‘আন্ধাগলি’

Post ID # 013

আমাদের এলাকায় গলি আছে অনেক পুরানো। ওদিকটা কেউ মাড়ায় না। কথিত আছে, যে একবার ওই চিপা গলিতে ঢুকে, সে আর জীবিত বের হতে পারে না। লাশটাও নাকি খুজে পাওয়া যায় না। স্রেফ উধাও। মরতে কে চায়? তাই এমনকি এলাকার বখাটেরাও তাস-মদ-গাঁজার আসর হিসেবে ওই জায়গাটাকে গ্রহন করে না। গলিটার একটা নামও আছে। লোকে বলে ‘আন্ধাগলি’। দিন কি রাত, সব সময় গাঢ় অন্ধকারে ডুবে থাকে ওই গলিটা। যুগের পর যুগ এসেছে। আশেপাশে ঢাউস সাইজের সব বিল্ডিং গজিয়েছে। কিন্তু আন্ধাগলির ব্যাপারে কেউ নাক গলায় নি। তাই আজ অবদি অক্ষত মরালাশের মত দাড়িয়ে আছে আন্ধাগলি। জন্মের পর থেকে আমার জীবনের অনেকগুলো লক্ষ্যের মধ্যে একটি ছিল আন্ধাগলিতে হানা দেয়া। অবশ্য ৪-৫ বার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছি। ফিরে এসেছি গলির সম্মুখ থেকে। অতটা সাহস হয় নি কখনও।
.
কয়েকদিন আগে এলাকায় এক নতুন বখাটের আগমন ঘটে। অল্পদিনে উড়ে এসে জুড়ে বসার ক্ষমতা আছে তার। আমরা ডাকি সুজন ভাই বলে। সুজন ভাই নিজেকে উঠতি মাস্তানা দাবি করেন। এলাকার মেয়েদের উত্যাক্ত করেন। দিনে রাতে গাঁজা সেবন করেন। এভাবেই তার দিনকাল চলছিল। পরিচিতির তুঙ্গে ছিল সে। এলাকার বড় ভাইরাও সমীহের দৃষ্টিতে দেখতো তাকে। একদিন হঠাৎ সে উধাও হয়ে যায়। সারা এলাকা তন্নতন্ন করে খোঁজার পর মুরব্বীদের নির্দেশে আমরা কয়েকজন সাহসী তরুন ভয়ে ভয়ে আন্ধাগলিতে একবার খুঁজে দেখার জন্য এগিয়ে যাই। তখন ছিল সন্ধ্যা সাতটা। সূর্যের রক্তিম আলোয় আর রাস্তার সোডিয়াম আলোর মিশেলে অদ্ভুত রঙ ধারন করে আন্ধাগলির চারপাশের পরিবেশ। আমার হাতে টর্চ ছিলো। কেউ এগুচ্ছে না দেখে আমি টর্চ নিয়ে এগিয়ে গেলাম। যা হয় হবে। ভূত টুথ থাকলে টর্চের বাড়িতে কুপোকাত করবো, কুছ পারওয়া নেহি। ভিতরে ঢুকলাম এবং ঢুকেই চক্ষু ছানাবড়া। প্রথমে তো আঁতকেই উঠেছিলাম। আমার চিৎকার শুনে দলের বাকিরা যথেষ্ট দুরত্বের দিকে মাগো বাবাগো বলে ছুট দিলো। সুজন ভাইয়ের লাশ বসে আছে আন্ধাগলির শেষ মাথায়। লাশ কি বসে থাকতে পারে! না পারে না। ভয়ের সাথে কৌতুহলের যুদ্ধ বাধলো। কৌতুহলে জয় হল। এগিয়ে গেলাম শেষ মাথায়। আবিষ্কার করলাম, উনি বেঁচে আছেন। ডাক দিলাম,

-ভাই?

-কে?

-আমি।

-কি এখানে? যা ভাগ!
.
আমি ছুট দিলাম। পরবর্তীতে প্রায়ই উনাকে ঘন্টার পর ঘন্টা আন্ধাগলিতে পাওয়া যেতো। মাঝে মধ্যে বেরিয়ে আসতো, তবে কেউ ভয়ে কথা বলতো না। আন্ধাগলির ভয় এলাকাবাসীর মন থেকে উবে গেলো। তবে নতুন এক কুসংস্কারের জন্ম হতেও সময় লাগল না। মানুষের ধারনা, সুজন ভাইকে জ্বীনে পাইসে। কয়েকদিন পর আবার নতুন কথা চালু হল। লোকে বলাবলি করতে লাগলো, সুজন ভাই হয়তো “আধ্যাত্মিক বাবা” টাইপের কিছু একটা। বাংলার মাটিতে অনেক বাবার জন্ম হয়েছে। যেমন, বিড়ি বাবা, ময়লা বাবা, হেন বাবা, তেন বাবা। সুজন ভাইয়ের নাম হয়ে গেলো মোবাইল বাবা। অনেকেই নাকি সুজন ভাইকে আন্ধাগলিতে বসে মোবাইল টিপতে দেখেছে। শুরু হল মোবাইল বাবার আরাধনা। এলাকয় যখনই কারো কোনো সমস্যা হত, তখনি সেই ব্যাক্তি মোবাইল বাবার গর্ত, অর্থাৎ আন্ধাগলির সামনে এসে বসে থাকতো।
.
এভাবে বেশ কয়েকদিন কাটার পর একদিন মোবাইল বাবা অর্থাৎ সুজন ভাইকে এলাকার টং য়ে চা সিগারের খেতে দেখা গেলো। কেউ ভয়ে কথা বলে না, কিন্তু ভয় আর সম্মানের দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে। উনি কিছুটা বিরক্ত বোধ করলেন। তবে এরপর থেকে তাকে আর আন্ধাগলিতে পাওয়া গেল না। তিনি এখন বেশ সুস্থ ও স্বাভাবিক। তবুও লোকজনের ভয় কাটে না। আমি ভাবলাম সাহস করে ২-১ টা কথা জিজ্ঞেস করি। যো ভি হোগা, দেখা যায়েগা। একদিন ভয়ে ভয়ে তাকে শুধালাম,

-সুজন ভাই?

-বলে ফেল কি বলবি।

-আপনে ওই আন্ধাগলিতে দিনের পর তিন কিসের ধ্যানে মগ্ন ছিলেন? প্রেত আত্মা টাইপের কিছু? নাকি সরাসরি সৃষ্টিকর্তার সাথে আপনার যোগাযোগ?

-মানে? (কন্ঠ যথেষ্ট হতভম্ব)

-ওই গলিতে কাম কাজ রাইখা কি করতেন? এখনই বা আর যান না কেন? সৃষ্টিকর্তা কি লাইন কাইটা দিসে?

-আরে কি কস না কস? গাঁজা ধরসস নাকি?

-কি করতেন ওখানে?

-আরে কইস না। একদিন ঢুকসিলাম ওই জায়গায়। দেখি ওয়াইফাই নেটওয়ার্ক পাওয়া যাইতেসে। পাসওয়ার্ডও দেয়া নাই। আসারে আর পায় কে! সারাদিন ডাউনলোড দিলাম। ক্ল্যাস অব ক্ল্যান খেল্লাম। এরপর থেকে চিন্তা করলাম, ট্যাকা খরচ করার কি দরকার? ওইখানে গিয়া ক্ল্যাশ অব ক্ল্যান খেললেই পারি! যেই ভাবা সরই কাজ। ডেইলি যাওয়া শুরু করলাম। নেশা লাইগা গেলো। একদিন হঠাৎ দেখি ওয়াইফাইতে পাসওয়ার্ড মাইরা দিসে বা**তের বাচ্চায়। কোন বা**ত এটা, একবার যদি পাইতাম!!!
.
আমি উনার দিকে হা করিয়া চাহিয়া রইলাম। একটি মাছি আমার মুখের ভেতর গমন করিলো।

—Abdullah Al Mehraj

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s