দানশীল পশ্চিমা ও আমরা

Post ID # 003

পশ্চিমা-দের সাথে আমাদের সবচেয়ে বড়ো পার্থক্য কোথায় জানেন? তারা অনেক বেশি দানশীল, সব কিছু কেমন দান করে দেয়, ফেলে দেয়, কোনো কার্পণ্য করেনা। কয়েক বছর আমেরিকা থাকার সুবাদে আমার একটা নিজস্ব অভিজ্ঞতা শেয়ার করি এই সুযোগে।

ইউনিভার্সিটীর পার্কিং লটের সাথে আমার বাসা ছিলো, ইউনিভার্সিটি এর পাশে সেটাই একমাত্র বিল্ডিং যেখানে ছাত্র-রা অনেকটা ডর্মেটরির মতো সব সুযোগ সুবিধা ভোগ করে থাকতে পারতো। সেখানে দোতলায় আমার রুমে আমরা তিন জন বাঙ্গালী, আর নিচের তলায় দুইজন বাঙ্গালী, যারা আমাদের সিনিয়ার ছিলেন। নতুন নতুন যাওয়ার পর সব কিছুর দাম ডলার থেকে টাকায় কনভার্ট করতাম, আর তারপর কিছু কিনতাম না। আমার মনে আছে পাঁচ ডলার দিয়ে একটা নেইল কাটার কিনে দুই রাত কষ্টে আর চিন্তায় ঘুমাতে পারিনি, ইহা আমি কি করিলাম ভাবিয়া। যাইহোক, কাহিনী অন্যদিকে চলে যাইতেসে, আস্তে আস্তে পয়েন্টে আসবো…
.
ডলার বাঁচানোর নিমিত্তে একদম প্রয়োজনীয় জিনিস ছাড়া কিছুই কিনি না, আর এর চেয়েও বড়ো কথা কিছু যে কিনতে একটু শহরের দিকে যাবো সেই উপায় নেই। কারন আমাদের পাঁচ বাঙ্গালীর কারোই গাড়ী নাই। আর ইউনিভার্সিটি-টা ছবির মতো সুন্দর একটা গ্রামে, যেখানে সন্ধ্যা ছয়টায় সবাই ঘুমিয়ে যায়।
.
ক্লাস শুরু হবার পর অনুভব করলাম একটা চেয়ার আর একটা টেবিল না হলেই না। বাসায় যে বসে একটু পড়বো সেই উপায় নেই, ফ্লোরে ম্যাট্রেসের উপরে আর কতোখন চ্যাগায়া থাকা যায়? কিন্তু চেয়ার টেবিল কিনার কোনো উপায়ও পাচ্ছিলাম না, ডলার এবং যাতায়াত উভয় দিক চিন্তা করে :p
.
তো একদিন দেখি আমার এক রুম-মেট একটা সুন্দর নতুন চেয়ারে বসে পা নাচাচ্ছে, আর নতুন একটা টেবিলে ল্যাপটপ রেখে এক মেয়ের সাথে স্কাইপে ভিডিও চ্যাট করছে। আমি তো অবাক, এইগুলা কিনতে গেলো, আমারে বল্লেও পারতো। যখন তারে ঝাড়ি দিলাম, সে বল্লো, পাগল হইসো মিয়া? আমেরিকায় এইগুলা কিনা লাগে নাকি? নিচে ডাস্টবিনের পাশে কে জানি রেখে গেসে, নিয়ে আসছি। প্রায়-ই কিছু না কিছু রাখে মানুষ, চোখে পড়লে নিয়া আইসো তোমার জন্যে। আমি তারে বল্লাম, ধুর মিয়া মানুষের ফালানো জিনিস আনুম নাকি? পারুম না, আমারে দিয়া হইবোনা। আমার আরেক রুম মেট-ও বাসায় এসে নব্য চেয়ারম্যান-কে অনেক নীতি কথা শুনালো, আমরা গরীব হতে পারি, টোকাই নই, এই চেয়ারে বসে কে কতো কিছু করসে সেইটার সম্ভাবনার কথাও বললো, টেবিল নিয়ে বল্লোনা, কারন টেবিলের উপর কাউকে ঊঠানো সম্ভব না, পাতলা টেবিল, ভেঙ্গে যাবে…।
.
ঠিক দুইদিন পর দেখি সে নীতিকথায় পানি ঢেলে দুই চেয়ার আর এক টেবিল নিয়ে হাজির। আমাকে দেখে একটু লজ্জার স্বরে বললো, ভাই এইটারে কিন্তু আপ্নে খারাপ বলতে পারবেন না, এইটা বরং ভালো, এইটারে বলে রিসাইকেলিং। কারন হইলো, দেখেন এইগুলা খুব অল্প দিন ব্যবহার করা, যারাই বাসা ছেড়ে চলে যায় তারা আসবাবপত্র, ইলেকট্রনিক্স এইভাবে রেখে যায়, যেনো যাদের দরকার তারা ব্যবহার করতে পারে। আমি এবার একটু আশ্বস্ত হলাম, তাহলে আমিও নিয়ে আসবো একটা। প্রায়-ই দেখি কিছু না কিছু রাখা, যেমন প্রিন্টার, ওভেন, ফার্নিচার ইত্যাদি। কিন্তু আমি লজ্জায় আনতে পারিনা। একদিন বৃষ্টির মাঝে ইউনিভার্সিটি থেকে ফেরার সময় কোনো মানুষ ছিলোনা আশে পাশে, সেই সুযোগে ছোট একটা চেয়ার আনতে পেরেছিলাম, টেবিল আমার কপালে ওখানে জুটেনি।
.
যাইহোক, আমি প্রসংগক্রমে পুরাই অপ্রাসংগিক বিশাল একটা কাহিনি বলে ফেললাম, এবার মূল প্রসংগে ফিরে আসি। বলছিলাম পশ্চিমাদের দানশীলতা, ফেলে দেওয়া, বর্জন করে দেওয়ার অভ্যাস গুলোর কথা। তারা শুধু ফার্নিচার অথবা ইলেক্ট্রনিক্স-ই বিরক্ত মুখে ডাস্টবিনে ফেলে দেয়না, তারা সদ্যজাত শিশুকেও বিরক্ত মুখে ডাস্টবিনে ফেলে দিতে পারে। কতো উদার আর দানশীল দেখেছেন?
.
বিয়ের আগে নিজের সতীত্ব যতো তাড়াতাড়ি ফেলে দেওয়া যায়, ততোই ক্রেডিট! গার্লফ্রেন্ড/বয়ফ্রেন্ড-কে ভাল্লাগতাসেনা? দে ফালাইয়া! সংসারে বনিবনা হচ্ছেনা? প্রায় এক বছর একসাথে থেকে ফেলেছেন? ইনাফ ইজ ইনাফ। পৃথিবী -তে সংগী সাথীর অভাব হবে নাকি? দে ফালাইয়া, সংসার এর খেতা পুড়ি। অথচ একটু চেষ্টা করলে হয়তো সব ঠিক হয়ে যেতো…
.
পোলাপান বড়ো হইসে? ঐ বাইর হ ঘর থিকা, তোগোরে আর চিনিনা, ইহাও ফালানির খাতায় চলে যায়… ধর্মে বিশ্বাস করো? হাহাহা পাগল নাকি? ফেলে দাও ফেলে দাও…
.
তাদের সব দান, ত্যাগ অথবা ফালানোর গল্প বললে সারা রাত পার হয়ে যাবে…
.
আমার এই দিক দিয়ে বাংলাদেশী হিসেবে গর্ব হয়… আমরা কিছু সহজে ফেলে দিতে চাইনা, ত্যাগ করতেও চাইনা… খাট-টা পুড়ান হইসে…? উহু আম্মা, ফেল্বোনা… এইখাটে শুইতে শুইতে বড়ো হইসি… একটু বার্নিশ কইরা ফেলি আম্মা? টেবিল ফেল্বা? পাগল হইলো? এই টেবিলে বইসা মেট্রিক, ইন্টার দিসি… কতো স্মৃতি মা…
.
সংসার অথবা রিলেশানে সমস্যা…? আরে এইটা কোনো ব্যাপার না… এইগুলা সংসারে অথবা রিলেশানে হয়-ই,একটু চেষ্টা করলে আর টাইম দিলেই ঠিক হয়ে যাবে । আমরা রিলেশান ছেড়ে যাইনা, পারতপক্ষে সংসার ভাঙ্গিনা । আমরা চেষ্টা করি,আমরা আরেকটু চেষ্টা করি।আমরা আরেকটু ধৈর্য ধরি…
.
আমি দানশীল, ত্যাগি, ফেলেদেওয়াকারী হবোনা, হতে চাই-ও না…… এটাই আমার গর্ব…
.
Writer: Dipu Zaman

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s