স্মৃতিগুলো খেলা করে

Post ID # 012

আমি এখন যে মেয়েটির পাশে বসে আছি তার নাম নিনিতা। নিনিতার পরনে বিয়ের সাজ। এই বিয়ের সাজ নিয়ে নিনিতা একটু পরপর হাতে থাকা টিস্যু পেপার দিয়ে চোখ মুসছে। সম্পর্কের ৪ বছরে একটি দিনেও এই মেয়েকে আমি কাঁদতে দেখিনি। আজ কাঁদতে দেখে বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
.
আমি চোখে গোল গোল সাইজের দুটা চশমা ঝুলছে। চশমা গ্লাসের ফাঁকে নিনিতার চেহারাটা কেমন যেন অস্পষ্ট। আমি হাত দিয়ে চোখ মুছলাম। নিনিতা রেগে তাকালো
.
– উফফ প্লিজ তুমি আবার ভ্যা করে ছেড়ে দিয়ো না
.
ধমকের সুরে বলল নিনিতা। পরক্ষনেই চোখের কোনে জল মুছলো। আমি চোখ থেকে হাত সরালাম। নিনিতার সামনে কাঁদা যাবে না। এই মুহুর্তে অজস্র স্মৃতি মস্তিষ্কে ঘুরছে। একটা স্মৃতি বড্ড বেশি স্পষ্ট।
.
কোন একটা খারাপ সময়ে দুজন দুজনকে সামলাতে গিয়ে প্রেমে পরে গিয়েছিলাম দুজন। প্রেমে রাগ/ঝগড়া/অভিমানের পর্ব চুকিয়ে এক রাতে আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম দেখা করব। ক্লাস ফাকি দিয়ে ড্যাট নিনিতার একদম পছন্দ না
_”ক্লাস সেরে তবেই আসবে”_ রাগিরাগি কন্ঠে সেইদিন বলেছিল নিনিতা
.
সে রাতে গল্প বুনতে বুনতে ঘুমিয়েছি শেষ রাতে। ঘুম ভেঙ্গে দেখলাম ক্লাস শুরু হতে মিনাট ২০ এক বাকি। হুরমুর করে ছুটলাম পেটে কিছু না দিয়েই। ক্লাস শেষে বের হয়ে দিলাম ছুট। সময় গড়িয়েছিল অনেক। পাক্কা ২০ মিনিট দেরিতে হাজির হয়ে দেখলাম কিছু দূরে নিনিতা দাড়িয়ে। সকাল থেকে শরীরের ক্লান্তি গুলো নিমিষেই দূর হলো নিনিতার কাজল দেয়া চোখের দিকে তাকাতেই। আমি যখন মায়াবী মেয়েটির মায়াতে হারাচ্ছিলাম তখন ই চোখ নাচিয়ে কিছু দেখালো নিনিতা। টিফিনে করে বানিয়ে আনা নাস্তা
.
– সকালে না খেয়ে ক্লাসে ছুটেছিলে?
.
উপর নিচ মাথা দুলালাম আমি। নিনিতা নাস্তা বাড়িয়ে চোখ রাঙ্গিয়ে তাকালো। ঐ রাঙ্গানোর অর্থ বুঝি আমি , “এখন ই সব শেষ করতে হবে”
.
ভালোবাসা বলতে তখন টিভি নাটকেই দেখেছি। প্রথম বারের মতো অনুভব করলাম। এই অনুভবে আমার যত সমস্যা। চোখ ঝাপসা হয়ে এলো। আমি চোখ মুসতেই নিনিতা চোখ রাঙ্গিয়ে বলল
.
– ক্যান্দো রাম , কাঁদে না।
.
প্রচন্ড খামখেয়ালী অলস ছেলেটি জীবন নিয়ে হুট করে সিরিয়াস হয়ে গেল কারো সংস্পর্শে । এমন কারো স্পর্শ যাকে ছাড়া একটা সময় ভাবতাম আমি অস্তিত্বহীন। নিনিতা এসব মানতে নারাজ, বাঁচতে হবে ।
.
ক্যান্দো রামের চোখে কাঁন্না আসতে চাইলো, আমি দিচ্ছি না। ঘড়ির দিকে তাকালাম। ৬ টা বাজছে, সন্ধা এখন। আজ নিনিতার বিয়ে।
.
ব্যাগে থাকা কিছু একটা বের করতে নিলো নিনিতা। ছোট্ট একটা টিফিন বক্স। পরিচিত ঘ্রাণ।আমার দিকে বাড়িয়ে ধরলো বক্সটি। আমি নিনিতার চোখে তাকাতে পারছিনা
.
– এখন ই শেষ করবে । সময় নেই
.
সময় আসলে টুপ করে শেষ হয়ে যায়। প্রতিবার ই ঘুরতে বের হলে বাহানা ধরতাম আমি। দুই চার পাঁচ মিনিট যদি আরো থাকায় যায়… ঘন্টা তিন পার হলেও , “সবে তো এলে, আরো কিছুক্ষণ?” বলতাম আমি। আমার কথায় হাসতো নিনিতা। ঐ হাসির দিকে তাকিয়ে বাকি টা সময় কিভাবে কিভাবে যেন শেষ হয়ে যেত ।
.
খাবার গুলো ভিতরে যাচ্ছে না। নিনিতার দিকে তাকালাম। চোখ দুটো লাল। দ্বীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবলাম সময়টা যদি ধরে রাখা যেতো!
.
নিনিতা চোখ মুছে আমার দিকে তাকালো।
.
– আমাকে যেতে হবে
– হুম
– যাওয়ার পর পাগলামো করবে না তো?
.
মাথা দুলালাম আমি। নিনিতার কন্ঠ জড়িয়ে আসছে। নিজেকে সামলে বলল নিনিতা
.
– শোন যেমনটা রেখে যাচ্ছি একেবারে তেমনটাই থাকবে ।
– থাকতে হবে কেন?
– আমি হচ্ছি বাড়ির বড় মেয়ে। বাড়ির বড় মেয়ের বিয়ের পর তার প্রেমিক এইভাবে না থাকলে লোকে কি ভাববে?
.
নিনিতার কথায় হাসলাম আমি। নিনিতার ঠোটে হাসি চোখের কোনে জল। কাঁপা কাঁপা কন্ঠ বলল নিনিতা
.
– হাটার সময় একদম শব্দ করবে না।
.
আমার হাটা নিনিতার যতো রাগ ছিলো। একটুও শব্দ করা যাবে না। নিনিতার কানে অদৃশ্য শক্তি আছে। হাটার মাঝে কথা বলার সময় কথা থামিয়ে বলত নিনিতা
.
– এই তুমি শব্দ করে হাটছ কেন?
আচমকা দাড়ালেই বলত
– এই তোমাকে দাড়াতে বলেছি?
পা টিপে টিপে হাটা ধরতাম ফের। নিনিতা কথা থামিয়ে ফের বলত
– এই তুমি চোরের মতো হাটছ কেন?
.
স্মৃতিগুলো ঘুনোপোকাড় মতো আঘাত করবে জানি। তবুও কাঁদা যাবে না। আজ নিনিতার বিয়ে। ভালোবাসাটা দুজনের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকে না। অন্যদের কাঁদিয়ে আমরা আজ হাসতে পারতাম হয়তো। চাইনি দুজনের কেউ সেটি। অন্যেদের হাসি বড্ড বেশি দামি তার চেয়ে।
.
নিনিতার পাশে হাত ধরে হাটছি। জানি ফের ঐ হাত ধরার অধিকার থাকবে না কখনো। নিনিতার হাতে টুংটাং রেশমী চুড়ি বাজছে। সম্পর্কে শুরুতে দেয়া সেই চুড়ি গুলো। নিনিতা একবার বলল তার হরেক রঙের রেশমী চুড়ি চায়। একদিন হুট করে নিয়ে হাজির হলাম। সেইবার বেগুনী রঙের চুড়ি ভেঙ্গেছি বলে তার সেই কি রাগ ! সেই চুড়ি গুলো বড্ড বেশি যত্ন করে রেখেদিয়েছে। আগা গোড়া সেজে থাকা মেয়েটার হাতে রেশমী চুড়িগুলো তে মায়া জড়িয়ে আছে। টুংটাং শব্দে স্মৃতিগুলো খেলছে …
.
সেইদিন নিনিতাকে বিদায় দেয়ার সময় তার চোখের দিকে তাকাইনি। সেইদিন তাকালে আজ দাঁড়াতে পারতাম না হয়তো। আমার চোখে ঝুলে থাকা গোল চোশমার ফাকে আকাশের দিকে তাকালাম। আমার আকাশটা আজো ঝাপসা হয়ে এলো। পকেটে থাকা মানিব্যাগ থেকে নিনিতার সেই দিনের টিস্যু পেপার বের করলাম। টিস্যু পেপারে সেইদিন নিনিতার কাজল দেয়া চোখের পানি শুকিয়ে গেছে ঠিকই তবে শুকনো কাজল স্মৃতি হয়ে রয়ে গেছে । আচ্ছা নিনিতার হাতে সেইদিনের রেশমি চুড়ি গুলোতে কি আজো টুংটাং শব্দে স্মৃতিগুলো খেলা করে??….
.
.
[] আশরাফ মামুন []

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s