হাবা গোবা, গাধা টাইপের ছিল ছেলেটা

Post ID # 001

হাবা গোবা, গাধা টাইপের ছিল ছেলেটা। আট দশটা সম্পর্কের মত আমাদের সম্পর্কের শুরু টাও এমন ছিল। সেটা বিশেষভাবে বলার কিছু না। কিন্তু, ছেলেটার মাথায় সমস্যা ছিল। আমি তখন রোজার মধ্যে, ক্লাস শেষে বের যখন বের হতাম। দেখতাম ছেলেটা কড়া রোদে দাঁড়িয়ে আছে। আর কপালের ঘাম গুলো চিকচিক করছে, দৃশ্যটা আমার কাছে অসম্ভব সুন্দর লাগতো। কিন্তু ওকে দেখেই চোখ রাঙিয়ে এমন ভাব করতাম যেন ওর অপেক্ষা করা মহা অন্যায়।
– সমস্যা কি? বেহায়ার মত দাঁড়িয়ে আছ কেন? বলেছি না! বেশি দেখতে আসবা না!!
= সরি। কিন্তু কি করব!
– কি করবা মানে? এই রোজার দিনে রোদের মধ্যে দুপুর বেলা আসো আমাকে দেখতে। থাপড়ানি খাবা? চেহারা তো পুরা কামলা দের মত লাগছে। এই চেহারা নিয়ে আমার সামনে আসলে আমি আসবই না তোমার সামনে।
= আচ্ছা, তাহলে কি করব?
– কি করবা মানে? বাসায় থাকবা। গরমের মধ্যে নাচতে নাচতে বাইরে বের হতে মজা লাগে??
= আচ্ছা।

কিন্তু পরের দিন আবারো একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যেত। আমি মাঝে মাঝে পড়ার বাহানায় লাইব্রেরি তে বসে থাকতাম। যাতে ইফতারের কিছু আগে বের হয়ে বাসায় যাওয়া যায় আর গাধা টা যেন এত কস্ট করে না আসে।সেদিন গুলাতেও বিকালের দিকে বের হলাম। দেখে আমার চোখ খুলে পড়তে বাকি। ছেলেটা এই শেষ বিকেলে এইভাবেই দাঁড়িয়ে আছে। আমার কান্না চলে আসলো। আর কিছু ক্ষন পরই সন্ধ্যা হবে। ইফতারির সময় ও হয়ে যাবে। ওর বাসায় যেতে এই রোজার দিনে যেতে জ্যামে ২/৩ ঘন্টা লেগে যাবে। ইফতারি কই করবে ছেলেটা? প্রচণ্ড খারাপ লাগছিল। ওই দিন ওকে কষিয়ে চড় মেরেছিলাম। বলেছিলাম, আর নিজের চেহারা না দেখাতে! ছেলেটা কাঁদতে কাঁদতে চলে গিয়েছিল। আমিও আর ধরে রাখতে পারি নি। আমিও কাঁদছিলাম। ভাগ্যিস! ছেলেটা দেখে নি! কিন্তু কয়েকদিন পর আবার হাজির। আমাদের মধ্যে এত কথা হত না। আমরা দেখা করলে। বেশিরভাগ সময় চুপ করেই কেটে যায়। আবার সময় হলে,
= সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে। বাসায় কি যাব আমি?
– আজব! তোমার কি সবকিছুতে এত পারমিশন নিয়ে বলা লাগবে। সহজ ভাবে বললেই পারো যে এখন বাসায় যেতে হবে।
= না, মানে!
এটা বলেই মাথা চুলকাতো। এর ব্যতিক্রম কখনো হয় নি। আমার উপর দিয়ে কখনো কথা বলেছে বা একটু কড়া কিছু বলেছে এমন হয় নি। অন্য সবার সামনে ভাব টা অ্যাংগ্রী ইয়াং ম্যান আর আমার সামনে একটা পিচ্চি হয়ে যায়। আমি ওর সাথে সুন্দর করে, নরম স্বরে কবে কথা বলেছি মনেও নেই। হাত খরচের টাকা থেকে প্রতিদিন একটু একটু করে জমিয়ে আমার জন্য দামি একটা চকলেট আনত। আমার এখনো মনে আছে। পরীক্ষার দুইদিন আগে আমি কেমিস্ট্রি বই হারিয়ে ফেলেছিলাম। অনেক কান্না করছিলাম, কারন আমি অনেক কিছুই মাঝে মাঝে হারাই। ছোটবেলা থেকে পেন্সিল, ইরেজার, শার্প্নার। পেন্সিল বক্স, ওয়াটার পট, এমনকি স্কুলের মাঠে টিফিন খেয়ে? মাঠেই টিফিন বক্স রেখে চলে আসতাম। এখনো এমন হয়। তাই মায়ের বকার ভয়ে বলতেও পারছিলাম না। ছেলেটা তিন বা চার দিন টিফিন না খেয়ে ওই টাকা জমিয়েছিল কোন জরুরী কাজের জন্য। সেটা দিয়ে আমাকে নতুন বই কিনে দিল।

একবার আমার খুব রাগ হল। বৃষ্টি পড়ছিল তখন। আমি রাগে ভিজতে ভিজতে বাসায় এসেছিলাম। আমার রাতে জ্বর হল। এটা শুনে ও এরপরের দিন সারাদিন বৃষ্টিতে ভিজলো। রাতে একটা ইনোসেন্ট বাচ্চার মত বলল
= আমার না! জ্বর আসে নি! কিন্তু অনেক ঠান্ডা লেগেছে। জ্বর আসার জন্য কি করতে হয় জানো?? frown emoticon
——— আমার একইসাথে প্রচণ্ড রাগ আর ভালোলাগা কাজ করছিল। রাগ কারন ও বৃষ্টিতে ভিজেছে আর ভাললাগা কারন, এরকম করে আমাকে কেউ ভালবাসে নি।

ও আমাকে খুব ভয় পায়। এ জন্য কোন কাজ করার আগে চিন্তা করে আমি রাগ হব বা কস্ট পাবো কিনা। মাঝে মাঝে প্রচণ্ড সুখে আমার মরে যেতে ইচ্ছা করে। এত ভাল মানুষ হতে পারে আমার জানা ছিল না। মাঝে মাঝে ও এত ভালবাসে কেন বলে রাগ করি। আমি সত্যিই পাগল! বেশি ভালবাসার জন্য আবার রাগ ও করি!
– এই বান্দর, তোর আমার পিছে ঘুরা ছাড়া কাজ নাই?
= ভাললাগে যে (ভয়ে ভয়ে)
– থাপড়ায়ে তোর ভালবাসা ছুটামু। পড়াশোনার খবর নাই খালি লাটিম এর মত আমার পিছে ঘুরা!
= আচ্ছা, আমি তো ভালই মার্ক্স পাই।
– ভাল হইসে। তো এখন পড়া শোনা সানশেড এ তুলে রাখো।

ভার্সিটি শেষ হলেই আমার ভার্সিটির সামনে চলে আসত। ততদিনে ছেলেটা আমার সাথে এত মিনমিনে কথা বলা ছেড়ে দিয়েছে।ভালবাসা টা ঠিকই আছে, ভয় পেত। কিন্তু একটু কম। আমার না সব কিছুতেই ওর উপর অভিযোগ। তখন বলতাম,
– আমার আগের ছেলেটাই ভাল।
= আগের মানে? আমি কি চেইঞ্জ হয়েছি নাকি?
– হ্যাঁ, হয়েছ তো! আগে আমি বক বক করতাম, তুমি হাসতে! এখন তুমিও গল্প কর আমার সাথে!
= ওমা! এই যে তোমার সাথে একটু কথা বলি তোমার ভাল লাগে না?
আমি তখন মেকি কান্নার ভান করে বলতাম
– না আ আ আ। আমার আগের বোকা ছেলেটাই ভাল।
ছেলেটা তখন শব্দ করে, কি সুন্দর করে হাসত!!! ওর ওই হাসির আওয়াজ শোনার জন্য আমি মরতেও রাজি।

সবকিছু মনের মত! না না! স্বপ্নের মত ছিল! ছেলেটার হঠাৎ ক্যানাডার স্কলারশিপ আসে! খুবই ভাল ছিল সুযোগটা। কিন্তু বাঁদরটা যেতে চাইছিল না। জানতাম চাইবে না!
– কি শুনছি এসব! কেন যাবা না হুউউ???
= যাব না। (নাক, গাল ফুলিয়ে)
– ওমা!!! বাঁদরটা দেখি আবার মুখ ফুলাতেও জানে!
= হুহ, আমি যাব না!
– দেখ, অনেক ভাল সুযোগ এটা। সবাই চেয়েও পায় না। অনেক ভাল একটা পজিশন এ যাওয়ার সুযোগ এসেছে! এভাবে হেলাফেলা করো না। মাত্র ৪ টা বছর তো! তুমি যদি ভাল কিছু কর আমি কত্ত খুশি হব জানো না?
= সবাইকে ছেড়ে যেতে হবে। ওইখানে একা থাকতে হবে। তোমার রাগ দেখা হবে না, ঝগড়াও হবে না।
= এই, ফাজিল, তুই যাবি কিনা বল। নাকি কামলার মত এইখানে পড়ে থাকতে চাস! গাধা নিজের ভাল বুঝিস না?
= বকা দাও কেন? আচ্ছা তুমি আসবে তো?.আমি যখন নিতে আসব?
– কেন আসব না? উফফ বোকা!
= আচ্ছা, তাহলে, যাব।

এরপর কেনাকাটা, ওর যাওয়ার প্রস্তুতির ব্যস্ততায় খারাপ কম লাগত। বাসায় আসলে তখন বুঝতাম কিছুদিন পরে আমি কি হারাতে চলেছি। কিন্তু ওর ভাল টা চিন্তা করে নিজেকে বুঝাতাম। এদিকে ফ্লাইট এর দিন ঘনিয়ে আসছিল। ওইদিন ওর দিকে তাকানো যাচ্ছিল না। বুঝাই যাচ্ছিল। সারারাত ঘুমায় নি, আর কেঁদেছে।
– এই ভ্যাবলা, মেয়েদের মত এত ফ্যাঁচ ফ্যাঁচ করে কাঁদছ কেন?
ও লাল চোখ দুটো আমার দিকে নিয়ে বলল,
= এখনো বকবে?
আমি যে খুব নির্দয়। আজ ও দেখাতে পারলাম না ওকে যে আমার এই রাগ পুরোটাই মিথ্যে।
– ঢং ছাড় বুঝেছ?
= তুমি কাঁদছ কেন?
– কই না তো! আজিব তো আমার বয়ফ্রেন্ড চলে যাচ্ছে কান্না আসবে না??
……… ও হেসে দিলো। যেন, কোন এক রহস্য উদঘাটন করতে পেরেছে। আর আমি অপরাধীর মত কেঁদে যাচ্ছি। ছেলে টা বোর্ডিং পাস নেয়ার এ আগ পর্যন্ত আ। আমার দিকে তাকিয়ে ছিল। ও চোখের আড়াল হওয়ার সাথে সাথে আমি গাড়িতে বসে চিৎকার করে কেঁদেছি। ছেলেটা আরেকটু চেইঞ্জ হবে। অনেক কিছু ওই বিদেশে মানিয়ে নিতে শিখবে। আরেকটু এক্সট্রোভার্ট হবে। একটু বুদ্ধিমান হবে। কিন্তু আমার যে ওর সব কিছুতেই অভিযোগ! আমি আবারো বলতাম, “আমার আগের বোকা ছেলেটাই ভাল ছিল!!”

Written by: Sabiha Saberi (empty vessel)

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s