মত।’

আমার দিকে তাকিয়ে দুলাভাই হাসি দিয়ে বললেন, ‘হ্যাঁ রে। একদম তোর আপুর মত।’

আমিও দুলাভাইয়ের দিকে তাকিয়ে স্মিত একটা হাসি দিলাম।

–লিখা: R J Kuber Majhi–

বৈশাখের শুরুতেই বৃষ্টি

Post ID # 025

বছরখানেক আগের কথা। এক ছেলের সাথে পরিচিত হলাম। সে একসাথে পাঁচটি মেয়ের সাথে তখন প্রেম চালাচ্ছিলো।

অর্থাৎ মামলা ইন্টারেস্টিং।
জানতে চাইলাম, ‘ভাই, মেইন্টেইন কিভাবে করো? কিভাবে পারো? মানুষ’তো একটাই সামাল দিতে পারে না !’
অতঃপর এব্যাপারে তার রীতিমত গবেষণাধর্মী বিশ্লেষণ শুনলাম। বর্ণনা রীতিমত ভয়াবহ।
তার ভাষায়, প্রেম মানেই জ্বালা।
কিন্তু প্রেম না করেও সে থাকতে পারে না। প্রথম যার সাথে ১০০% honest ছিলো, সে ব্রেকআপ করে অন্যএক ছেলের সাথে সুখে সংসার করতেছে। তো এখন সে নিজেই একাধিক প্রেম করে। একসাথে পাঁচটা !

তার ভাষায়, একটি মেয়ের সাথে প্রেম করা রিক্স। প্রেম মানেই ইনভেস্টমেন্ট। মোবাইলের ব্যাল্যান্স, রেস্তোরার বিল, গিফট, এছাড়া সবচেয়ে দামী ইনভেস্টমেন্ট ‘সময়’।
হাজার হোক, জীবনের মুল্যবান কিছু সময় হুদায় অপচয় করার মত ক্ষতি আর নেই। তো এতোকিছু ইনভেস্ট করার পর যখন মেয়ে অন্যের হাত ধরে ব্রেকআপ করে চলে যায়, তখন ব্যাপারটা হয়ে যায় ভয়াবহ।
বিশ্বাস খুব মুল্যবান জিনিস। এতোসহজে কাউকে বিশ্বাস করতে নেই। সস্তা মানুষ বিশ্বাসের মুল্য দিতে জানে না। সুতরাং, একাধিক প্রেম করুণ। এর অনেক অনেক সুবিধা আছে।

আমি জিজ্ঞাস করলাম, ‘সুবিধাগুলো কি কি ?”

সে বলল, “একজনের সাথে প্রেম করলে দ্রুতই তার উপর একেবারে নির্ভরশীল হয়ে যাবেন। তাঁকে ছাড়া আর কিছু কল্পনাও করতে পারবেন না। যখনই সে বুঝে যাবে, আপনি তার উপর একেবারে নির্ভরশীল, তখনই প্রেমের মজা চলে যাবে। সে আপনার সাথে ভাব মারা শুরু করবে। কারণ সে জানে, আপনাকে লাথি মারলেও আপনি বুমেরাং এর মত তার কাছে ফিরে আসতে বাধ্য ! ব্রেকআপের ভয় দেখিয়ে আপনাকে আতঙ্কের ভেতর রাখবে। তখন আর আপনি প্রেমিক থাকবেন না। ভেড়া হয়ে যাবেন। আপনার পারসোনালিটি বলে আর কিছুই থাকবে না তারকাছে। ছেচড়ামো শুরু করবেন।
এই দেশে গভীর ভালোবাসা’কে দুর্বলতা মনে করে অনেকেই। এমন অবস্থায় রিলেশন হয়ত অটুট থাকবে, কিন্তু প্রেমের মজা হারিয়ে যাবে। আর ভাগ্য বেশি খারাপ হলে মেয়ে আপনার প্রতি ইন্টারেন্ট হারিয়ে অন্যকারোর দিকে ঝুকবে। সুন্দরি মেয়েদের আশেপাশে ঘুরঘুর করা ছেলের অভাব হয় না। বিশ্বাস না হলে যে কোনো সুন্দরি মেয়ের ফেসবুকের ইনবক্সে একবার ধুইকা দেইখেন। অবাক হবেন”

আমি বললাম, ‘কিন্তু উল্টোটাও তো হতে পারে। মেয়ে ভালো মন মানুসিকতার হলে তো গভীর প্রেমের প্রতিদান গভীর ভালোবাসা দিয়েই দেবে”

সে বলল, “ভাই, থামেন। রিয়েলিটিতে আসেন। গভীরতা সবাই ভয় পায়। সেটা যে গভীরতায় হোক না কেন। বিবাহ পূর্ব প্রেম হল দায়দায়িত্বহীন প্রেম। হা, এমন মেয়ে হয়ত আছে, যে গভীরতার প্রতিদান গভীরতা দিয়েই দেবে। কিন্তু তেমন মেয়ে এযুগে কম। কারণ ভালো ছেলেও এযুগে কম। সুতরাং সম্ভাব্যতা কোনদিকে বেশি, সেটা চিন্তা করেন। সেইফ সাইডে থাকেন। সাবধানের মাইর নাই। আজকাল পোলাপাইন তাদের বাবা’ মা’কেও ব্লাকমেইল করে। ভালোবাসার ব্লাকমেইল। কারণ তারা জানে, যতকিছুই হোক, দিনশেষে বাবা মা তাদের ভালোবাসবেই। এবাধন নষ্ট হবার নয়। অস্বীকার করাও অসম্ভব। ফলাফল, বাবা মায়ের ভালোবাসার দুর্বলতার সুযোগ তারা নেয়। ওই যে বললাম, ভালোবাসার দুর্বলতা !! আসলে মানুষ এতো মহৎ কোনো কালেই ছিলো না। হবেও না। মানুষ সুযোগ সন্ধানী ও গড়পড়তায় সুবিধাবাদী”

“তো একাধিক প্রেমের আর কি কি সুবিধা? শুনি। শুনে ধন্য হই “

‘ভাই, প্রেম করাটা অনেকদিক দিয়েই টিউশনি পাবার মত। যে পায়, সে পেতেই থাকে। আর যে পায় না, সে একটাও পায় না। একাধিক প্রেম একসাথে চালালে কোনো মেয়ের প্রতিই দুর্বল হবেন না। মানুসিকভাবেও নির্ভরশীল হয়ে যাবেন না। প্রতিটি মেয়েই ব্যাপারটা বুঝবে যে আপনি ১০০% ডিডিকেটেড এখনো না। অর্থাৎ তার জন্য মজনু টাইপের পাগল হবার সম্ভবনা আপনার নাই। প্রতিটি মেয়েই চাইবে আপনাকে মজনু বা রোমিও বানাতে। কিন্তু যখন পারবে না, তখন তাদের মনে দ্বন্দ্ব তৈরি হবে। ফলাফল, মেয়েই উল্টা আপনার প্রতি পাগল থাকবে। উল্টো তারাই ব্রেকআপের ভয়ে থাকবে। মেয়েরা নির্ভার হলে স্বস্তি পাবে। তাদের ভালোবাসা দেবেন অল্প অল্প করে। সর্বদা হারানোর ভয়ের ভেতর রাখবেন তাদের। এই গেল, এই গেল, পাখি উড়ে গেল, টাইপের ভয়। এসবই সাইকিক ব্যাপার স্যাপার। আর ভুলেও বলবেন না, আপনার কোনো মেয়ে বন্ধু নেই। বরং বলবেন, অনেক সুন্দরি সুন্দরি মেয়েই আপনার Just friend… এটা তাঁকে জেলাস রাখবে। কারণ তারও just friend লিস্টে অনেক ছেলে আছে। আপনার অবর্তমানে তারা যেমন just friend থেকে তার boy friend হয়ে যেতে পারে, ঠিক তেমনই আপনারও অনেক just friend তার অবর্তমানে আপনার girl friend হয়ে যেতে পারে, এই ভয় যেন তার মনে থাকে। অবচেতন মনেই তার মনে খটকা বাধবে। কোন মেয়েই চায় না তার প্রেমিকের সাথে অন্যমেয়ে আড্ডাবাজি গালগল্প করুক”

আমি বললাম, ‘বুঝলাম তোমার ব্যাখ্যা। তো বিয়ে কি পাঁচজন’কেই করবা? “

“না ভাই। বিয়ে একজন কেইই করবো। এই পাঁচজনের ভেতর শেষপর্যন্ত যার ভালোবাসা রিলেটিভলি সবচেয়ে খাটি মনে হবে, তাঁকে করবো। বাকিরা আউট। বিয়ের পর বউ’কে ১০০% ডেডিকেশন দিয়ে ভালোবাসবো”

‘হুম, বুঝলাম”

“ভাই, আজকাল প্রেম নামক বিবাহ পূর্ব সম্পর্ক একেবারেই ঠুনকো। এটা পাওয়া যেমন এখন একেবারে সহজ হয়ে গেছে, তেমন এটা সস্তাও হয়ে গেছে। কোনো দ্বিতীয়, তৃতীয় প্রেম নেই। সব প্রেমই প্রথম প্রেম। প্রেমের কথোপকথন হল একরাশ অভিনয় আর মিথ্যার ফুলঝুরি। আপনি honest থাকলেও যে আপনার প্রেমিকা honest থাকবে, এর গ্যারান্টি কি? গ্যারান্টি নেই। মুখের কথা বিশ্বাস করা আর অন্ধবিশ্বাস করা একই জিনিস। কে কেমন তা কে জানে? এজন্যই আমি স্বার্থপর হয়ে গেছি। আমি কেবল আমার নিজের সুখের কথা ভাবি। অন্যের ব্যাপারে অনেকআগে একবার ভেবেছিলাম। সে কষ্ট দিয়ে অন্যের হাত ধরে চলে গেছে। তখন আমার ওই একটাই প্রেমিকা ছিলো। আর কেউ ছিলো না। আর আজ এখন আর আমি honest না। আজ আমার ৫ টা প্রেমিকা !! এরা প্রত্যেকেই আমাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতেছে। আমার জন্য পাগল। আমি যদি বলি, আজ সারাদিন আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকো, ওরা থাকবে। আর একাধিক প্রেম করলে গিফটের ঝামেলা থেকে বেঁচে যাবেন। অমুক আপনাকে গিফট দিলে তার গিফটটাই তমুক’কে দেবেন। আবার তমুক’কের দেয়া গিফট অমুক’কে দেবেন”

আমি জিজ্ঞাস করলাম, “আচ্ছা, এসব করে কি হ্যাপি হওয়া আদেও যায়? সত্যি সত্যি বলো”

“ভাই, হ্যাপি হই বা না হই, কষ্ট পাবার ভয় আমার নেই। waiting list টা অনেক বড় থাকলে এই এক সুবিধা। কেউ ব্রেকআপ করে চলে গেলেও সমস্যা নেই। আর নিজের attitude ধরে রাখতে পারবেন। কারো সাথে কথা বলার সময়ই গলায় ন্যাকামি আসবে না”
.
.
.
তার সাথে আরো কিছুক্ষন কথা হল।
কি বলবো, বুঝতে পারতেছিলাম না। খালি শুনে গেলাম।

অনেকদিন পর তার সাথে দেখা। মনের মত এক সুন্দরি ললনা’কে বিয়ে করে একটা ফুটফুটে বাচ্চার বাবা হয়ে গেছে সে।
.

বসে বসে ভাবছি। শুধুই ভাবছি। সুখ শান্তি মনের ব্যাপার। দুনিয়াটা কি আনফেয়ার? আসলে দুনিয়া ঠিকই আছে। আমরা মানুষরাই আনফেয়ার হয়ে যাই নানান কারণে। সব কাহিনীর পেছনেই ভিন্ন কাহিনী থাকে। পটভূমি থাকে। রচনার সুচনা না পড়ে, উপসংহার পড়া একারণেই ঠিক না।

আজ অনেকদিন পর বৃষ্টি দেখতে দেখতে চায়ের কাপে মুখ দিলাম। আসলে যা হবার সেটা হবেই। কেন হয়, কিভাবে হয়, এসব জানতে চাই না এখন আর। এই দুনিয়াতে যা হবার, সেটা হয়। হচ্ছে। হবে।
কাল বৈশাখীর ঝড় হচ্ছে। বৈশাখের শুরুতেই বৃষ্টি। এমনটিই তো হয় সবসময়।

— Faisal shovon

অবনীর বোধহয় অসস্থি লাগছে…

Post ID # 024

অবনীর বোধহয় অসস্থি লাগছে আমার পাশে বসতে। আমি যতটুকু পারা যায় রিক্সার সাইড ঘেষে বসে আছি। শুধু আড় চোখে অবনীর দিকে তাকানোর লোভ সামলাতে পারছি না। এই অবনীর সাথে ভার্সিটি লাইফের অবনীর কোনো মিল নেই। যার চোখে হাজারো পাগলামো খেলা করত, নিত্যনতুন দুষ্ট বুদ্বির আনাগোনা চোখ জলমল করে বেড়াত সেই অবনীর চোখ এখন নিষ্প্রাণ। চেহারায় গম্ভির প্রকৃতির একটা ভাব এসে পরেছে। নাকের ডগায় চশমা ঝুলানোর জন্যই অন্যরকম লাগছে। আমি কিছু না বলে চুপ করে রইলাম।

“আর একটু এইদিকে সরে আস। না হয় ঝাকুনি খেয়ে পরে যাবি”

নিরবতা ভেঙ্গে বলল অবনী। আমি পাশ ফিরে দেখলাম। সত্যি তো! আর একটু হলে রাস্তায় পরে যেতাম। আমি সরে বসলাম। আমার দিকে তাকিয়ে ম্লান করে হাসল অবনী। তার হাসিতে সেই আগের উচ্ছাসটুকু নেই।

আমার মাথায় কখন থেকে একটি স্মূতি ঘুরছে। অবনীর সাথে শেষ দেখা হওয়ার কথা। ক্যাম্পাসের শেষ দিন ছিলো। গ্রেজুয়েশন শেষে মেতে উঠেছিলাম আনন্দ। প্লেনিং ছিলো আগেই। রিতিশাকে প্রোপোজ করার।

রিতিশা আমাদের ব্যাচেরই মেয়ে। রূপলাবন্য ভরপুর। ক্যাম্পাসে প্রথম দিন থেকে তার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছিলাম। সেইদিন ৫ বছরের ভয়কে জয় করে ভালোবাসি বলেছিলাম। রিতিশা রাজি হয়ে গেল। অবনী এসে অভিনন্দন জানালো হেসে। সেইদিনের পর থেকে অবনীর দেখা মেলেনি। অনেক খোঁজার পরেও না। আজ হয়ে গেল নিউমার্কেটের সামনে। গুড়িগুড়ি বৃষ্টিতে দাড়িয়ে ছিলাম। বৃষ্টির দিনে রিক্সার অভাব, শেষে টুংটাং শব্দে পিছনে একটি রিক্সা থামল। অবনী বলায় উঠে বসলাম। এতটা বিষ্মিত ছিলাম কিছু বলার বা ভাবার কথা মাথায় আসেনি।

– কেমন আছিস রুদ্র?

অন্যদিকে তাকিয়ে বলল অবনী। আকাশ মেঘলা। বৃষ্টি পরছে না এখন আর।

– চলছে হেলেদুলে। তুই তো হারিয়ে গিয়েছিলি একেবারে।

আমার কথায় আবার নিষ্প্রাণ হাসি অবনীর চেহারায়। কিছু বলল না অবনী। আমি চুপ হয়ে বসে থাকতে পারলাম না।

– তোর দিন কেমন যাচ্ছে?

অবনী এইবার ও চুপ। কেমন যেন বিষাদ ভর করেছে চোখে। রিক্সা থামালাম। আর একটু হাটলেই সিআরবি মোড়। ক্লাস ফাঁকি দিয়ে কত সময় কাটিয়েছি এই জায়গাটাতে। রিক্সা থামাতে দেখে ভুর কুচকে তাকালো অবনী। আমি তাকে নামার ইশরা করলাম।

পুরনো কিছু স্মৃতি এখনো রঙ্গিন হয়ে আছে। একবার ক্যাম্পাসে যাওয়ার পথে হুট করে বৃষ্টি নামল। সেইদিন ও পাশে ছিলো অবনী। দুজন সারাদিন বৃষ্টিতে ভিজেছি। কখনো রিক্সায় কখনো হেটে। ঠান্ডায় কাঁপছিলাম দুজন। পাগলীটা ঐসময় হাতে আইসক্রিম ধরিয়ে দিলো। অবনীর কিছু হয়নি ঐদিনের বৃষ্টিতে ভেজার ফলে জ্বরে বিছানায় ছিলাম ৭ দিন। অবনী প্রায় ঐদিনটার কথা মনে করে হাসত।

সময়ের সাথে দুটো মানুষের অবস্থানের কত পরিবর্তন। অবনী হাটছে কিছুটা দূরত্ব নিয়েই। গুড়িগুড় বৃষ্টির ফোঁটা পরছে আবার।

– তুই এমন হয়ে গেলি কেন রে? _ না পেরে জিগেস করলাম।

– কেমন?

– তুই ভালো করেই জানিস অবনী।

– কোনো কিছু আগের মতো নেই রে। না তুই না আমি

গম্ভির হয়ে রইলাম। অবনী কথাটি বলে থেমে গেছে। প্রতিবাদ করে কিছু বলতে ইচ্ছে করছে। আমি তো বদলায় নিই। আগের মতোই আছি

– তুই বদলিয়েছিস অবনী। আমি না

– রুদ্র তুই বদলেছিস।

প্রতিবাদ করে কিছু বলতে যাবো। অবনীর চোখের দিকে তাকিয়ে থেমে গেলাম। আসলে কি বদলেছি?

ক্যাম্পাসের শেষ সময়টুকুতে এসে কিছুটা দূরুত্ব হয়ে গিয়েছিল অবনীর সাথে। সেটা অবশ্য রিতিশার মনোযোগ পাওয়ার জন্যই। তাই বলে বদলে তো যাই নিই।

– রিতিশা কেমন আছে রুদ্র?

হঠাত্‍ আমার দিকে তাকিয়ে বলল অবনী। চুপ হয়ে রইলাম। রিতিশার সাথে বেশিদিন সম্পর্ক টেকে নিই। প্রথম দিকে দুজনকে এক মনে হলেও পরে বুঝেছিলাম আমাদের ভাবনার জগতে বিস্তর তফাত।

– বড়জোর একবছর ছিলাম। অনেক চেষ্টা করেও টেকেনি সম্পর্ক। আমার স্বপ্ন গুলো ছোট ছোট। রিতিশার স্বপ্ন আকাশ ছোয়া।

কথাগুলো বলেই থামলাম। পাশ ফিরতে খেয়াল করলাম অবনী তাকিয়ে আছে এক দৃষ্টিতে। তার দিকে তাকিয়ে হাসলাম আমি।

– এখন একা একা ঘুরে বেড়ায়। মন্দ নেই। তোর খবর বল

আমার কখায় অবনী চুপ থাকে কিছুক্ষণ। আমি তাকিয়ে থাকি তার দিকে। আজ অনেক স্মৃতি অনেক প্রশ্ন আসছে মাথায়। এসব রিতিশা চলে যাওয়ার পরেও এসেছিল।

– গ্রেজুয়েশন করে বের হওয়ার পর বাবা বিয়ে ঠিক করলেন। কিছু না ভেবেই রাজি হয়ে গেলাম। মেলেনি ভাবনা গুলো। আজ আমাদের ডিবোর্স হলো।

অবনীর কথা শুনে চুপ হয়ে রইলাম কিছুক্ষণ। হাটা শুরু করলাম আবার। কিছুদূর হেটে অবনী থামল। বৃষ্টির মাত্রা বেড়েছে ততক্ষণে। সামনে আইসক্রিম। অবনী আমার দিকে তাকিয়ে হাসল। এই হাসি সেই ভার্সিটি লাইফে অবনীর হাসি !

একটা ছাউনির মাঝে দাড়িয়ে আছি আইসক্রিম হাতে। বাহিরে ঝুম বৃষ্টি। আশেপাশে পুরো জায়গা খালি। অবনী হাতের আইসক্রিম ফেলে ছুটলে বৃষ্টিতে। আমিও পিছু পিছু ছুটলাম। এই যেন সেই বছর ৫ এক আগের অবনী।

অবনী আকাশের দিকে তাকিয়ে ভিজছে। আমি তাকিয়ে আছি এক দৃষ্টিতে। অবনীর চেহারায় কান্নাহাসির মিশ্রণ। যেন এক বৃষ্টিতে সব দুঃখ গুলো মুছে দিতে চাইছে !

সন্ধা নেমেছে । দুজন ভিজে চুপসে গেছি। কিছুক্ষণ চুপ থেকে অবনী বলল

– রুদ্র , আমি হঠাত্‍ কেন হারিয়ে গেলাম জানতে চেয়েছিস?

অবনীর দিকে তাকালাম আমি। উত্তর নেই আমার কাছে

– রিতিশার সাথে তোর সম্পর্ক টিকবে না। আগে থেকেই জানতাম।

– বলিসনি কেন?

– বললে কি হতো? তুই মেনে নিতি?

আমি চুপ করে রইলাম।

– সেইদিন তোর জন্মদিন ছিলো। অন্যদিনের মতো আমার গিফট দেখেছিলি?

কিছু না বলে চুপ হয়ে রইলাম। অবনী চোখে স্পষ্ট জল দেখছি। একটা গেইটের কাছে রিক্সা থামিয়ে নেমে পরলো অবনী। যাওয়ার আগে একটাবার ও তাকায় নি সে

পুরো রিক্সায় জুড়ে আমার প্রতি জন্মদিনে দেওয়া অবনীর সারপ্রাইজ গুলোর কথা মনে পরছে। চোখের সামনে ভেসে আসছে তার দেওয়া শেষ গিফটি। ডায়রী ছিলো সেটি। পড়া হয়নি। অস্থিরতা অনুভব করলাম। রিক্সা এত আস্তে চলছে কেন। অবনীর ডায়রীটি এখনো কি আগের জায়গায় আছে?

*

আমাকে নিয়ে প্রত্যেকটি স্বপ্নের কথা অবনীর ডায়রীতে সাজানো আছে। পাগলীটা বলেওনি একটাবার। সেইদিন সারারাত অস্থিরতায় কাটালাম। পরেরদিন ছুটলাম অবনীর বাসায়। ততক্ষণে অবনীর চলে গিয়েছে। বাড়ির কেউ বলেনি সে কথায়। সে হয়তো জানত আমি আসব তাকে ফিরাতে

অনেক সময় আমরা ভালবাসাকে খুব কাছ থেকে পেয়েও বুঝিনা ক্ষনিকের মোহের জন্য হারিয়ে ফেলি

— আশরাফ মামুন

শুন্য খাঁচা

Post ID # 023

করিডোর দিয়ে কিছু দূর হেটে যেতেই নিশুকে দেখলাম। ডাক দিতেই থামল নিশু। পিছন ফিরে একবাই দেখল একটু হাসার ভান করে ফের হাটা ধরল করিডোরের পথে। নিশু এমন আচারনের কারন আমার জানা। বন্ধুরা মিলে যাচ্ছে সমুদ্র ভ্রমনে। তাদের এই পরিকল্পনা ১ বছর আগ থেকে। এই পরিকল্পনায় আমিও ছিলাম একটা সময়। এখন গুটিয়ে নিয়েছি। সেই স্কুল জীবন থেকে এক সাথে আমরা। প্রত্যেক ভ্রমনে আমার নামটাই কাটা পরত। বাবার নির্দেশ। তবে সমুদ্রপাড় ঘোরার ইচ্ছেটা আমার বহু দিনের। প্রথম যখন ভ্রমনের কথা তোলা হলো সবচেয়ে খুশি আমি ছিলাম। কত প্লানিং ছিলো আমার! কিন্তু ভুলে গিয়েছিলাম পারিবারি পরিবন্ধকতার শেকল আমার পায়ে বেধে দেওয়া হয়েছে সেই ছোটবেলা থেকে। বাবা মাকে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন বন্ধুদের সাথে যাওয়া হচ্ছে না আমার। নিশু , মিথিলা খুব করে চায়ছিল আমাকে। বাবার অবাধ্য হওয়ার সাহস আমার নেই।

বাবাকে আমি ভালোবাসি। তবে তার বেধে দেওয়া শেকল দেখে নিজকে বড্ড বেশি পরাধীন মনে হয়।

এসব ভাবতে ভাবতে ক্লাস রুমের সামনে এসে দাড়ালাম। নিশু পাশে রফি , মিথিলা আর সুমিতও আছে। আমি নিশুর দিকে আগাতেই সে অন্য দিক হয়ে সরে দাড়াল। সবাই কেমন চুপ হয়ে গেছে। আমি আসার আগে তাদের গুন্জন শুনছিলাম। আমাকে নিয়ে ছিলো হয়তো। তাদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। তাদের এই অভিমান সেই ছোটবেলা থেকে বাড়তে বাড়তে আজ এই পর্যায় এসেছে। সবার দিকে তাকিয়ে একবার হাসলাম আমি। তাদের চেহারার কোন পরির্বতন এলো না। অনেকক্ষণ চুপ ছিলাম। আমাকে দেখে তারাও কথা বলছে না। অসস্থি সরাতেই মুখ খুললাম আমি

“কি তোদের প্লানিং কত দূর?” প্রশ্নটা করে নিজেকে বোকা মনে হলো। তাদের মধ্য থেকে কেউ উত্তর দিলো না।

_ “কিরে কিছু বলছিস না যে?” না পেরে ফের বললাম। এইবার মিথিলা মুখ খুলল

“সামনের সপ্তাহে” _ রফির বোধহয় মায়া হলো। আমাকে দেখে উত্তরটা দিলো সে।

“ক্লাসের দেরি হচ্ছে” _ বলেই পিছন দিকে হাটা ধরল মিথিলা। তার পিছন পিছন হাটা ধরল অন্যরা শুধু নিশু বাদে।

– “কিরে কিছু বলবি?” _ আমার কথা শুনে নিশু তাকিয়ে বলল

“আঙ্কেল অনুমতি দিয়েছে?” _ নিশুর প্রশ্নে উত্তর দিলাম না আমি। বাবা যেতে দিবে না তা সবার জানা। অনেকের ধারনা ইচ্ছেকৃত এমন করি আমি। শুধু নিশুই বুঝে।

আমি আর নিশু ক্লাসের পথে হাটা ধরেছি। পিছন থেকে রুদ্রের ডাক শুনতে পেলাম। দৌড়াতে দৌড়াতে আসছে সে। প্রতিদিনের মতোই ক্লাসে লেইট পারসন।

আমাদের চেহারা দেখে ভুর কুচকাল রুদ্র। “তাড়াতাড়ি ক্লাসে চল , দেরি হচ্ছে” _ রুদ্রের দিকে তাকিয়ে বললাম আমি।

পুরো ক্লাসের ব্যাঞ্চের এক কোণে বসে ছিলাম। কেউ আগ্রহ দেখায়নি কথা বলার। সত্যি বলতে কি , একটা সময় রাগ হতো। লজ্জা পেতাম। তাদের কাছে ছোট হতে হচ্ছে। এখন আর হয় না। আমার অনুভুতি গুলো যেন লোভ পাচ্ছে। চার দেয়ালে বন্ধি থাকা মেয়েটির কিসের আবার অনুভুতি?

আমার বন্ধু গুলো এমন ছিলো না। আমার জন্যই এমন হচ্ছে। তাদের অভিমান একদিনের না। অনেক দিনের। বন্ধ বান্ধবের সাথে আড্ডা, ঘুরোঘুরি এসবে কোনো কালেঈ ছিলাম না। ক্লাস ছুটিতে বন্ধুরা যখন গল্পে মেতে থাকত আমি তখন ছুটতাম বাসার উদ্ধেশ্যে। সময়মত বাড়ি না ফেরলে বাবার হাজার প্রশ্ন। আমার জীবনটা একটা নির্দিষ্ট গন্ডির ভেতর আটকে আছে। যে শেকলটা বেধেছে আমার বাবা। বাবার কড়া শাসন আর কথার বিরুদ্ধে যাওয়ার সাহস আমার নেই। আমার বন্ধুদের মতো স্বাধীনতা আমি পাইনি। বন্ধু গুলোর ধারনা , “একবার বুঝিয়ে বললে হবে”

কিন্তু বাবাকে বুঝিয়ে বলা অর্থ হলো তার মুখের উপর তর্ক।
একবার নিশুর বাসায় থেকে গিয়েছিলাম সবার অনুরোধে। বাবা মুখে কিছু না বললে ও আমার সাথে এক মাস কথা বলেনি। সেদিন নিজেকে বড্ড বেশি অপরাধী মনে হয়েছিল। বাবাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে বলেছিলাম তার অবাদ্ধ আর হবো না। আমার ইচ্ছে গুলোকে সেইদিন মনের খাঁচায় বন্ধি করে রেখে দিয়েছিলাম।

এসব ভাবতে ভাবতে হাটছি। কখন যে পিছ থেকে এসে রুদ্র ধরল খেয়াল করিনি। রুদ্রের সামনে দাড়ালাম।

“কিরে কানে শুনিস না?কখন থেকে ডাকছি” _ হাঁপাতে হাঁপাতে বলল রুদ্র।

” তোর কথা ভেবে হাটছিলাম তাই শুনিনি” _ রসিকতা করি আমি। একটা লম্বা নিশ্বাস নিয় রুদ্র হাটা ধরল আমার সাথে।

রিক্সায় বসে আছি আমরা দুজন। সবার চায়তে রুদ্র আমাকে বুঝে। সেই ছোটবেলার বন্ধু। আমি চুপ মেরে আছি। হঠাত্ রুদ্র বলল

“জানিস তিথি , আমার এখন কি মনে হচ্ছে?”

“কি?”

“মনে হচ্ছে শরত্চন্দের ফিমেল দেবদাশ বসে আছে পাশ” _ বলেই হাসতে লাগল সে। আমিও হেসে দিলাম। রুদ্রের সামনে কেউ মন খারাপ করে থাকতেই পারে না। বিশেষ করে আমি। আমার মন ভালো করার বন্ধু সে।

“হুমম এইবার বল কি হয়েছে?_ গম্ভির ভাবে জানতে চায় রুদ্র

“ক্লাসের সবাই রেগে আছে। বাবার অনুমতি পাইনি। কিভাবে যাই?”

রুদ্র চুপ হয়ে থাকে। বাবাকে চেনা আছে তার। রুদ্রের সাথে সাথে আমিও চুপ। যেন কারো কোন কিছু করার ক্ষমতা নেই।

[]

রুমে এসে বসে আছি। হঠাত্ মোবাইল বেজে উঠল। হাতে নিয়ে দেখি নিশুর ফোন। পরশুদিন তারা যাচ্ছে। যাওয়ার আগে শেষবার জেনে নিতেই ফোন দিয়েছে

_ তাহলে তুই যাচ্ছিস না তিথি?
এপাশে আমি চুপ থাকি। বলতেও লজ্জা লাগছে

অপাশে নিশু ক্ষানিক চুপ থেকে লাইন কেটে দেয়। বড্ড বেশি অপরাধী মনে হয় নিজেকে।
মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে প্রতিবাদ করে বাবাকে কিছু বলি। বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে বলা হয়ে উঠে না। মানুষটা অনেক ভালোবাসে আমাকে। বাবার হাসির জন্য আমার ইচ্ছের ড়ানা গুলোকে মেলতে দেই না।

ফোন রেখে চুপ হয়ে বসে আছি অনেকক্ষণ ধরে। মা কখন এসে দরজায় দাড়িয়েছে খেয়াল করিনি। মা পাশে এসে বসে হাত ধরলেন। মায়ের স্পর্শ পেয়ে তাকালাম

_”তোর মন খারাপ?” _ জানতে চায়লেন মা। আমি উত্তর না দিয়ে চুপ হয়ে আছি

“তোর বাবাকে নিয়ে বলার কিছু নেই। এক কথার মানুষ”

মায়ের এ কথার ও কোন উত্তর দেই নিই। কেনো যেন মায়ের উপর প্রচন্ড রাগ হচ্ছে। রাগটা অভিমান ও বলা যায়। আজ এতটা বছর বাবার সাথে থাকছেন মা। একটা বার ও প্রতিবাদ করেনি। করলে হয়তো আজ আমার পায়ে শেকল বাধা থাকত না। মা তার সব শখ , ইচ্ছে , স্বপ্নকে গলা টিপে মেরেছি শুধুমাত্র সংসারটি আগলে রাখার জন্য। আচ্ছা এসব কিছু কেনো একটা মেয়েকেই করতে হয়? এর উত্তর মায়ের কাছে নেই। মাঝে মাঝে মনে হয় আমার এই বন্ধি জীবনের জন্য মা দায়ী।

মায়ের দিকে তাকিয়ে বললাম, “_ একটা কথা বলব মা?

“বল মা” _ আমার হাত ধরে বলল মা।

“এই পরিবারে তোমার ভুমিকাটা কি জানো?”

মা চুপ হয়ে আছেন। আমি বলতে শুরু করলাম

“এই পরিবারে তুমি হচ্ছো একটা রোবট। যার কন্ট্রোলার বাবার হাতে। বাবার নির্দেশ মতো তুমি আমাকে আর ভাইয়াকে বানিয়েছ। এই ঘরে সবচেয়ে নিষ্ক্রিয় হচ্ছ তুমি”

প্রচন্ড কষ্ট হচ্ছিল কথা গুলো বলতে। হেটে বারান্দায় চলে এলাম। ভেতরটা মোচর দিয়ে উঠছে বারবার। কেনোই বা বললাম কথা গুলো? প্রচন্ড কান্না পাচ্ছে আমার

সকাল নয়টা । জাফর সাহেব এই সময়টাতে তার বারান্দায় বসেন। জাফর সাহেব তিথির বাবা। এক কথার মানুষ। এখন তিনি খোশ মেজাজেই আছেন। দিনের এই সময়টাতে তিনি খোশ মেজাজেই থাকেন। তার বারান্দায় একটা খাঁচা আছে। খাঁচায় একটা ময়না পাখি। এই ময়না পাখি কথা বলতে পারে। জাফর সাহেব যেদিন ময়না পাখির মুখ থেকে “বাবা” ডাক শুনেছেন সেইদিন কেঁদে ফেলেছিলেন। ময়না পাখি বাবা ডাকে না। তার পোষা পাখি ডেকেছে। জাফর সাহেবের দূটো ছেলে মেয়ে। ময়না পাখিটি থেকে বাবা ডাক শোনার পর তিনি মনে মনে তাকেও তার সন্তান মেনেছেন। জাফর সাহেবের এখন তিনটা সন্তান।

জাফর সাহেব নিজেকে সফল একজন বাবা ভাবেন। ভাবার কারন তার দুটো ছেলেমেয়েই তার কথা শুনে তাকে সম্মান করে। তার বড় ছেলে ইন্জেনিয়ারিং পড়ছে । তার কথাতেই সে পড়ছে। ছেলের ইচ্ছে ছিল ডাক্তার হওয়ার তবে জাফর সাহেবের কথার অবাধ্য হননি।

মেয়ে তিথিকে নিয়ে জাফর সাহেব কিছুটা চিন্তিত। মেয়ে মানুষ হলো ঘরের ইজ্জত। পড়া শেষে মেয়ে ঘরে থাকবে। বাহিরে ধেই ধেই করে ঘুরে বেড়ানো সভ্য মেয়ের কাজ না। জাফর সাহেব মেয়ে তিথিকে বেড়াতে যেতে দেননি। মেয়ে এত পড়াশোনা করানোতে তিনি পক্ষে না। তবুও মেয়ের জন্যই রাজি হয়েছেন। তাই বলে ধেই ধেই করে ঘোরার অনুমতিসকাল নয়টা । জাফর সাহেব এই সময়টাতে তার বারান্দায় বসেন। জাফর সাহেব তিথির বাবা। এক কথার মানুষ। এখন তিনি খোশ মেজাজেই আছেন। দিনের এই সময়টাতে তিনি খোশ মেজাজেই থাকেন। তার বারান্দায় একটা খাঁচা আছে। খাঁচায় একটা ময়না পাখি। এই ময়না পাখি কথা বলতে পারে। জাফর সাহেব যেদিন ময়না পাখির মুখ থেকে “বাবা” ডাক শুনেছেন সেইদিন কেঁদে ফেলেছিলেন। ময়না পাখি বাবা ডাকে না। তার পোষা পাখি ডেকেছে। জাফর সাহেবের দূটো ছেলে মেয়ে। ময়না পাখিটি থেকে বাবা ডাক শোনার পর তিনি মনে মনে তাকেও তার সন্তান মেনেছেন। জাফর সাহেবের এখন তিনটা সন্তান।

জাফর সাহেব নিজেকে সফল একজন বাবা ভাবেন। ভাবার কারন তার দুটো ছেলেমেয়েই তার কথা শুনে তাকে সম্মান করে। তার বড় ছেলে ইন্জেনিয়ারিং পড়ছে । তার কথাতেই সে পড়ছে। ছেলের ইচ্ছে ছিল ডাক্তার হওয়ার তবে জাফর সাহেবের কথার অবাধ্য হননি।

সকালে রুদ্রর ফোন পেয়ে ঘুম ভাঙ্গল। তাদের সাথে রুদ্র যায়নি। রুদ্র অসুস্থ্যতার কথা বলে না গেলেও আসল কারণ আমার ঠিকই জানা। রুদ্র আমার জন্যই যায়নি। এখন ফোন দিয়ে বলেছে ক্যাম্পাসে যেতে। যাওয়ার ইচ্ছে নেই আমার। দ্বিতীয়বার রিং হতে মোবাইল হাতে তুলে নিলাম। রুদ্রের ফোন। নাছড়বান্দা ছেলে

– হ্যালো

– তুই এখনো বাসায়?

– আমি কোথাও বের হচ্ছিনা রুদ্র

– ক্যাম্পাসের নাম দিয়ে বের হয়ে আস

– আমি আসছি না

– তুই না আসলে আমি এখানেই বসে থাকব

কথাটুকু বলে ঐপাশে লাইন কাটল রুদ্র। এপাশে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লাম আমি। দরজার দিকে তাকাতেই বাবাকে দেখতে পেলাম। আমার রুমের দিকেই আসছেন তিনি

জাফর সাহেব মেয়ের সামনে বসে আছেন। সন্তানকে লাইনে আনতে হলে মাঝে মাঝে শাসনের প্রয়োজন হয়। জাফর সাহেব মেয়েকে কড়া ভাষায় কিছু শোনাতেই এসেছেন।

বাবাকে দেখলে আমি বুঝে ফেলি তার মাথায় কি চলছে। ঘুরতে না গেলেও তার কথা শুনতে হবে। কোন কিছুর অনুমতি চাওয়াও এই ঘরের বড় ভুল

আমি বাবাকে চুপ থাকতে দেখে বললাম

– বাবা কিছু বলবে?

– হু

– বলো বাবা

– আমার মনে হচ্ছে টাকা খরচ করে পড়িয়ে আমি অসভ্যকে পালছি

বাবার এমন কথার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না মোটেও। ভিতরটা মোচর দিয়ে উঠল

– মেয়ে মানুষের ঘর হচ্ছে নিজের রুম। তাদের আনন্দ খুশি সব ফ্যামেলির মানুষ নিয়ে। বন্ধুবান্ধব নিয়ে ধেই ধেই করে ঘুরে বেড়ানোকে বেহায়াপনা বলে

– আমি যাইনি বাবা

– যাও নাই। যেতে চেয়েছ। তোমার থেকে এসব আমি আশা করিনা।

– একটু বেড়ুলে তাতে সম্মান যাই না বাবা। আমারও স্বাধীনতা বলতে কিছু আছে

– মুখে তর্ক আমার একদম পছন্দ না। তোমার মাকে দেখেছ? কত বছর সে আছে। সেও তো মেয়ে। সে স্বাধীনতা পায় নাই? এসব হচ্ছে শিক্ষা। তোমার শিক্ষা দিয়ে এসব ঢুকবে না।

বলেই হনহন করে উঠে গেলেন বাবা। আমার কেনো যেন কাঁদতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু বাসায় না। মাকে বেড় হবো বলে বলতে রান্না ঘরের দিকে পা বাড়ালাম।

রান্না ঘরের দরজায় দাড়িয়ে আছি। মা কপালের ঘাম মুসছেন। রান্না বসিয়েছেন চুলোয়। মাকে দেখে বুকের ভেতরটা হুহু করে উঠল। আচ্ছা আমার মতোই কি মায়ের জীবনটা?

– কিছু লাগবে তিথি? _ মা জানতে চায়লেন

আমি আর পারিনি। দৌড়ে গিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদলাম। মা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। মায়ের চোখেও পানি।

*

রিক্সার মাঝে বসে আছি। আমার পাশে রুদ্র। রুদ্রর এমন কান্ডের কারন আমি বুঝি। সে অনেক কিছু বলতে চায় আমাকে। আমি সুযোগ দেই না। যে পরিবারে নিশ্বাস নেওয়ার জন্য অনুমতি লাগে সেই পরিবারে এমন কথা ভাবাও পাপ

– তুই আসবি না বলে এলি কেন?

– তো এখন চলে যাবো? _ রেগে বললাম আমি।

রুদ্র কিছু না বলে হাসল শুধু

– তিথি, কিছু মানুষের জীবনে সুখ গুলো দেরি করে ধরা দেয়। এরা এক প্রকার দুঃখী আরেক দিক দিয়ে সুখী

– সুখী কোন দিক দিয়ে দেখলি তুই?

– সুখী কারন এদের কাজে সুখ এলে আর যেতে চায় না। তাই আসে ক্ষানিক দেরিতে

– তুই কোন ভাগে পরিস?

– আমি একজন দুঃখীর পাশে বসে সুখী হতে চাইছি

কথাটুকু বলেই হাসল রুদ্র। রুদ্রের এই কথার অর্থ বুঝেছি আমি।

– রুদ্র আমাকে ভালোবাসিস?

– সে তো পুরনো কথা

– ভুলে যা। কষ্ট ছাড়া দেওয়ার কিছু নেই আমার

– যেতে আসিনি। চাইলে সম্ভব। দরকার একটু সাহস। নিজের অধিকারের কথা বলার সাহস

– সম্ভব না।

বলে রিক্সা থামাতে বললাম আম। নেমে রাস্তার পাশ ঘেরে হাটছি। কাউকে কষ্ট দেওয়ার অধিকার নেই আমার। রুদ্রকে কাঁদাতে পারব না আমি।

বাসায় ঢুকে দেখলাম জনকয়েক লোক বসে আছে ড্রইং রুমে। আমাকে দেখে মা দৌড়ে এসে রুমে নিয়ে গেলেন।

– ওরা কারা? _ মাকে বললাম আমি। মা চুপ হয়ে আছেন।

– বলো মা

– তোর বাবার বন্ধুর পরিচিত কলিঙ্গের ছেলে। বাবা তোর জন্য ঠিক করেছে

– আমি বিয়ে করব না মা।

– তোর বাবা কিছুতেই মানবে না।

মায়ের কথায় পাথরের মতো জমে বসে আছি। আমার পড়ালেখার ইচ্ছেটুকুকেও মরতে দিতে চাইনা আমি। একটুপর বাবা এসে রুমে ঢুকলেন

– তৈরি হতে বলেছি। ছেলে পক্ষ অপেক্ষা করছে। আজকেই এঙ্গেজমেন্ট সেরে নিতে চাইছে।

– বাবা আমার পড়ালেখাটা আগে শেষ হওক? _ বাবার দিকে তাকিয়ে বললাম আমি

বাবা তাতে কর্ণপাত করলেন না। মাকে বলেই বের হয়ে গেলেন। আমি আমার শেষ ইচ্ছেটুকুকে মাটি চাপা দিয়ে মায়ের সাথে বের হয়ে এলাম।

ক্যাম্পাসে আজ শেষ দিন। ছেলে পক্ষ বাবার মতাদর্শেই বিশ্বাসী। মেয়েদের জন্য জায়গা হচ্ছে স্বামীর ঘর। স্বামীর সেভা। পান খেতে খেতে কালচে লাল ঠোঁট নিয়ে কথা গুলো বলেছে আমার হবুও শ্বশুর

আজ আমার সেগুলো ভাবার সময় নেই। এই একটা দিন নিজের জন্য বাঁচতে চাই আমি। অবাক হয়ে লক্ষ করলাম বন্ধুদের সবাই আমার সাথে খুব ভালো ভাবেই কথা বলছে। শুধু রুদ্র ছাড়া। এক কোণে বসে আছে সে

– কি রে চুপ হয়ে আছিস?

আমার কথায় নির্বাক হয়ে তাকায় রুদ্র। আমি চেহারায় হাসি ফোটায়। আকাশে ঘন কালো মেঘ জমেছে। হঠাত্‍ আমার আচরন দেখে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে নিশুরা। হাতে বৃষ্টির ফোটা পড়তেই ক্যাম্পাসের মাঠে গিয়ে দাড়ালাম। ঝুমঝুমিয়ে বৃষ্টি পরছে। আমি সেই বৃষ্টিতে দু হাত উচু করে ভিজছি।

আমার পাশে কখন রফি , সুমিত , নিশু , মিথিলারা এসে দাড়িয়েছে খেয়াল করিনি। বৃষ্টির মাঝে আমার কান্নার শব্দ তাদের চোখ এরিয়ে যায়নি। হঠাত্‍ লক্ষ করলাম আমার কান্না দেখে নিশু আর মিথিলাও কাঁদছে। আজ আমার বিয়ে। আমার হাসার কথা। আমি কাঁদছি কেন??

সকালে ঘুম থেকেই উঠে আয়নার সামনে বসেছিলাম অনেকক্ষণ। তারপর বাবার রুমের দিকে পা বাড়ালাম। এসময়টায় বারান্দায় থাকেন তিনি

যা ভেবেছি তাই হলো। বাবা তার আদরের সন্তান ময়না পাখিটাকে খাওয়াচ্ছে। বাবার ধারনা তার এই সন্তানটাই তার সবচেয়ে প্রিয়। তার কথা মানে

আমাকে দেখে বাবা ডাকলেন। চেহারায় হাসি নিয়ে বাবার পাশে বসলাম। আজ বাবাকে কিছু কথা বলার আছে। বাহিরে বিয়ের আয়োজন চলছে। তবুও কথা গুলো বলতে হবে বাবাকে। সিরিয়াস কথা গুলো গুছিয়ে বলতে হয়। আমি একটা বড় নিশ্বাস নিলাম।

_ কিছু বলবি মা? _ বাবা জানতে চাইলেন

– ময়না পাখিটা কি তোমার খুব প্রিয় বাবা?

– হ্যা, ও তো আমার সন্তান।

– তোমার সন্তানটা মাঝে মাঝে ডানা ঝাপ্টায়। কেনো জানো বাবা?

আমার কথা শুনে বাবা তাকালেন। আমি বলতে শুরু করলাম

– তাকে কখনো চোখে বিষাদ নিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখেছ বাবা?

বাবা চুপ তাকিয়ে আছেন এক দৃষ্টিতে। কিছু বলছেন না।

– আমি দেখেছি বাবা। তার খুব উড়তে ইচ্ছে হয় ঐ আকাশটায় অন্য পাখি গুলোকে দেখে। উড়তে পারছে না কেনো জানো? কারন সে তোমার শেকলে বন্ধি। নিজের সন্তানকে বন্দী রেখেছ কেন বাবা? তাকে সন্তান বলার অধিকার তোমার আছে?

বাবা দাড়ানো থেকে হঠাত্‍ বসে পড়লেন।

– বাবা ভাইয়া আমার বিয়েতেও বাসায় আসেনি। সে তোমার স্বপ্ন পূরণ করতে গিয়ে নিজেরটাকে হত্যা করেছে। সে কষ্টটা বাবা হয়ে দেখছ তুমি?

– বাবা আমাদের না পারো। পাখিটাকে উড়ার স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করো না। সে তোমাকে বাবা ডেকেছে।

বলেই বের হয়ে এলাম বাবার রুম থেকে। মা আমাকে নিয়ে রুমে গেলেন। আজ দুপুরে বিয়ে আমার। আমার কান্না পাচ্ছে না। বাবাকে বলার পর শান্তি লাগছে ভেতর থেকে।

*

জাফর সাহেব ময়না পাখির খাঁচার দিকে তাকালেন একবার। ডানা ঝাপ্টা দিলো পাখিটি কয়েকবার।

[] আশরাফ মামুন []

সারপ্রাইজের উপ্রেও সারপ্রাইজ আছে

Post ID # 022

ঢাকা যাচ্ছিলাম। বাসে আমার এক ফ্রেন্ড ফোন দিলো। ফ্রেন্ডদের নানা বৈশিষ্ট্য থাকে। আমার এই ফ্রেন্ড হলো ঋণী ফ্রেন্ড। টাকা হাওলাত করা ইনার শখ। ফোন ধরলাম; কেননা এখন হাওলাত দেয়ার জায়গায় নাই আমি। বহু দুরে আছি।

– হ্যালো!!

— হুম। বল দোস্ত।

– দোস্ত আমি তো তোরে গরু খোজা খুজতেসি।

— ক্যান দোস্ত??

– সেটা দেখা কইরা বলতেসি। তুই কই??

— আমি তো ঢাকা যাই।

– কস্কি! কোন বাসে আছস??

— তিশা।

– কই এখন??

— কাচপুর্।

– কই নামবি??

— সায়দাবাদ।

– তাইলে তো দেখা করা কষ্ট হইবো। আচ্ছা দোস্ত এক কাম কর্। সায়দাবাদ নাইমা আমারে একটা মিসকল দিস। তোর লাইগা সারপ্রাইজ আছে।

অবাক হয়েই ফোন কেটে দিলাম। আমার জন্যে সারপ্রাইজ! সূর্য কোন দিকে উঠলো!!একটু আগ্রহী হয়া উঠলাম। যাই হোক কিছুক্ষনের মাঝেই পৌছে গেলাম সায়দাবাদ। গিয়ে আবার ফোন দিলাম ফ্রেন্ডকে।

— কি তোর সারপ্রাইজ? আমি সায়দাবাদ।

– সায়দাবাদ গেছস গা?? রেল ক্রসিং এর ওইদিকে যা।

— ওই দিকেই আছি।

– তাইলে রেলক্রসিং এর যে দিক কমলাপুরে গেছে সে দিকে একটা টং আছে দেখ।
— হুম। আছে তো।

– টং এর উপরে দেখ সানসিল্ক শ্যাম্পুর এ্যাড!

— হুম। তো??

– তুই না সানসিল্ক শ্যাম্পুর এ্যাডের মেয়েটার উপরে ক্রাশড?? তাই দেখাইলাম।

— কি??

– খুশি হইসোস??

— এইডা তোর সারপ্রাইজ!! আমি গুলিস্তান না নাইমা সায়দাবাদ আইলাম এই এ্যাড দেখার লাইগা?? তোরে সামনে পাইলে এখন কিলায়া!!!!
কথা শেষ করার আগেই কাধে একটা হাত পড়লো। একটু চমকে উঠেই তাকালাম। দেখি ফ্রেন্ড হাজির!

— তুইইইই??

– হ! তুই কইলি আমি তোর সামনে থাকলে নাকি কি না কি করবি। মানে আমারে মিস করতেসিলি! তাই এক্কেরে সামনে আইসা গেলাম।
আমি হতবাক হয়ে বাকরুদ্ধ স্টেটে দুই ঠোট এর মাঝে আড়াই ইঞ্চি গ্যাপ রেখে ফেবুর সারপ্রাইজড ইমো বনে দাড়ায় আছি। একেই বলে যেখানে বাঘের ভয় সেখানেই সন্ধ্যা হয়! মানিব্যাগে বেশ কিছু টাকা আছে। আজকে আমি গেছি! হয়তো বাস ভাড়াটা দিয়ে বাকি মানিব্যাগটাই নিয়ে চলে যাবে এই পাবলিক!!

– যাই হোক! কেমন ছিলো সারপ্রাইজ??

— কোনটা??
– কোনটা মানে??

— এ্যাড নাকি তোর আগমন??

– দুইটাই!

— সেই দোস্ত। জীবনে এতো বড় সারপ্রাইজড আমি আর কখনো হইনাই।

– থ্যাঙ্কস দোস্ত। তুই খুশি হইসোস এটাতেই আমি খুশি। এই খুশিতে আমার দুই হাজার টাকা ধার নিতে ইচ্ছা করতেসে

— মারসস! ক্যান??

– গার্লফ্রেন্ড আসতেসে বনানী থেকে; ফার্মগেট দেখা করবো। একটু ঘোরা ঘুরি করবো।

— তো??

– টাকা কই?? তুই আমারে দে; আমি বিশ মিনিট পর দিয়া দিতাসি।
— বিশ মিনিট??

– মানে বিকালের মধ্যে আরকি।

— বিকালের মধ্যে??

– মানে এই সপ্তাতেই দিয়া দিবো। প্লিজ দোস্ত!

— দুই হাজার টাকা! এত টাকা তো আমি জীবনে কখনো একসাথেই দেখিনাই আমার কাছে নাই দোস্ত।

– মিথ্যা বলা মহাপাপ। তোর কাছে আছে। আর যদি না থাকে তাইলে আমি নিবোনা; ওকে?? দেখি তোর মানিব্যাগটা!! আমার তাড়া আছে। তাড়াতাড়ি যাইতে না পারলে গার্লফ্রেন্ড রাগ করে বসে থাকবে!
মানিব্যাগের দিকে হাত বাড়াচ্ছে ফ্রেন্ড। আমার লিভার এ মোচড় দিয়ে উঠলো! মানিব্যাগে আমার কলেজের বেতন পাচ হাজার টাকা আছে। ওইটা গেলো!!!

ঠিক এই সময় চোখ পড়লো দুই জন লোকের উপরে। দুইজনেই খুব উতসুক হয়ে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। চিনে ফেললাম আমি। আমাদের খুব কাছেই দাড়ায় আছে কিনা! আমি তাদের শোনায় শোনায় একটু গলা উচু করে বললাম –

— কিইই?? তুই কুমিল্লা যাওয়ার বাস খুইজা পাস না??? সায়দাবাদে দাড়ায় কুমিল্লা যাওয়ার বাস টোকাস!!
– কুমিল্লা যাওয়ার বাস মানে? আমি ফার্মগেট যামু। মানিব্যাগটা দে!

আমার আর কিছু করা লাগলোনা। ওই দুই ব্যাক্তির কর্নে আমার কথা পৌছায় গেছে। দুইজন এর একজন এশিয়া লাইন বাসের কন্ডাকটর আরেকজন তিশা বাসের্। দুইজনেই একসাথে ফ্রেন্ডের দুই কাধে হাত দিয়ে টান দিলো।

– ভাই আমাগোরটা আগে যাইবো।
– ভাই আমাগোরটা এক্ষুনি ছাইড়া দিতেসি।
– আমাগো বাস আগে না পৌছাইলে আপনি ভাড়াই দিয়েন না।

– তাগো দশ মিনিট আগে পৌছাইতে না পারলে ভাই কন্ডাকটারি ছাইড়া দিমু।

– ভাই আসেন!!

বাকি কথা কানে এলো না। কেননা উল্টা অবস্থাতেই ছেচড়ায় বেচারাকে টানতে টানতে দুইজন দুই বাসের দিকে রওনা হইসে। ফ্রেন্ড কিঞ্চিত চ্যাংদোলা অবস্থায় আছে। তার এখনকার অবস্থা হইতেসে হতবাক হয়ে বাকরুদ্ধ স্টেটে দুই ঠোট এর মাঝে আড়াই ইঞ্চি গ্যাপ রেখে ফেবুর সারপ্রাইজড ইমো বনে যাওয়ার মতো অবস্থা। এই অবস্থা দেখে এশিয়া লাইন আর তিশা এক্সক্লুসিভ এর বাকি হেলপার কন্ডাকটারদের টনক নড়লো। তারাও হাত লাগালো এই টানাটানিতে। আমি আর না দাড়ায় চম্পট দিলাম।

এক ঘন্টা পর আবার ফ্রেন্ডের ফোন। ভয়ে ভয়ে রিসিভ করলাম।

— দোস্ত বল!

😥 এইটা তুই কি করলি! আমি এখন কুমিল্লায়!!

— হ্যালো?? হ্যালো???? কিছু শোনা যাচ্ছেনা!! তুই ডেটিং এ?? গুড লাক দোস্ত!!

ফোন কেটে দিলাম।
সারপ্রাইজের উপ্রেও সারপ্রাইজ আছে। তার উপ্রেও ওভার সারপ্রাইজ আছে 😀

By: কনজেনিটাল পাগলা

সবাই দেখছে ছেলেটাকে!

Post ID # 021

সবাই দেখছে ছেলেটাকে!

অবাক হয়েই দেখে। কিন্তু কেউ কিছু বলেনা। সময় খুব খারাপ। কিসে কি হয় কে জানে। দেখতে দেখতে তার পাশ দিয়ে চলে যায়। কেউ দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। কারো চোখ ব্যাথায় টলমল করে। তবুও কেউ কথা বলার সাহস পায়না।

ছেলেটা দাড়িয়ে আছে গুলিস্তানের মোড়ে। ফুটপাতে। লোক যাতায়াতের মুখোমুখি জায়গায়। যে যতো ভাবনা নিয়েই থাকুক না কেন ছেলেটাকে এড়িয়ে যেতে পারেনা। পাষাণ মানুষকেও একদন্ড দাঁড়াতে হয়, একনজর দেখতে হয় ছেলেটাকে। দুঃখিত হয় সবাই কিন্তু সময়টা খুব খারাপ বলে চলে যেতে হয় নীরবে। মুখে কিছু না বললেও মন থেকে কেউ ছেলেটার দুঃখময় চেহারাটাকে মুছে ফেলতে পারেনা। ভাবতে হয় অনেকক্ষণ। টের পাওয়া যায় ছেলেটা খুব ক্ষুধার্ত। হাতে পায়ে জোর নেই। কাঁপছে। অথচ কাউকেই কিছু বলতে পারছে না।

ফ্যালফ্যালে চোখ। শুকনো খটখটে মুখ। টিঙটিঙে শরীর। বোঝা যায়, বাবা-মা নেই। এ ক’দিনের গন্ডগোলে কি হয়েছে কে জানে। এমন একটি এতীম স্বভাবের ছেলেকে দেখলে কার না দয়া হয়! সময়টা খুব খারাপ বলে কেউ কোন রকমভাবে সাহায্য করার সাহস পাচ্ছে না। গ্রাম হলে অনেক আগেই ছেলেটাকে নিয়ে কেউ চলে যেতো। কিন্তু ঢাকা শহর এখন ভয়ঙ্কর। রাত হলেই চোখ বেঁধে মানুষ নিয়ে যায়। দিনে দুপুরেও গোলাগুলির শব্দ হয়। যারা আছে, তারা সব সময়ই মৃত্যুভয়ে কাঁপছে। একজন মানুষ আর চুপ করে থাকতে পারলো না। চট করে ছেলেটির কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বললো,
: নাম কি?
: বিপ্লব।
লোকটা চমকে ওঠে। তারপর নিজেকে সামলিয়ে বলে,
: তোমরা কি হিন্দু?
ছেলেটা ছলছল চোখে মাথা নেড়ে বলে,
: না, আমরা মুসলমান।

রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের পর থেকেই ছেলেমেয়েদের নাম অনেকেই বাংলা ভাষাতে রাখার চেষ্টা করেছে। সে কারণেই হয়তো ছেলেটার নাম এরকম। তাড়াতাড়ি লোকটা অন্য প্রসঙ্গ তোলে। তোমার বাপ-মা কোথায়?
: জিঞ্জিরার অপারেশনে মারা গেছে।
নিঃশব্দে কেঁদে ফেলে ছেলেটা। দু’চোখ জলে ভাসতে থাকে।
: কেঁদো না। কাঁদলে অসুবিধা হবে। ওরা যদি জানে, তোমার বাবা-মা ওদের গুলিতে মারা গেছে তাহলে তোমাকেও ওরা মেরে ফেলবে। খবরদার, এ কথা আর কাউকে বলো না। আর তোমার এই নামটাও এমন বলো না কাউকে। ‘শহীদ’ কিংবা ‘শাহেদ’ এই ধরনের একটা খাঁটি মুসলমানি নাম বলবে। এই টাকাটা রাখো। কিছু খেয়ে নিয়ো।

আর এক মুহূর্ত দেরি না করে হনহন করে চলে গেলো মানুষটা। মিশে গেলো আর সব মানুষের ভিড়ে। ছেলেটা অনেকক্ষণ সেই ভিড়ের দিকে তাকিয়ে রইলো। এপ্রিল মাসের দুপুর। নিশ্চুপ খাঁ খাঁ রোদ চতুর্দিকে। নীল পাথরের আকাশ। বাতাস নেই কোথাও। মানুষের মত পাখিরাও পালিয়েছে ঢাকা শহর থেকে। একটা কাকের শব্দও নেই কোনখানে। গুমোট গুমোট গরম। সবাই ঘামছে। ঘাম নেই শুধু ছেলেটার। রোদে পুড়ে শরীরটা আরো কাঠ কাঠ হয়ে যাচ্ছে।

কারফিউয়ের মেয়াদ এখন অনেক শিথিল করেছে। রাত ন’টা থেকে ভোর পাঁচটা। ঢাকা শহরটাকে সবদিক থেকেই নাকি ওরা স্বাভাবিক দেখানোর চেষ্টা করছে। তবুও কিছুতেই হচ্ছে না। আগের সেই হৈ চৈ মুখর ঢাকা কেমন যেন একটা ভয় ভয় ভাব নিয়ে নীরব নিথর হয়ে পড়ে থাকছে সারাক্ষণ। দোকানপাট খুলেছে ঠিকই। অফিস- আদালতে লোকজনও যাচ্ছে। কিন্তু সেই ভয়াবহ ২৫শে মার্চের রাত। রাস্তাঘাটে গুলিবিদ্ধ লাশ। পাখির মত মানুষ মারার যুদ্ধ যুদ্ধ শব্দ। এসব কেউ ভুলতে পারছে না এখনো। মৃত্যুটাকে যেন হাতে নিয়ে চলাফেরা করছে সবাই। এখনো ওখানেই দাড়িয়ে আছে ছেলেটা। আগের মত হৈ চৈ কলরব নেই, কিন্তু মানুষের ভিড় আছে ঠিকই।

হঠাৎ বাবার কথা মনে হলো বিপ্লবের। তার বাবা ছিল হরবোলা। নানা রকম পশুপাখি জীবজন্তুর শব্দ করতে পারতো। তার কন্টে পশুপাখির শব্দ শোনার জন্য মানুষ ভিড় করে দাঁড়াতো। বাঘ- ভাল্লুকের শব্দ শুনলে সত্যি সত্যি মানুষ ভয় পেয়ে যেতো। আবার যখন বর্ষার বিভিন্ন ব্যাঙের শব্দ করতো তখন সবাই হো হো করে হেসে উঠতো। বিষাক্ত সাপের ফুঁসফুঁস শব্দে গোটা ভিড়টাই শিউরে উঠতো। আতঙ্কে ক্রমাগত পিছিয়ে যেতো। আবার দুই মোরগের ঝগড়া কিংবা দুই নেড়ী কুত্তার ঝগড়ার শব্দ শুনলে হাসাহাসি করে হাততালি দিতো পাবলিক। এই ছিলো তার বাবার ব্যবসা। লোকের কাছ থেকে হাতজোড় করে গামছা পেতে যে পয়সা কড়ি পেতো তাই দিয়েই তার সংসার চলতো।

বাবার কাছ থেকে প্রায় সব পশুপাখির ডাকই শিখেছে বিপ্লব। কিন্তু বাবার বারণ আছে, এসব সে কোনদিনই অন্যকে শোনাতে পারবে না। বাবা একরকম বিপদে পড়েই এসব করেছে, টাকা- পয়সা থাকলে অন্য ব্যবসা করতো কিংবা একটা মুদি দোকান দিতো। টাকা- পয়সা নেই বলেই হরবোলা সেজেছে। এসব ভালো না। সবসময় পশুপাখি জীবজন্তুর ডাকাডাকি নকল করে বেড়ালে কিছুদিন পর মানুষও পশুর মতো হয়ে যায়। মানুষ আর তখন তাকে মানুষের মত দেখে না। পশুই ভাবে। পশুর মতই ব্যবহার করে। বাবা মনে খুব দুঃখ নিয়ে এসব কথা বলতো বিপ্লবকে। বাবার স্বপ্ন, লেখাপড়া শিখতে শিখতে তার বিপ্লব একদিন মওলানা ভাসানী কিংবা শেখ মুজিবের মতো গরম গরম বক্তৃতা দেবে। দেশের লক্ষ জনতা তার বক্তৃতা শুনবে। তার বিপ্লব হবে দেশের নেতা। তাদের জ্বালাময় বক্তৃতাও নকল করতে পারতো বাবা। বিপ্লবকেও শিখিয়েছে।

বারবার মার কথাও মনে পড়লো। পশুপাখির ডাক মা সহ্যই করতে পারতো না। এসব শুনলে তার শরীরে যেন আগুন লাগতো। দাউ দাউ করে জ্বলে উঠতো মেজাজ। এ নিয়ে প্রায় সর্বক্ষণই বাবা-মার ঝগড়া হতো। বাবার কাছ থেকে দূরে দূরে রাখতে চাইতো বিপ্লবকে। কিন্তু বিপ্লবের খুব শখ ছিল এসব ডাক শেখার। এক এক সময় গোঁ ধরতো। স্কুলে যেতে চাইতো না। বাবা-ছেলের ভেতরে তখন একটা গোপন চুক্তি হতো। বাবা দূরে থেকে ঘুঘু কিংবা কোকিলের ডাক ডাকবে। সেই ডাক অনুসরণ করে গেলেই জায়গামত গিয়ে পাবে বাবাকে। বাবা তখন সেই নিঝুম- নিরালা জায়গায় সুন্দর সুন্দর পাখপাখালির ডাক শেখাবে বিপ্লবকে। এভাবেই গোপনে গোপনে বাবার কাছ থেকে শিখেছে সব।

বাবা- মার কথা ভাবতে ভাবতে এখানকার কথা ভুলে গিয়েছিলো বিপ্লব। দুপুর গড়িয়ে যাচ্ছে, সেই সঙ্গে মানুষও কমে যাচ্ছে শহর থেকে। ভাবসাব দেখে মনে হচ্ছে বিকেলের দিকে কোন মানুষই থাকবে না শহরে। গোরস্তানের মত নিঝুম হয়ে পড়ে থাকবে। কোথায় যাবে, কি করবে, কিছুই ভেবে পাচ্ছে না বিপ্লব। হঠাৎ আবার বাবার কথাই মনে পড়ল বিপ্লবের। বাবা বলেছিল, মানুষ আর আজকাল মানুষের দুঃখ বোঝেনা। শেয়াল- কুকুরের মত যদি কেউ কাঁদতে পারে, তখন একটু দয়ামায়া দেখা যায়। দুই একজন এগিয়ে আসে। সময় খুব খারাপ। আর এক মুহূর্ত দেরি না করে তিন- চারদিনের ক্ষুধার্ত কুকুরের মত গুলিস্তানের মোড়েই দিন দুপুরে কাঁদতে লাগলো বিপ্লব। টানা সুরের হৃদয়ভাঙ্গা কান্না।
চমকে উঠলো মানুষ।
চমকে উঠলো শহর।
ছোটখাট ভিড় জমে গেল বিপ্লবের চতুর্দিকে।
বিপ্লব ক্ষুধার্ত কুকুরের মত কাঁদে। তেরো- চৌদ্দ বছরের বছরের ছেলেটার এই অবস্থা দেখে সবারই মায়া হয়। যে যা পারে টাকা- পয়সা দিয়ে সাহায্য করতে থাকে। ভিড় বড় হয়। মিলিটারীর ভয়ে আবার তা ভেঙ্গে যায়। আবার কিছু লোক আসে। সাহায্য করে। শহরের অবস্থা ভাল নয় বলে খুব দ্রুত চলেও যায় তারা। এক সময় একদম ফাঁকা হয়ে গেল শহর। বিকেল বেলাতেই শহর শূন্য। দোকানপাট গুলোও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে দ্রুত। যানবাহন নেই বললেই চলে। হলুদ রঙের টুকরো টুকরো রোদ ফেলে দিয়ে সূর্যও খুব দ্রুত চলে যাচ্ছে পশ্চিমে।

ঠিক এমনি সময় সুন্দর ঝকঝকে লাল টুকটুকে একটা গাড়ি এসে থামলো বিপ্লবের সামনে। গাড়ির ভেতরে বেদানা রঙের দুটি কচিবাচ্চা পুতুল নিয়ে খেলছে। খিলখিল করে হাসছে। আর আছে সাহেব-মেমসাহেব। বিপ্লবের হঠাৎ মনে হলো কুকুরের মত কাঁদলে বাচ্চা দুটি যদি ফসফস করে কেঁদে ওঠে? তাই সে বিভিন্ন পাখির ডাক দিতে লাগলো। টুনটুনি বাবুই টিয়ে পাখির ডাক। বাচ্চারা খিলখিল করে হেসে উঠে। আবার দুষ্টু বানরের মত শব্দ করে হাত-পা চুলকালে বাচ্চা দুটি হাসিতে ফেটে পড়ে।

বিপ্লব যখন আবার ময়না পাখির সুরে সুরে কথা বলে, সালাম জানায়, তখন বাচ্চা দুটি তখন তাকে ধরার জন্য কচি কচি হাত মেলে ডাকে। এসব ডাকাডাকির খেলা খেলতে খেলতে বিপ্লব সেই লাল টুকটুকে গাড়ির কাছে এসে দাড়িয়ে পড়েছিলো অনেক আগেই। গাড়ি থেকে মুখ বের করে সাহেব এখন তাকে জিজ্ঞেস করছে,
: টুমার নাম কি?
হঠাৎ সেই লোকটার কথা মনে পড়ে যায় বিপ্লবের। তাড়াতাড়ি সে মিথ্যা নাম বলে,
: শহীদ।
: ঘর কোনখানে?
: আমার কোন ঘরবাড়ি নাই।
: বাপ মা ভাই বোন?
: কেউ নাই।
: টুমি হামার বাচ্চাদের সঙ্গে পাখি পাখি খিলা করতে পারবে?
: পারবো।
: হামার বাড়িতে থাকবে? ভাল ভাল খাবার পাবে। জামা- কাপড় পাবে, যাবে টুমি?
চারদিক একবার দেখে নেয় বিপ্লব। সন্ধ্যার আগেই শহর শূন্য। তাড়াতাড়ি বিপ্লব বলে- যাবো।

এখন তার নাম শহীদ। দু’দিন পরই টের পেয়েছে তার সাহেব-মেমসাহেব বিহারি। বিরাট বড়লোক। অনেক রকম ভাষা জানে তারা। উর্দু, ইংরেজি। বাংলাও বলতে পারে ভাল। শহীদের সঙ্গে তারা বাংলাতেই কথা বলে। খুব আদর করে শহীদকে। ভাল ভাল খাবার খাওয়ায়। নতুন নতুন জামাকাপড় কিনে দিয়েছে। দামী দামী ফলমূলও দেয় শহীদকে। তার কাজের মধ্যে কাজ শুধু বাচ্চা দুটিকে নিয়ে খেলা করা। পাখি পাখি ডাকাডাকির খেলা।
সারাদিন আনন্দেই থাকে শহীদ। রাতে মাঝে মাঝে শুধু আওয়াজ পায় সে। প্রায় সব রাতেই গোলাগুলির শব্দ শোনা যায়। জীপ নিয়ে ঝাঁক বেঁধে মিলিটারী আসে এ বাড়িতে। অনেক রাত পর্যন্ত সাহেব মেমসাহেবের সঙ্গে আড্ডা দেয়। তারপর আবার হাসাহাসি করে চলে যায়। সাহেব তখন শহীদকে ডাকে না। শহীদ ঘুমের মত পড়ে থাকে নিজের ঘরে।
শহীদকে হঠাৎ একদিন নতুন ডিউটি দিল সাহেব। তার আগে অবশ্য শহীদকে জিজ্ঞেস করেছে, রাগী অ্যালসেসিয়ান কুকুরে ডাক সে দিতে পারে কিনা।

সাহেব মেমসাহেব খুব আদর করে বলে, তাই সে আর মিথ্যে বলতে পারেনি। বলেছে, সে পারে। তারপরও বিশ্বাস হয়নি সাহেবের। রীতিমত অ্যালসেসিয়ান কুত্তার ডাকের পরীক্ষা দিতে হয়েছে তাকে। পাশ করেছে শহীদ। সাহেব মেমসাহেব আরো খুশি তার উপর। সেদিন থেকেই শুরু হয়েছে তার এই নতুন ডিউটি। সাহেব বলেছে, বাড়িতে সে কোন কুকুর রাখবে না। দিনকাল ভাল নয়। চোর ডাকাতের ভয় আছে। তার আদেশ, আজ থেকে শহীদকেই সারারাত জাগতে হবে। মাঝে মাঝেই ভীষণ রাগী এক অ্যালসেসিয়ান কুত্তার মত ডাকতে হবে। যে ডাক শুনে চোর ডাকাত তো ভয় পাবেই, পাড়াপড়শীরাও মনে করবে এ বাড়িতে ভয়ঙ্কর এক অ্যালসেসিয়ান কুত্তা আছে। কাছে পেলেই বত্রিশটা দাঁত বসিয়ে দেবে শরীরে। তখন আর বাঁচার উপায় থাকবে না। হয়েছেও তাই। সারারাত আর ঘুমায় না। অ্যালসেসিয়ানের মত ডিউটি দেয় শহীদ। তার ভয়ঙ্কর ডাকে রাতের এই ধানমন্ডি এলাকা কাঁপে। নিঝুম- নিশুটি রাত বলে অনেক দুর পর্যন্ত শোনা যায় তার ডাক। মাঝে মাঝেই সে ‘ঘাউ ঘাউ’ করে ডেকে ওঠে। সাহেব শুধু বলে দিয়েছে, মিলিটারীরা যখন তার বাড়িতে আসবে তখন যেন সে চুপ থাকে। ওরা ফিরে যাবার সময় জীপে ওঠা মাত্রই তাকে আবার খুব জোরেশোরে ডাকতে তে হবে। শহীদ তাই করে। অক্ষরে অক্ষরে পালন করে সাহেবের কথা।

দেশের কি অবস্থা হচ্ছে তা সে জানে না। বেরোতেই পারেনা এ বাড়ি থেকে, জানবে কি করে। তবে তার শরীরের অবস্থা খুব খারাপ। রাত জাগতে জাগতে কেমন যেন দুর্বল হয়ে যাচ্ছে দিনের পর দিন। সারাদিনই জ্বরজ্বর লাগে। খাবার খেতে গেলেই জিবটা হয়ে যায় তেতো। সাহেব খুব চালাক। রাত জেগে ডাকাডাকির মধ্যে সেই তেজীভাবটা ক্রমশ দুর্বল হয়ে যাচ্ছে কেন? পরের দিনই বড় এক ডাক্তার এনেছে বাড়িতে। ভালভাবে পরীক্ষা করেছে শহীদের শরীর। ডাক্তার দামী ওষুধ দিয়েছে। ভাল ভাল পুষ্টিকর খাবার খেতে বলেছে। সাহেব কি ধুরন্ধর, ডাক্তারকেও জানায়নি যে সে সারারাত কুকুরের ডিউটি দেয়? শহীদ যদি হঠাৎ বলে দেয়, সেই জন্য ডাক্তার আসার আগেই শহীদকে সতর্ক করে দিয়েছে।

খাওয়া দাওয়ায় শরীর ভাল হলে কি হবে, মনটা খুবই খারাপ হয়ে গেছে শহীদের। মানুষ হয়ে শেষ পর্যন্ত সে একটা পোষা কুকুরের চাকরি করছে একটা বাড়িতে? এ কথা মনে হলেই অ্যালসেসিয়ান কুত্তার মতই রেগে যায় সে। একটা লাফ দিয়ে সাহেবের ঘাড় মটকাতে ইচ্ছা করে। কিন্তু মনটা যে আবার মানুষের মত। সময়টা খারাপ বলে চুপ করেই থাকতে হয় তাকে।

সবচেয়ে বেশি কষ্ট হয় বৃষ্টির রাতে। এবারের বৃষ্টিও জিঞ্জিরার অপারেশনের মত। হঠাৎ ঝমঝম করে নামে। বিদ্যুৎ বজ্রপাতে পৃথিবী কাঁপে। মিলিটারীর মত ঝড় এসে গাছপালা ছিন্নভিন্ন করে যায়। ছিটা গুলির মত শিলাবৃষ্টিতে কেটে ছেটে যায় সারা শরীর। তারপরও ঘাউ ঘাউ করে ডাকতে হয় সারারাত। গাড়ি বারান্দায় আশ্রয় নেবার একটু জায়গা থাকে। কিন্তু এবারের বৃষ্টির ভীষণ তেজ। চতুর্দিক থেকেই দাপাদাপি করে ছুটে এসে আঘাত করে। ভিজে জবজবে হয়ে যায় শরীর। ঠান্ডা হয়ে যায় রক্ত। শরীর তখন ঠকঠক করে কাঁপতে থাকে। ঐ অবস্থাতেও ডিউটি দিতে হয়। ঘাউ ঘাউ করে চিৎকার করতে হয় সারা বাড়ি ঘুরে ঘুরে। জিঞ্জিরার অপারেশনের কথা মনে হতেই বাবা মার কথা মনে পড়ল অনেকদিন পর। কুকুর হয়ে ডিউটি দিতে দিতে সবই যেন ভুলে গিয়েছিল সে। মনে পড়লেও তেমন কিছু মনে পড়েনা। হাজার মানুষের ভেতরে সেও বাবা মার সাথে দৌড়ে দৌড়ে যাচ্ছিল। চতুর্দিকেই যুদ্ধ যুদ্ধ শব্দ। হঠায় গুলি খেয়ে পাখির মত মাটিতে পড়ে গেল বাবা মা। চারদিকে ছিল কুয়াশার মতই গোলাবারুদের ধোঁয়া। বাবা মার বুকে পড়ে যে একটু কাঁদবে, হাজার মানুষের ভিড়ে সেই সুযোগও পেল না। মানুষের দৌড়াদৌড়ি এবং ধাক্কাধাক্কিতে হারিয়ে ফেলেছে বাবা মার লাশ। পেছনে যাওয়ার উপায় নেই। মানুষের ভিড় তাকে ঠেলে নিয়ে গিয়েছে অনেক দুরে। তাদের কবর দেয়া হয়েছে কিনা তাও জানেনা সে। বাবা মার কথা মনে হলেই শুধু একটা যুদ্ধ যুদ্ধ দৃশ্যের কথা মনে পড়ে শহীদের। এছাড়া আর কিছুই মনে পড়েনা তার। কান্নাও আসেনা। কেমন যেন বাপ মা হারানো একটা নিশ্চুপ ব্যাথা অনুভব করে শুধু। সে ব্যাথাটাও শুকনো শুকনো খড়ি কাঠের মত। বাবা মা যেন ঝরাপাতা। হঠাৎ খসে পড়েছে। কোথাও হারিয়ে গেছে সেদিনের বাতাসে। অনুশোচনা এইটুকুই। এর বেশি কোন দুঃখ সে অনুভব করতে পারেনা। কুকুরের মত ডাকতে ডাকতে কুকুরই হয়ে গেছে। মানুষের স্বভাবচরিত্র নষ্ট হয়ে যাচ্ছে তার। সে বুঝতে পারছে ঠিকই কিন্তু শুধরানোর উপায় নেই। দিনের বেলায় ঘুমুতে হয়। বাইরের কারো সঙ্গে দেখা সাক্ষাতের উপায় নেই। বাড়ির মানুষ কথা বলে উর্দুতে। সন্ধ্যা হলেই আবার সে কুকুর হয়ে যায়। সুতরাং নিজের মাতৃভাষাও যেন সে ভুলে যাচ্ছে দিনের পর দিন। একটানা বৃষ্টি হচ্ছে তিন চার দিন যাবত। টিপ টিপ বৃষ্টি। ঝড় বিদ্যুতের দাপাদাপি নেই। বাবার দুর্ব্যবহারে মা যেমন চুপিচুপি কাঁদতো সারাদিন, এই বৃষ্টির ধরনটাও সেই রকম। রাগ নেই। দুঃখে দুঃখে দিনরাত শুধু কাঁদছেই।

আকাশেও কাদামাটির মত নরম মেঘ। অন্ধকার কেমন যেন ফ্যাকাশে। আগের মত সেই ভয়ঙ্কর কালো রং নেই। মিলিটারীরাও আজকাল আর হৈ চৈ করেনা। চুপচাপ করে আসে এই বাড়িতে। ফিসফিস টুসটাস কি কি বলাবলি করে আবার নিশব্দেই চলে যায়। সাহেবের মনও ভালো না। আজকাল কথা বলে খুব কম। ঝিম ধরে থাকে দিনরাত। কোথায় যেন কি হচ্ছে, শহীদ ঠিক বুঝতে পারছে না।

এখন অনেক রাত। চারদিক চুপচাপ। গাড়ি বারান্দায় ভেজা কুকুরের মতো গুটিশুটি মেরে বসে আছে শহীদ। ভেজা চাদরে শরীর ঢেকে হঠাৎ বাইশ তেইশ বছরের এক যুবক নিঃশব্দে শহীদের কাছে এসে বসতেই ঘাউ ঘাউ করে গর্জে ওঠে শহীদ। যুবকটি নিজেকে বাঙ্গালি বলে ফিসফিস শব্দে পরিচয় দেয়। খুব অবাক হয়ে যায় শহীদ। সাহেব যদি টের পায় সেই কারণে আবার কিছুক্ষণ কুকুর হয়ে ডাকাডাকি করে চুপ হয়ে যায়। অন্ধকারে যুবকটিকে চিনবার চেষ্টা করে শহীদ। অনেকদিন পর এ বাড়িতে বাইরের একজন মানুষের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পেয়েছে সে। তাও আবার একজন বাঙ্গালি মানুষ। কাদাতে আকাশ। টিপটিপানি বৃষ্টি। মেঘলা মেঘলা অন্ধকারে কিছুতেই মানুষের মুখটা ভালভাবে দেখতে পারছে না। মুখের অর্ধেকটা আবার চাদর দিয়ে প্যাঁচানো। তবে তার কথাগুলো বাবা মার আদরের মত। স্নেহ মায়া মেশানো। একটানা বেশিক্ষণ আবার কথা শুনতে পারেনা শহীদ। সাহেবের ভয়ে ঘাউ ঘাউ করে ডাকতেই হয় মাঝে মাঝে। সাহেব জানুক, সে জেগে আছে। প্রভুভক্ত কুকুরের মত এই মেঘবৃষ্টির দিনেও সে পাহারা দিচ্ছে।
এই দিনে বৃষ্টিরও বিশ্বাস নেই। হঠাৎ ঝমঝম করে বৃষ্টি নামলো খুব জোরে। দশদিকেই বৃষ্টির তুমুল শব্দ। এর ভেতরে ঘাউ ঘাউ করে ডাকাডাকি করলেও সাহেব শুনতে পাবেনা। ভালোই হলো। নিজেরা অনেক্ষন আলাপ আলোচনা করতে পারবে। কিন্তু বৃষ্টির শব্দ ক্রমাগত বাড়ছেই। আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টি পড়ছে। নিজেরাও নিজেদের কথা ভালোভাবে শুনতে পাচ্ছে না।

মুক্তিযোদ্ধা। স্বাধীনতা যুদ্ধ। থ্রী নট থ্রী। গ্রেনেড। এরকম কোন শব্দের সঙ্গেই পরিচয় নেই শহীদের। এর আগে সে কখনো শোনেওনি। শুনবে কি করে? সে তো আর মানুষ নেই। কুকুর হয়ে গেছে। তবে হ্যাঁ, এই বৃষ্টিতেও শব্দগুলো গনগনে আগুনের মত লাগছিল শহীদের কাছে। অনেক রকম কথা বলে বলে মানুষটা ক্লান্ত হয়ে গেছে। কোন কিছুই বোঝাতে পারছে না শহীদকে। শেষে যখন বললো,

: তোমার বাবা মাকে মেরেছে কারা?
এই কথাটা সহজেই বুঝতে পারলো শহীদ। তাড়াতাড়ি জবাব দিলো,
: মিলিটারীরা।
: সেই মিলিটারীরা এই বাড়িতে আসে?
: প্রায়ই আসে।
: তাদেরকে দেখলে তোমার রাগ হয়না? বাবা মার প্রতিশোধ নিতে ইচ্ছা করেনা? আগুন জ্বলে ওঠে না বুকে?
: দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে। বাবা মার সেই মৃত্যুর দৃশ্যের কথা মনে পড়ে। কিন্তু কি করবো? আমি তো ছেলেমানুষ। রাত হলেই এ বাড়ির কুকুর হয়ে থাকি। জানেন, আমার আসল নাম বিপ্লব। ভয়ে সাহেবের কাছে বলেছি আমার নাম শহীদ।
কথাগুলো বললো খুবই সরলভাবে। মানুষটার কাছে তা বুক বোঝাই কান্নার মত লাগলো। আবেগে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে মানুষটা বলতে চেয়েছিলো,
: আমি মুক্তিযোদ্ধা। আমার সঙ্গে অস্ত্র আছে। ওরা আমাদের বাংলাদেশটাকেই তোমার মতো কুকুর বানিয়ে রেখেছে। কিন্তু বলতে পারলো না কথাগুলো। সে খুব সহজ সরল ছেলে। এসব কথা বুঝার মতো তার বুদ্ধি নেই। মানুষটা বরং খুব আদর দিয়ে বললো,
: আমি তোমার বাবা মার প্রতিশোধ নেবো।
: কেমন করে?
মানুষটা আরো ফিসফিস করে বলে,
: এ বাড়িতে মিলিটারীরা আসলেই আমাকে জানাবে।
: আমাকে তো বাড়ির বাইরেই যেতে দেয়না। আপনি কোথায় থাকেন তাও তো জানিনা। জানাবো কি করে?
: আমি তোমার কাছেই থাকি। তুমি তো প্রতি রাতেই ঘাউ ঘাউ করে অ্যালসেসিয়ানের মতো ডাকো। যখন তুমি ঘনঘন ডাকবে। খুব জোরে জোরে কতোক্ষণ ডাকলেই আমি টের পাবো এই বাড়িতে মিলিটারী এসেছে।
: আচ্ছা।
যেন সে পরম তৃপ্তির মতো খুব খুশি হয়ে আচ্ছা শব্দটা বললো।
তুমুল বৃষ্টির মধ্যেই চট করে মানুষটা চলে গেলো। হাঁ হয়ে রইলো শহীদ। মানুষটা কি ভূত না জ্বীন। তার আসা যাওয়ার কোন শব্দ পাওয়া গেল না। বেশ একটু ভয়ই পেলো শহীদ। মনে হলো অনেকক্ষন সে ডাকাডাকি করেনি। সাহেব কি সব টের পেলো? ওই ঝমঝমে তুমুল বৃষ্টির মধ্যেও আবার সে ঘুরে ঘুরে বাড়ির এ মাথা থেকে ও মাথা পর্যন্ত ভিজে ভিজে ডাকা ডাকি করলো। ঘাউ ঘাউ, ঘাউ ঘাউ।

আজকাল আর বৃষ্টি হয়না। আকাশ খুব পরিষ্কার থাকে। খুব জোছনা থাকে রাতে। মা একদিন বলেছিলো, এ রকম জোছনায় পরী নামে পৃথিবীতে। ঝিকমিক ঝলমল করে আকাশের তারা। একটু একটু শীত লাগে। চুপচুপ করে শিশির পড়ে। ভেজা থাকে ঘন ঘাস। কুয়াশা কুয়াশা লাগে মাঝে মাঝে। এইরকম এক রাতে একদল মিলিটারী আসলো এই বাড়িতে। জীপ থেকে নেমেই গাড়ির বাতি নিভিয়ে দিলো। তাদের মন খুব খারাপ। আগের মত হৈ হল্লা নেই। সবাই দুঃখ দুঃখ ভাব নিয়ে বসে আছে। একজন শুধু তার সাহেবকে বললো, জলদি বাড়ি ছাড়ো। টিকিট কাটো করাচির।

এতদিন থাকার পর ওদের কথা এখন কিছু কিছু বুঝে শহীদ। সে ভাবলো, ওরা আর এই দেশে থাকবে না, পালাবে। মানুষটার কথা মনে পড়লো শহীদের। বলেই গেছে খুব কাছেই সে থাকে। তাকে খবরটা জানানো দরকার। সত্যি সত্যি যদি সে মানুষ হয় তাহলে নিশ্চয়ই আসবে। শহীদ কুকুর হয়ে খুব জোরে জোরে ঘাউ ঘাউ শব্দ করে ডাকতে লাগলো। সাহেবের নিষেধ ছিল, বাড়িতে মিলিটারী থাকলে সে যেন তখন না ডাকে। আজ সেই হুকুম ভুলে গেছে বিপ্লব। খুব রেগে যাওয়া অ্যালসেসিয়ানের মতো ডাকছে তো ডাকছেই। দোতলা থেকে সাহেব চিৎকার করে বলছে, চোপ রাও, চোপ রাও। সেদিকে কোন খেয়ালই নেই বিপ্লবের। পাগলা কুকুরের মত সে শুধু দৌড়াদৌড়ি করছে আর ডাকছে। সাহেবের কোন বাধাই সে মানছে না। মিলিটারীদের সন্দেহ হয়। রাগে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে সাহেব তাকে গুলি করে। উপরের দিকে লাফ দিয়ে উঠেই ধপাস করে মাটিতে পড়ে যায় বিপ্লব। কারা যেন পাল্টা গুলি করে সঙ্গে সঙ্গেই। টের পায় মিলিটারীরা। তারা আর পালাতে পারেনা। সমস্ত বাড়িটা চতুর্দিক থেকেই ঘিরে ফেলেছে মুক্তিযোদ্ধারা। একে একে বাড়ির সবাই আত্মসমর্পণ করলো মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে।

মানুষটা তখন কোলে তুলে নিয়েছে বিপ্লবের রক্তাক্ত শরীর। বিপ্লব খুব কষ্ট করে বলছে,
: তুমি সেই মানুষ?
: হ্যাঁ।
: আমার ডাক শুনেছো?
: হ্যাঁ।
: স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ- এসবের মানে কি তাই, আমি কোনদিন দেখিনাই।
মানুষটা এবার কেঁদে ফেলে। তারপর বিপ্লবের রক্তেই ভিজে যাওয়া নিজের হাতটা দেখিয়ে বলে,
: এই দ্যাখো, স্বাধীনতা এই রকম!

বিপ্লব তখন আর বেঁচে নেই। তার নিষ্প্রান দুটি খোলা চোখ শুধু তাকিয়ে আছে মানুষটার দিকে। বিপ্লব স্তব্ধ।

লেখাঃ Amoeba Shuvo
‪#‎হরবোলা‬