একজন হুজুরের জীবন

Post ID # 005

সব তালিবে ইলমের জন্যে বৃহস্পতি ও শুক্রবার ছিল ঈদের দিন। কিন্তু আমাদের ছিল ‘কোরবানীর’ দিন। মাদরাসা ছুটি হলেও আমাদের ছুটি নেই। হুজুর সেদিনও পড়তে বসাতেন। এমনকি আসরের পরও। পুরো সপ্তাহ জুড়ে আমাদের মুনাজাতের বিষয়বস্তু থাকতো একটাই: হুযুর যেন এই সপ্তাহ বাড়িতে যান। তাহলে আমাদের অনেক কাজের সুযোগ হয়:
ক: বৃহস্পতিবার জোহরের পর বল খেলা। গোল্লাছুট খেলা।
খ: আসরের পর ভাত উঠিয়ে চরে বেড়ানো। দীঘির পাড়ে গিয়ে বসা। শেয়ালের গর্ত খুঁজে বের করা। পুকুর পাড়ে কচ্ছপের ডিম বের করা।
গ: মাগরিবের পর দীর্ঘ গল্প-গুজবে বসা। কিছু একটা খেলা। শে‘র-কবিতা কাটাকাটি খেলা। ইত্যাদি।
জুমাবারে যে কতো পরিকল্পনা থাকতো, সেটার গল্প বলার জন্যে কমপক্ষে একফর্মা লাগবে।

হুযুর যে সপ্তাহ শ্বশুরবাড়ি যেতেন,সেটাই ছিল আমাদের ‘পিক আওয়ার’। এক সপ্তাহ আগে থেকেই আমরা বুঝতে পারতাম আগামী বৃহস্পতিবার কী ঘটতে চলেছে। শনিবার থেকেই চাপা প্রস্তুতি শুরু হয়ে যেতো হুযুরের। সবচেয়ে সুন্দর পাঞ্জাবীটা ধুয়েমুছে তকতকে করে রাখতে বলতেন। বুধবারে বিকেলে বটতলা গিয়ে কয়লার ইস্ত্রি-মেশিনে দুইটা জামা ‘ডলাই’ দিয়ে আনতে বলতেন।
শনিবার সকালে আমরা ফজরের পর হুযুরের দিকে শ্যেনদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতাম, চুপি চুপি। পড়ার ভান করে। কান খাড়া করে রাখতাম খরগোসের মতো। হুযুর ডিম সেদ্ধ করে আনতে বলেন কি না! ডিম তো নয় যেন ঈদের চাঁদ! ডিমসেদ্ধ মানেই হুযুর আগামী বৃহস্পতিবার জোহরের পর, আনন্দের অথৈ সাগরে ভাসিয়ে, আল্লাহর নাম নিয়ে বেরিয়ে পড়বেন শ্বশুরবাড়ির উদ্দেশ্যে।

শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার প্রস্তুতি হিশেবে, প্রতিদিন একটা করে ডিম। সাথে মধু কালিজিরা। চিরতার পানি। ইসবগুলের ঘন্ন শরবত তো ফরয। কোনও কোনও সপ্তাহে ইসবগুল আর ডিমকে গরম দুধে ভাল করে মিশিয়ে খেতেন। প্রতিদিন রাতে শোয়ার সময় মিষ্টি জর্দা দিয়ে একটা পান। প্রতি নামাযের সময় অত্যন্ত যত্ন করে মিসওয়াক করতেন। ওজু শেষে কামরায় এসে ছোট্ট আয়নায় দীর্ঘ সময় লাগিয়ে পরখ করতেন, কোথাও কোনও ময়লা বা দাগ লেগে আছে কি না। বারবার মুখের কাছে হাত নিয়ে সজোরে শ্বাস ফেলে যাচাই করতেন, দুর্গন্ধ বের হয় কিন। এপরর মুখে এলাচের একটা দানা পুরে, কখনো বা একটা লঙয়ের কোনা পুরে মসজিদে যেতেন।
শনিবার থেকে শুরু করে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত প্রতিদিন কমপক্ষে আধাঘন্টা সময় লাগিয়ে গোসল করতেন। ভাল একটা সাবান তোলা থাকতো। বিশেষ সপ্তাহেই সেটা খোলস ছেড়ে বাইরে আসার সুযোগ পেতো। সাথে আমাদের একজনকে যেতে হতো। লম্বা একটা সাঁতার দিয়ে হুযুর সিঁড়ির একপাশে বসতেন। শুরু হতো ভেজা গামছায় সাবান মাখিয়ে পিঠ ডলার পালা। ঘষতে ঘষতে হুযুরের পিঠটা লাল হয়ে যেতো, তবুও বলতেন:
-বালা করি চা, ছাতাটাতা রই গেছেনি কোনও!
পিঠ পরিস্কার করার পর, দেখতে হতো পিঠে কোনও ঘামাচি বা অন্য কিছু দাগ আছে কি না, থাকলে সেটা দূর করার চেষ্টা-কসরত চলতো কিছুক্ষণ। এসব করতে অনেক মেহনত-খাটুনি লাগতো! কিন্তু এর বিনিময়ে যে আনন্দের বাহার পাওয়া যাবে, সেটার কোনও তুলনা হয়? হুযুর যাবেন শ্বশুর বাড়ি, আর দু’টো দিনের জন্যে মাদরাসাই হবে আমাদের ‘হৌরবাড়ি’!

খাওয়া-দাওয়ার আয়োজনও ভিন্ন হতো, বেশি করে ভাত খেতেন। মাতবাখ থেকে ডাল যা দিতো, সবটাই ঢকঢক করে খেয়ে ফেলতেন। বাজার থেকে মৌসুমী ফল-পাকুড় কিনে আনাতেন। মাদরাসার গাছ থেকে ডাব কিনে খেতেন। মাঝেমধ্যে পুকুর থেকে মাছ ধরিয়ে কামরায় বাড়তি রান্নাবান্নার আয়োজন করতেন। পুরো সপ্তাহ আর আমাদের পিটুনি খাওয়ার ভয় থাকতো না। আমাদের মেজাজও থাকতো ফুরফুরে।

যতই দিন ঘনিয়ে আসতো, হুযুরের মধ্যে চাপা অস্থিরতা আর মুচকি হাসির বহর বেড়ে যেতো। আসরের পরে আমাদেরকে নিয়ে হাঁটতে বেরোতেন। গল্প করতেন। বুযুর্গানে কেরামের গল্প। নবীগনের গল্প। বিভিন্ন প্রশ্ন করে উত্তর দিতে বলতেন। বেশ আমুদে আর রসিক সময় কাটতো আমাদের! অন্য সপ্তাহের মতো মাগরিবের পর পড়া ধরার ভয় নেই। পড়া শোনানোর চাপ নেই। হাতের লেখায় বানানে ভুল করলেও বকুনি বা বেতের বাড়ি খাওয়ার আশংকা নেই।

বৃহস্পতিবার এলে হাজারো কাজের চাপ এসে যেতো। সকালে ঘণ্টা শুরু হওয়ার আগেই হুযুর, প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়ে ‘হাম্মামে’ চলে যেতেন। আমরা এদিকে কাঁচি-আয়না ও ব্লেড হাতে প্রস্তুত থাকতাম। কান পরিষ্কার করার আঙটাও থাকতো। হুযুর ফিরলেই গোঁফ ছেঁটে দেয়া শুরু করতাম। ওটা শেষ হলে কান পরিষ্কার করার পালা আসতো। তারপর হুজুর কিতাব দেখা শুরু করতেন, আমরা হাতের নখ ও পায়ের নখ কেটে দিতাম। অতি যত্নে। পরম শ্রদ্ধায়। এরপর হুযুর অন্য কাজগুলো নিজেই করতেন। তারপর গোসল। অন্যদিনের তুলনায় আজ আরো ভালো করে গোসল করতেন। সাথে করে একটা বালতি নিয়ে যেতাম। হুযুর ডুব দিয়ে উঠতেন। গা-টা ভাল করে ডলে দেয়ার পর, বালতিতে করে ডীপকল থেকে পানি নিয়ে আসতাম। হুযুর সেখানে সামান্য আতরের ফোঁটা ফেলে দিতেন। তারপর ভাল করে মিশিয়ে আমরা মগে করে চিকন নালিতে ধীরে ধীর পানিটা শরীরে ঢালতাম। পরম আরামে হুযুর বসে থাকতো। কখনো বা গুনগুন করে মসনবীর শে‘র পড়তেন। কখনো খাজা আযীযুল হাসান মাজযুব রহ, কখনো আল্লামা ইকবাল! বিরল সময়ে গালিবের শে‘রও আওড়াতে শুনেছি!

গোসল শেষ হতে না হতেই ঘণ্টা বেজে যেতো। দুদ্দাড় করে সবাই দরসে চলে যেতাম। অন্যদিন হুযুর কিতাবের সাথে লম্বা একটা বেত নিয়ে যেতেন। আজ আর সেটা বের হতো না। হুড়মুড় করে ‘ত্রিশমিনিট’ করে বৃহস্পতিবারের বিশেষ ঘণ্টাগুলো শেষ হয়ে যেতো! নামাযের আগে দুপুরের খাবার। হুযুর এই বেলা বেশি কিছু খেতে পারতেন না। সামান্য কিছু মুখে দিয়েই হাত ধুয়ে ফেলতেন। একটা খেলাল নিয়ে বসতেন। আয়নায় দেখে দেখে খেলাল করতেন। কখনো বা সুতো দিয়েও দাঁত পরিষ্কার করতেন। কুলি শেষ করে বসতেন আয়না নিয়ে। নাকের পশম ঠিক আছে কি না, হাতের নখগুলো মসৃণ আছে কি না দেখতেন। যাতে পুরোপুরি পরিপাটি হয়েই হাজির হতে পারেন।

জুতোটা ঠিক করতে বলতেন। আমরা তো সেটাকে রীতিমতো আয়নার মতো করে রেখেছি। তবুও হুযুর কিভাবে যেন সেটাতে ধুলোর আস্তরণ আবিষ্কার করে ফেলতেন। অথচ আমরা জুতোর ওপরতলা তো বটেই, সুখতলা পর্যন্ত জিব দিয়ে চাটার মতো পরিষ্কার করে রেখেছি!

নামায শেষ। এবার হুযুর পোষাক পরবেন। প্রথমেই উদোম হতেন। আমরা পাউডার মেখে দিতাম পুরো শরীরে। পোশাক পরতেন অতি সতর্কতার সাথে। কোথাও যেন একটা ভাঁজও না পড়ে। ব্যগ আগেই গুছিয়ে রেখেছি। তুবও শেষ বারের মতো চেক করতে বলতেন। এলাচ দানা দিয়েছি কি না। লঙ আছে তো? আতরের শিশিটা ব্যাগের পকেটে আছে? পাউডার? কুল্লিয়াতে ইকবালটা কোথায়, ওটা দেখছি না যে?
-ওহ! ভুলে গেছি হুযুর!
-সব্বোনাশ! তাড়াতাড়ি করো!

সব প্রস্তুতি শেষ। এবার রেলস্টেশনে। দৌড়ে গিয়ে আগেই একটা রিকশা ডেকে এসেছি। ট্রেনের বেশি দেরী নেই, তাই রিকশা ডাকা। না হয় স্টেশন কাছেই। যেতে না যেতেই ট্রেন এসে যেতো। কোনও রকমে হুযুর উঠে যেতেন। আমরা দৌড়ে দৌড়ে জানলা দিয়ে ব্যাগটা ‍গুছিয়ে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলতাম। হুযুর মুচকি হেসে জোর গলায় বলতেন:
-শতানী বেশি করিচ্ছা! নামাযগান ঠিক করি হইছ!
তখন সত্যি সত্যি আমাদের খারাপ লাগতো! মনে হতো কী যেন নাই হয়ে গেছে! অথচ হুযুর একদিন পরেই মহা সমারোহে ফিরবেন।

সবসময় দিনগুলো এমনতরো যেতো না। ভিন্নরূপেও জীবন এসে ধরা দিত। হুযুরের স্ত্রী বাবার বাড়িতে থাকলে, প্রতি সপ্তাহে তো যেতে পারতেন না। প্রায় একমাস পর, একবার যাওয়া পড়তো। তখন বুঝতে না পারলেও এখন বুঝতে পারি, হুযুর কেন যেতেন না। পকেট খালি থাকতো!
হুযুর বোধ হয় মাদরাসা থেকে প্রতি মাসে ১২’শ টাকার মতো পেতেন। তাও দু’তিন মাস বাকী পড়ে যেতো। তারপরও হুযুর চেষ্টা করতেন ধারকর্জ করে হলেও একবার ‘ওবাড়ি’ থেকে ঘুরে আসতে। যখন বকেয়া বেশি পড়ে যেতো, পুরো সপ্তাহের প্রস্তুতিতে ভাটা নামতো। আগের মতো খাওয়া-দাওয়া হতো না। ডিম কেনার টাকা থাকতো না। বুধবারে ক্লাশ শেষ করেই হুযুর ছাতা নিয়ে কোথাও চলে যেতেন। আমরা বুঝতে পারতাম হুযুর তার এক ব্যবসায়ী-বন্ধুর কাছে টাকা হাওলাত করতে গিয়েছেন। আমরা মাগরিব পর্যন্ত রাস্তার ধারে বসে থাকতাম। দূর থেকে হুযুরকে দেখা যায় কি না।
তাঁর হাঁটা দেখেই বুঝতে পারতাম ‘ধার’ পেয়েছেন কি পাননি! যেদিন দেখতাম হুযুর ছাতা বন্ধ করে ধীরে ধীরে নতমস্তকে হাঁটছেন, বুঝে যেতাম, হয় বন্ধুর সাথে দেখা হয়নি, না হয় করয হয়নি। হুযুরের ভীষণ শুকিয়ে যাওয়া মুখ আর চশমার ভেতরে থাকা ‘কেমন কেমন’ অসহায়ভাবে চেয়ে থাকা চোখগুলো দেখে, এত কান্না পেতো! এত কান্না পেতো! মনে হতো চীৎকার করে কাঁদি! আমাদের হুযুর এত গরীব কেন? আমাদের কাছে অনেক টাকা নেই কেন?

আমরা হুযুরকে না জানিয়ে, গোপনে একটা কাজ করতাম। যে সপ্তাহে হুযুর শ্বশুরবাড়ি যাবেন বলে মনে হতো, আমরা কয়েকজন নিজেদের জমানো টাকা, চুরি করে হুযুরের পকেটে রেখে দিতাম। বাজারে পাঠালে আমরা চার টাকার জিনিসকে দুই টাকা দিয়ে কিনে এনেছি বলতাম। বাকি দুই টাকা নিজের থেকে দিয়ে দিতাম। হুযুর বুঝতে পারতেন কি না জানি না। হুযুরের টাকা জমানোর একটা ব্যাংক ছিল, হাত একদম খালি হয়ে গেলে, হুযুর সেটা ভাঙতেন। আমরা সময় সময় সেটাতেও টাকা ফেলে রাখতাম। কতোই বা ফেলতে পারতাম! আমাদের কাছেও অত টাকাপয়সা থাকতো না!

তখন ছাত্রজীবনেও কিছু কিছু বুঝতে পেরেছিলাম। আর্থিক অনটনটা কতো কষ্টের! এখন ওস্তাদ হওয়ার আরো ভাল করে হাড়ে হাড়ে টের পাই! আমাদের কওমী মাদরাসার হুযুরগন কী কষ্টটাই না করেন! প্রতিটি পয়সাকে কী হিশেব করে খরচ করতে হয়! জুতো হারিয়ে গেলে নতুন একজোড়া জুতো কেনার জন্যেও টাকার যোগাড় হওয়ার অপেক্ষায় থাকতে হয়। এসব তো নিত্য অভিজ্ঞতাতেই দেখা ও অনুভব করা!

মাগরিবের পর হুযুর কিতাব নিয়ে বসতেন। বারবার কিতাবের পাতা ওল্টাতেন! কিছু পড়তে পারতেন বলে মনে হয় না। একটু পরপর জানলা দিয়ে ওপাশের বড় পুকুরের পানিতে মাছের ঘাই দেখতেন অন্ধকারে। রাতে ভাত খেতেন না। এশার নামায পড়েই খাতা-কলম নিয়ে বসতেন। চিঠি লেখার বিশেষ একটা প্যাড ছিলো। নীল রঙের। মধ্যখানে ফুলের ছাপ দেয়া। আমাদেরকে ঘুম পাড়িয়ে, প্রায় সারা রাত জেগে, হুযুর চিঠি লিখতেন। হুযুর কখনো তাহাজ্জুদ বাদ দিতেন না। চিঠি শেষ করে নামাযে দাঁড়াতেন! চিঠিলেখার দিনটাতে হুযুর মুনাজাতে এমন হাউমাউ করে কাঁদতেন, আমাদের মতো ছোট মানুষটিও বুঝে যেতাম! এই কান্নায় শুধু খোদাপ্রেমই নয়, অন্যপ্রেমও লুকিয়ে আছে। এ-কান্না আল্লাহর ‘বিসালের’ আকুতির পাশাপাশি একজন আপন মানুষের ‘ফিরাকের’ হাহাকারও মিশে আছে!

চিঠি লেখার সপ্তাহটা কষ্টের হলেও আমার জন্যে কিঞ্চিত আনন্দেরও ছিল বৈকি! কারণ চিঠিটাতে আমাকে বয়ে নিয়ে যেতে হবে! হুযুর যেতে না হয় কিছু টাকা প্রয়োজন হয়, শ্বশুরবাড়িতে জামাই যেতে যা লাগে আরকি! কিন্তু চিঠি নিয়ে যেতে তো খরচ লাগে না। শুধু ভাড়ার টাকাটা হলেই হয়।

বৃহস্পতিবারে জোহর পড়েই, বিমর্ষ হুযুর কিছু সময়ের জন্যে সরস হয়ে উঠতেন। আমাকে ভাল করে খাইয়ে-দাইয়ে প্রস্তুত করতেন। শ্বশুরবাড়ির দিকের কিছু ছাত্রও মাদরাসায় পড়ে, তারা প্রতি সপ্তাহে বাড়ি যায়। তাদের কারো সাথে আমাকে পাঠাবেন। এমনটাই ঘটে সব সময়। হুযুর সাথে করে স্টেশনে নিয়ে যেতেন। নিজেই ট্রেনে উঠে আমাকে বসিয়ে জানলার কাছে গিয়ে দাঁড়াতেন। একদম ট্রেন ছাড়ার মুখে মুখে পকেট থেকে চিঠিটা বের করে দিয়ে বলতেন:
-তোমার খালাম্মাকে দিও, আর কারো হাতে দিও না! (শুধু এইদিনই তুমি করে বলতেন, এই সময় বোধহয় সবকিছুই ‘তিনিময়’ হয়ে যেতো, তাই)!

হুযুর নেমে পড়তেন ট্রেনের হুইশেল দিলেই। সাথে সাথে চলে যেতেন না। আমি জানলা দিয়ে গলা বাড়িয়ে দেখতাম যতক্ষণ দৃষ্টিসীমায় ট্রেন থাকে, হুযুর দাঁড়িয়ে থাকতেন!

একবার চিঠি নিয়ে যাচ্ছি, যে বড় ছাত্রটির সাথে আমাকে হুযুর পাঠিয়েছিলেন, সে ছিল চঞ্চল প্রকৃতির। তার আবার বিশেষ শখ হলো ট্রেনের ছাদে চড়ে যাওয়ার। তার সুবিধে মতো ছাদে চলে গেলো। আমাকে রেখে গেলো তার ব্যাগের কাছে। আমি বসে আছি! এমন সময় এক লোক এলো। কেমন যেন দৃষ্টি! সন্দেহজনক। নানা প্রশ্ন করতে শুরু করলো। একথা সেকথার ফাঁকে আমার নাড়িনক্ষত্র সব জেনে ফেললো। এটাও জানলো আমি হুযুরের চিঠি নিয়ে যাচ্ছি। লোকটা বেতমিজের মতো বললো:
-খোকা! চিঠিটা ঠিকমতো রেখেছো তো! না হলে হারিয়ে যাবে! যা ভীড় ট্রেনে! তুমি এক কাজ করো, চিঠিটা আমার কাছে দিয়ে দাও! নামার সময় দিয়ে দেবো!
আমি যতই না না করি, ব্যাটা ততই জোর করতে থাকলো! একপ্রকার জোর করেই নিয়ে নিল চিঠিটা! বেহায়ার মতো চিঠিটা খুলে পড়তে শুরু করে দিল! বেশ আওয়াজ করে!

আমার দুলালী!
এমাসেও আসতে পারলাম না! কারণ আর কী বলবো, তুমি তো জানোই! আমি চেষ্টার কমতি করিনি! কিন্তু কোথাও টাকার যোগাড় হলো না! তুমিও তো হুযুরের মেয়ে, তুমি বুঝবে! গতবার আসার সময় তোমাকে কিছু দিয়ে আসতে পারিনি শুধু নাকের ওপর…………………..!!!

এ-পর্যন্ত পড়ে লোকটা থামলো! বেমক্কা প্রশ্ন করলো:
-কি রে তোর হুযুর কি হিন্দু মেয়ে বিয়ে করেছে?
-কেন হিন্দু বিয়ে করবে কেন? মুসলমান বিয়ে করেছে!
-ধুর বোকা! মুসলমান মেয়ের নাম আবার ‘দুলালী’ হয়?

কতোদিন হয়ে গেছে, আজো ঘটনাটার কথা মনে হলে হাসিও পায় আবার রাগও হয়। জীবনে যে কয়বার মাথায় খুন করার মতো রাগ চেপেছিল, সেবার ছিল তার প্রথমবার! অত ছোট বয়েসেও। বেহায়া লোকটা কিভাবে করতে পারলো এমন কাজ?

ট্রেন থেকে নামলে বাড়ি যাওয়ার জন্যে রিকশায় চাপতে হতো। গ্রামের মেঠো পথ। হেঁটেই যায় সবাই। তাড়াতাড়ি পৌঁছার জন্যে রিকশা নেয়া। অনেক দূউর থেকে বাড়িটা দেখা যেতো। হুযুরের স্ত্রী মাসের হিশেব থেকে বুঝতে পারতেন এ-সপ্তাহ ‘তিনি’ আসবেন! তাই দুপুরের পর থেকেই উত্তর দিকের পুকুর পাড়ে এসে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতেন! রাস্তার মোড় পার হয়ে রিকশা যখন বাড়ির সামনের দিকে আসতো, আমি টের পেতাম, তিনি দাঁড়িয়ে আছেন। আড়ালে কোথাও! আমাকে দেখে তার অতিপবিত্র নিষ্পাপ মুখখানা মুহূর্তেই শুকিয়ে এতটুকুন হয়ে যেতো! আশাভঙ্গের ধাক্কা সামলাতে বেশ বেগ পেতে হতো। আমাকে আড়াল করে, শাড়ির আঁচলে চোখ মুছতেন। আবার আমার প্রতি অবহেলা যাতে না হয়, সেদিকেও তীক্ষ্ণ নযর থাকতো! কেউ দেখে ফেলার আগেই টুক করে চিঠিটা দিয়ে দিতাম। তিনি সেটা অতিদ্রুত ‘নির্দিষ্ট’ স্থানে রেখে দিতেন। তারপর আমার হাত ধরে ঘরের দিকে রওয়ানা দিতেন।
হুযুরের স্ত্রীর ভাবীরা ছেঁকে ধরতো! চিঠিটা বের করার জন্যে। তিনি অত সহজে দমবার পাত্রী নন! ভাবীরা জানতেন চিঠিটা কোথায় লুকানো হয়েছে! কিন্তু সবার সামনে ওখান থেকে নেয়াও যায় না! তাই ওনাকে টেনে ঘরে ঢুকিয়ে ফেলতেন!

শনিবার ভোরে ভোরে চলে আসতে হবে। বৃহস্পতিবারে আসার পর থেকে, আদর-আপ্যায়নের যে বহর, তাতে মনে হতো, জামাই হুযুর নন, আমিই জামাই! কতো কী রান্না করতেন! কতো আদর-সমাদর করে হুযুরের শ্বাশুড়ী এটা-সেটা পাতে তুলে দিতেন! ছোট্ট ছিলাম বলে ভাবীরা সেকি মস্করা করতেন!

শুক্রবার রাতে ও-বাড়ির কেউ ঘুমুতেন বলে মনে হয় না। পরদিন সকালের ট্রেন যেন ধরতে পারি, হুযুরের শ্বশুর রাতেই একটা পরিচিত রিকশাকে বলে রাখতেন। আর মহিলারা রাত জেগে পিঠাপুলি বানাতেন। মোরগ জবেহ করতেন। সকালে আমাকে ভাল করে খাইয়ে দিয়ে, সাথে দিয়ে দিতেন ঢাউস এক টিপিন ক্যারিয়ার! আর প্লাস্টিকের ব্যাগে হরেক রকমের পিঠা ও নাশতা।

আমাকে বিদায় দেয়ার সময় দুই ভাবী ওনার সাথে একেবারে লেপ্টে থাকতেন! উনিও ভীষণ চালাক! একেবারে শেষ মুহূর্তে ঘর থেকে বের হওয়ার সময়, হাওয়া না শূন্য, কোত্থেকে যেন চিঠিটা বের করে দিতেন! ভীষণ কান্নামাখা দৃষ্টিতে বিদায় দিতেন। স্বামীর কথাই মনে পড়ে যেতো হয়তো বা!
মাদরাসায় পৌঁছলে, হুযুর একের পর এক প্রশ্ন করতেই থাকতেন। কে কী বলেছে? ‘উনি’ আর কিছু বলেছেন কি না! ভুলে কোনও কথা বাদ পড়ে গেল কি না! এ-কথাবার্তার মধ্যেই হুযুর চিঠিটা বারদশেক পড়ে ফেলেছেন! কমপক্ষে আগামী এক সপ্তাহ প্রত্যহ চিঠিটা না হলেও পঞ্চাশবার পড়বেন! আমাদেরকে লুকিয়ে! পেন্সিল লাইটের আলোতে গভীর রাতেও পড়তে দেখেছি! হুযুরের চোখের কোনটাও চিকচিক করতে দেখেছি কি?

লিখাঃ Atik Ullah Atik

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s