ইন্টার্নী করার সময় একদিন…

Post ID # 009

ইন্টার্নী করার সময় একদিন খুব করে জানলাম আমি ” Lower” শব্দটার উচ্চারন পারি না। বহু মানুষের সামনে স্যার প্রায় চিবিয়ে চিবিয়ে উচ্চারনটা শেখালেন। ওয়াশরুমে গিয়ে দেখি চোখ জোড়া শুধু লাল হয় নি, মুক্তার মত স্বচ্ছ পানির কনা চিকচিক করছে। বুড়ো বয়সে মনটা ভেংগে প্রায় গুড়িয়ে গেল।
……
রেটিনার স্টুডেন্ট থাকার সময় খুলনা মেডিকেলের এক ভাইয়া মূত্রতন্ত্র পড়িয়েছিলেন। আমি কিছুই বুঝি নি। ক্লাশ শেষে বেকুবের মত প্রশ্ন করেছিলাম ::: ভাইয়া, Urine মানে কি???”
পুরো ক্লাশে যেন বিষ্ফোরোণ ঘটেছিল। হাঁসতে হাঁসতে কেউ কেউ বেঞের উপর শুয়ে পড়েছিল। দুই দিন শুয়ে ছিলাম আর তিনদিন কোচিংয়ে যাই নি। তারপর চোরের মত যেদিন হাজির হলাম, লজ্জাকর এক কান্ড ঘটে গেল।
আমার হাত ঘড়ি ছিল না। বাড়ি থেকে আসার সময় ছোট আপা তার স্টিলের ঘড়ি আমাকে দিয়েছিল। স্টিলের ঘড়ি পরে সেদিন গিয়েছিলাম। ফুলকাটা ঘড়িগুলো যে শুধু মেয়েদের হয়, খুব বোকা আর গ্রাম থেকে আসা ছেলেগুলো যে না জেনে তা হাতে পরে আমি জানতাম না। ক্লাশে আর এক দফা সার্কাস হয়ে গেল। সেদিন দুপুর থেকে প্রায় মাঝ রাত অবধি ম্যাচের ছাদে একা একা বসেছিলাম।
……..
মেডিকেলে ভর্তি হলে বড় ভাইয়েরা দলবেধে বিরিয়ানি খেতে নিয়ে গিয়েছিলেন। বিল দেওয়ার সময় বিপত্তি ঘটল। একজনকে ছাড়া বিল করা হয়েছে। দলের ভিতর থেকেও আমাকে ওদের মত মনে হয়নি। ওয়েটার আমাকে দেখিয়ে বলেছিল:: ও কি আপনাদের সাথে??? মনে আছে
রিক্সায় বসে প্রায় সারাটা পথ সেদিন চোখ মুছেছিলাম।
…..
এস এস সির পর ছোট মামা খুব ধণী লোক এক আত্মীয়ের বাসায় নিয়ে গিয়েছিলেন। হাত ধুঁতে যেয়ে বেসিনের কল ভেংগে ফেলেছিলাম। কাজের মেয়ে সহ আটজন সদস্যের সেই বাসায় আটবার আমাকে শেখানো হয়েছিল কল কিভাবে ছাড়তে হয়। চার বছর পর সেই সোফাতেই আবার বসেছিলাম তাদের পছন্দের পাত্র হিসেবে। এ যাত্রায় আমার রুচী অবশ্য সায় দেয় নি।
……..
দোষগুলো আমার নয়। যে ছেলে ক্লাস টেনে নয় জনের সাথে , আর ইন্টারমিডিয়েটে উনিশ জনের সাথে পড়েছে , সে বহু ইংরেজি শব্দ জানবে না, বহু শুদ্ধ উচ্চারন জানবে না এটাই সত্য।
কিন্তু ওটি রুমে রুগী যখন আমাকে প্রশ্ন করে::: Excuse me doctor, আপনার বাসা খুলনা? আপনি ঝর ঝরা ভাষায় কথা বলেন, দশ জন এক জায়গায় থাকলে বাকি নয় জন আপনার কথাই শুনবে। “”
.
আমি তখন ধাধায় পড়ে যাই। এই ওটি রুমে ঢুকতে যেয়ে, এই মাস্ক, ক্যাপ মাথায় পরতে যেয়ে জীবন টা আর জীবন থাকে নি, হাজার হাজার এলোমেলো বাঁক পাড়ি দিতে হয়েছে। স্বাভাবিক জীবনে যারা মন্থর, যারা বেশি বোকা, তাদের নিজেদের জীবনে এরা অনেক বেশি সচল। বিধাতা কাউকেই ঠকায় না।
……
বাবার চেয়েও বড় কেউ যখন কাঁধে হাত রেখে বলে :: এরা স্মার্ট ছেলে, এরা সার্জন। তখন সাত বছর আগের ওয়েটারের কথা মনে পড়ে, আমি আর বোকা নই, আমি আর গেয়ো নই। গলায় ময়লা মাফলার পেচিয়ে আর রাস্তায় যাই না।
…..
প্রতিটা বিন্দু সময়ের হিসাব রাখেন তিনি, যিনি সময় সৃষ্টি করেছেন। সময়ের ফেরে আমরা কেউ বোকা, কেউ অতি চালাক। কেউ ময়লা মাফলার পরে, কেউ বিদেশী জ্যাকেট । Urine এর মানে না জানলে কেউ অমানুষ হয়ে যায় না। কিন্তু বিশাল আকাশের উপরে যিনি থাকেন, উনি প্রতিটা হাঁসি আর প্রতি ফোটা চোখের হিসাব রাখেন। সে হিসেবে কেউ ঠকে না।
.
ভুতুড়ে ম্যাচের স্যাঁত স্যাঁতে রুমে ৬০ ওয়াটের অনুজ্জ্বল হলুদ আলোয় আমি আর কামাল যখন গোবারের ঘুটি আর কাঠের গুড়ো দিয়ে আধা সিদ্ধ ভাত রান্না করতাম, সেই সন্ধায় ও আমার মনে হয় নি বহু পরে একদিন আমি আর বোকা থাকব না।
——-
.
.
লেখাঃ Dr abdur rob
FCPS part 2,surgery

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s