সকাল বেলা সকালে চা না পেলে…

Post ID # 020

সকাল বেলা সকালে চা না পেলে মেজাজ খারাপ হয়ে যায় জাহাঙ্গীর সাহেবের। তিরিশ ছুই ছুই মানুষটার চা খাওয়ার নেশা প্রবল হলেও, মাঝে মাঝে স্ত্রীর বলদামিতে সকালে বাইরে গিয়ে চা খেতে হয়। তবে আজকের ব্যাপারটা নিয়ে ভিতরে ভিতরে সে নিজেও লজ্জিত। আজকে ঝগড়া হওয়ার কারন সে নিজে।

পত্রিকা খুলে মাত্র সোফায় গা এলিয়ে বসেছে জাহাঙ্গীর। নিচু গলায় সে একবার বললো, চা দাও।

‘ চা নাই। চিনিও নেই। ‘

‘ আগে বললা না কেন? ‘

‘ মনে ছিল না। যাও বাজারে যাও। এক কেজি খাসির মাংস নিয়ে আসো। তোমার কোন বন্ধু না বলে আসবে? ‘

‘ বাজারে যেতে পারবো না। ‘

‘ দুপুরে গরমের মধ্যে আমিও রান্না করতে পারবো না, বলে দিলাম। ‘

‘ না পারলে নাই। ওরা আসলে বলে দিবে, রান্নাবাটি হয় নি। আপনারা চলে যান। ‘

‘ আচ্ছা। ‘

‘ কি আচ্ছা! অদ্ভুত তো! সকাল সকাল ঝগড়া করার শখ হলো কেন তোমার? ‘

‘ আমি কই ঝগড়া করছি? ‘

‘ আমার বন্ধুদেরকে চলে যেতে তুমি কে বলার? ‘

‘ আমি কি বললাম? বললাম এক কেজি খাসির মাংস নিয়ে আসো। ‘

‘ আমার ঘরে আমার টাকায় বসে বসে খাবা আর আমার উপর খবরদারি! ‘

‘ কি বললে তুমি? ‘

জাহাঙ্গীর পকেট থেকে দুটো পাঁচশো টাকার নোট বের করে শৈলীর দিকে ছুড়ে মারলো। অত্যন্ত হতভম্ব হয়ে শৈলী ঠোট কাঁপিয়ে কান্না করে দিল। জাহাঙ্গীরের সেদিকে খেয়াল নেই। সে সকালে চা পায় নি। এখন তার মাথা গরম।

শৈলী বাজার করতে বাইরে গিয়েছিলো। এক কেজি খাসির মাংসের সাথে চা পাতি চিনি, গরম মশলা, সব আনলো। খাসির মাংস কষানো বাদ দিয়ে সে জাহাঙ্গীরের জন্য চা বানালো। এক কাপ চা জাহাঙ্গীরের হাতে তুলে দিয়ে সে চুপচাপ রান্নাঘরে চলে গেল। রাগে ফোপাতে থাকা জাহাঙ্গীর, চায়ে দুই চুমুক দিয়ে লজ্জায় মাথা হেট করে ফেললো। শৈলীকে এভাবে বলা উচিত হয় নি।

রান্নাঘরে একবার উঁকি মারলে কেমন হবে? ও কি এখনও কান্না করছে? আজ সকালে খাওয়ার খুটা দেয়া হয়েছে ওকে। এখন যদি রান্না শেষে বলে, রান্না শেষ। বন্ধু এলে খেতে দিয়ো। আমি বাপের বাড়ি যাচ্ছি। কয়েকদিন ওইখানে খেয়ে এখানকার চাপ কমাই।

জাহাঙ্গীরের ভেতরে ভেতরে অস্থির অস্থির ভাব। সে স্পষ্ট দেখতে পারছে, শৈলী চোখ মুছলো।

<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>

রফিক খুব মজা করে খাসির মাংস আর ডাল দিয়ে চটকিয়ে ভাত খাচ্ছে। শৈলী রান্নাবান্না, ঘর মোছা থেকে শুরু করে সব কাজ করে দিয়ে বাপের বাড়ি চলে গেছে। জাহাঙ্গীর লজ্জা লজ্জা চেহারা নিয়ে রফিককে ভাত আর কই মাছ ভুনা তুলে দিচ্ছে। ভেতরে ভেতরে জাহাঙ্গীর রাগে ফেটে যাচ্ছে।

‘ ভাবী কবে আসবে? ‘

‘ যেই কয়দিন থাকতে চায়, থেকে চলে আসবে। ‘

‘ ও । ‘

‘ মাংস খেতে কেমন? ‘

‘ খারাপ না। ভালোই। মজা আছে। ‘

‘ হুম। ‘

‘ বাসায় তার মানে তুই একা? ‘

‘ হু। ‘

‘ ও। ‘

রফিক আবার খাওয়ায় মন দিলো। কিন্তু এবার তার খাওয়ায় মন নেই। চেহারা দেখে মনে হচ্ছে মুখের ভিতর হাড্ডি আটকেছে। জাহাঙ্গীর জানে, এইবার হারামী মেয়েলী আলাপ শুরু করবে।

‘ যাই বলিস, তুই অনেক লাকি। ভাবী কত ভালো রান্না করে। ‘

‘ হুম। ‘

‘ ডালটাও মজা হয়েছে। ‘

‘ আরেকটু খা। ‘

‘ দোস্ত ভাবী তো নাই। চল আজকে রাতে জুম্মনবাড়ি যাই। ‘

‘ তোর ইচ্ছে হলে তুই যা। আমি যাবো না। ‘

‘ আরে কেউ জানবে না। ‘

‘ না জানুক। ‘

‘ দোস্ত, আজকে মঙ্গলবার। রূপসী আসবে আজকে। ‘

‘ রূপসী কে? ‘

‘ গেলেই চিনবি। চল যাই। ‘

‘ তুই ভাত খা। আর কিছু লাগবে? ‘

‘ আরেকটা কই মাছ দে। ‘

জাহাঙ্গীর কই মাছ তুলে দিলো রফিককে। রফিক বেশি করে কই মাছ খাচ্ছে, কারণ কই মাছ নাকি পুরুষের শক্তি বাড়ায়। আজ সে প্রচুর শক্তি খরচ করবে। তার আজকে রূপসীর সাথে ডিল আছে।

খাওয়াদাওয়া শেষে ঢেকুর তুলতে তুলতে রফিক বাইরে চলে গেল। রফিক চলে যাওয়ার সাথে সাথে পুরো বাড়ি খা খা করে উঠলো। কিছু একটা নেই। জাহাঙ্গীর একা একা ভাত বাড়তে লাগলো নিজের জন্য। আরেকটা প্লেটে এমনি এমনি ভাত বাড়লো। কেন বাড়লো, সে নিজেও জানে না। হঠাৎ ভাত বাড়া রেখে সে শৈলী কে ফোন দিল। দুইবার ফোন ধরলো না। তিনবারের বেলায় সে ফোন ধরলো।

‘ হ্যালো? ‘

‘ বাসায় কবে আসবে তুমি? ‘

‘ দেখি। ‘

‘ সরি। ‘

‘ আচ্ছা ঠিক আছে। ‘

‘ ক্ষুধা লেগেছে। রফিক সব চেটেপুটে খেয়ে চলে গেছে। কিছুই খাওয়ার নেই। ‘

কথাটা মিথ্যা। শৈলী তাকে না খাইয়ে রাখবে না। সে বলবে, বেবিট্যাক্সিতে করে চলে আসো। আমাকে নিয়ে যাও। কিন্তু সে সেটা বললো না।

‘ ফ্রিজে ডিম আছে, ভেজে খাও। ‘

‘ মাংস তো পুরোটা রান্না কর নি মনে হয় …… আসো না! আমি বেবিট্যাক্সি নিয়ে আসছি। ‘

‘ আমি আসবো না। ‘

‘ সরি বলেছি তো! ‘

‘ বললাম তো পারবো না! ‘

ধপ করে ফোন কেটে দিলো শৈলী। জাহাঙ্গীর হতভম্ব হয়ে কয়েক মিনিট পুরো বিষয় বুঝার চেষ্টা করলো। কিন্তু পারলো না। সে কেন যেন মোবাইলের দিকে তাকিয়ে রইলো। শৈলী ফোন দিতে পারে।

দুই মিনিটের মধ্যে শৈলী ফোন দিয়ে জানালো, আধা ঘন্টার মধ্যে না আসলে লাগেজ নিয়ে সে আবার বাপের বাড়ি ঢুকে যাবে।

<<<<<<<<<<<<<<<<<<>>>>>>>>>>>>>>>>>

আজ সকালে ভয়ানক ঝগড়া হয়েছে। আজ ঘরে চা চিনি সব আছে। কিন্তু শৈলী চা বানায় নি। জাহাঙ্গীর খুব কড়া কিছু বলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ওদিকে শৈলীর চেহারা খুশি খুশি। সে সকালে গোসল করে একটা কাঁচা কলাপাতার রঙের শাড়ি পড়েছে। আগের রাতে জাহাঙ্গীর তাকে অনেক আদর করে ঘুম পাড়িয়েছে। বারবার বলেছে, আর কোনদিন কারন ছাড়া সে তাকে বকবে না। সেও নিজে প্রতিজ্ঞা করেছে, আর সে চা না বানিয়ে স্বামীকে রাগাবে না। আজকে গোসল করতে গিয়েই একটু দেরী হলো। এখন সে চা বানাবে।

চা বানিয়ে শৈলী স্বামীর সামনে বসলো। ভেজা চুল থেকে তখনও পানি চুইয়ে চুইয়ে পড়ছে। কপাল দিয়ে ফোটা ফোটা পানি গড়িয়ে পড়ছে নাকে। তার চেহারা থেকে পানির সাথে সাথে আহ্লাদও গলে গলে পড়ছে।

‘ চা করতে এত দেরী হলো কেন? ‘

‘ গোসল করছিলাম। ‘

‘ চা বানিয়ে দিয়ে গেলে কি সমস্যা ছিল? ‘

‘ তুমি এভাবে কথা বলছো কেন? ‘

‘ আজকে তো চা চিনি সব ছিল। তবুও চা করতে এত কষ্ট লাগে কেন? ‘

‘ এই যে চা করে আনলাম! ‘

‘ খাবো না এই চা। সকাল বেলা সকালে মেজাজ খারাপ না করে দিলে পেটের ভাত হজম হয় না, তাই না? ‘

‘ তোমার আবার কি হলো? ‘

শৈলীর চেহারা মুহুর্তেই কান্না কান্না ভাবে ভরে গেল। যেকোন সময় সে কান্না করে দিবে। তার চেহারা থেকে আহ্লাদ কর্পুরের মত উড়ে গেছে। সে এখন চোখ বড় করে জাহাঙ্গীরের দিকে তাকিয়ে আছে। নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখা হলো না, টুপ করে দুই ফোটা চোখের জল গড়য়ে পড়লো।

জাহাঙ্গীর জানে, চায়ে এক চুমুক দিলেই মেজাজ ভালো হয়ে যাবে। কিন্তু সে তা করলো না। মেজাজ খারাপ থাক। শৈলীকে বুঝানো উচিত, সকালে চা দেরী করে দেয়া যাবে না। গোসল সকালের নাস্তা হাগামুতা সব পরে, আগে চা।

শৈলী বুঝলো কি বুঝলো না, সেটা জাহাঙ্গীর বুঝার আগেই শৈলী ঘরে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিলো। ভিতর থেকে হুহু কান্নার শব্দ। জাহাঙ্গীর রাগে চা না খেয়েই বের হয়ে গেল। ঘরের চেয়ে বাইরে শান্তি। গতরাতে এত তুলুতুলু করেও যেই মেয়ে এক কাপ চা আনতে দেরী করে, তার সাথে সংসার করা খুব কষ্টের কাজ। সেই মেয়ে আবার কথায় কথায় কান্না করলে আরেক সমস্যা।

রাস্তায় বের হয়ে একবার চিন্তা হলো, রফিকের বাসায় যাওয়া যায়। রফিক কি বাসায় আছে? নাকি অফিসে যাবে? এখন তো ওর অফিসের সময়। চাকরির ঝামেলা জাহাঙ্গীরের নেই। সে বিজনেস করে। সেই বিজনেস দেখে তার ভাগ্নেরা। কাকাও দেখে। মাসে মাসে বাসা ভাড়া আসে। গুদাম ভাড়া আসে। ব্যবসার টাকা আসে। খালি বাসা ভাড়া দিয়ে সংসার রাজার হালে চালানো যায়। বাকি টাকা ব্যাংকে পড়ে থাকে।

উল্টোপাল্টা এই সেই ভাবা, রাস্তার ধারে চা খাওয়া আর দুপুরে বিরিয়ানি আর বাদাম শরবত। তৃপ্তির ঢেকুর তুলে বাসায় এসে আবার মেজাজ বিগড়ে গেল জাহাঙ্গীরের। বাসাতে তালা মারা। শৈলী আবার চলে গিয়েছে। এই মেয়ে কথায় কথায় বাসা ছেড়ে চলে যায়। পাঁচ টাকা ভাড়া দিয়ে বাসে করে বাপের বাড়ি চলে যাওয়া যায়, তাই এত দেমাগ। মুন্সিগঞ্জে মাড়িরংক এলাকার তিনতলা বাসায় চলে গেলে এই দেমাগ কই থাকে, দেখা যাবে।

বাসায় ঢুকার ইচ্ছে হলো না জাহাঙ্গীরের। বাসায় ঢুকলেই এই সমস্যা, সেই সমস্যায় শৈলীকে ফোন দিয়ে নিয়ে আসা। আর বাসায় আনার জন্য বলবে না সে। নিজ ইচ্ছেতে আসলে আসবে, না আসলে নাই। কয়েকদিন স্বামীর সাথে রাতে ঘুমাতে না পারলে এই মেয়ের পেটের ভাত যে হজম হয় না, জাহাঙ্গীর তা জানে। একবার শৈলী চার দিনের জন্য চলে গিয়েছিলো। চারদিন পর একা একা বাসায় এসে জাহাঙ্গীরকে জড়িয়ে ধরে কান্না করতে করতে ঘুমিয়ে পড়লো। জাহাঙ্গীরকে কোলে করে ঘরে নিয়ে শৈলীকে শুইয়ে দিতে হয়েছিলো। সেই ঘুম সকালে এসে গিয়েছিলো রাত এগারোটায়।

এরকম কিছুই করতে হবে, মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলো জাহাঙ্গীর।

<<<<<<<<<<<<<<<<>>>>>>>>>>>>>>>>

রফিকের বাসাকে বাসা না, চারতলায় স্থাপিত ডাস্টবিন বলা যায়। এই ছেলের বাসায় একটা জিনিস দেখে গায়ে ঘিন ধরে গেল জাহাঙ্গীরের। ছোট একটা বাস্কেটে কয়েকটা কনডমের প্যাকেট পড়ে আছে। রফিক তার মানে বাসাতেও মেয়ে আনে।

রফিক ধোয়া গোল গোল করে ছাড়ছে। সিগারেট খাওয়ার সময় সে এভাবেই ধোয়া ছাড়ে। জাহাঙ্গীর স্মোক করে না। কিন্তু রফিককে দেখলে ওর স্মোক করার ইচ্ছে হয়।

‘ দোস্ত যতদিন থাকবি থাক। কোন সমস্যা নেই। সমস্যা একটা। ‘

‘ এই না বললি সমস্যা নেই? ‘

‘ সেটা না। আমার কিছু বন্ধু আসে, মাঝে মাঝে থাকে। রাতে একটু হইহুল্লোড় হয়। বিরক্ত হতে পারিস। ‘

‘ আমি বিরক্ত হবো না। ‘

‘ তাহলে থাক। আজ সিল্কি আসবে দোস্ত। ‘

‘ সিল্কি কে? ‘

‘ সিল্কি। শালা একখান চিজ। ও যখন নাচে, দেখে বিশ্বাস করতে পারবি না যে হারামজাদাটা হিজড়া। মনে হবে পুরা আয়েশা তাকিয়া। ‘

‘ হিজড়া মানে? ‘

রফিকের হাসি দেখে গা জ্বলতে থাকলো জাহাঙ্গীরের। এই শয়তানের সাথে থাকা যাবে না। যেই পুরুষ হিজড়ার সাথে রাত কাটায়, সে অনেক কিছুই করতে পারে।

‘ দোস্ত ভয় পেলি? ভয় পাস না। মজা করলাম। হিজড়া আসবে না। দোস্ত একটা টান দে, গাজা পুরেছি ভিতরে। ‘

‘ এসব আমি খাই না। ‘

রফিক আর সাধলো না, গাজা ভরা সিগারেট টানতে লাগলো। ধোয়ায় ঘর অন্ধকার হয়ে গেছে। জাহাঙ্গীরের থাকতে কষ্ট হচ্ছে। এই ঘরে রফিক কিভাবে থাকে?

‘ ভাবীকে তার মানে এবার উচিত শিক্ষা দিবি? তাই না? ‘

‘ সেটা আমার ব্যাপার। তুই গাজা খা। ‘

‘ শাস্তি যদি দিতে হয়, নিজেকে শাস্তি দে। তুই যখন নিজেকে কারোও জন্য মেরে ফেলবি,তখন সে তোর জন্য জনম জনম কান্না করবে। আমাকে দেখ। রোকেয়া এখনও আমার জন্য কান্না করে। শালী বাচ্চাকাচ্চা স্বামী রেখে আমাকে শান্ত করতে এখনও ছুটে আসে। আমি শান্ত না হলে যে আমি আবার খারাপ হয়ে যাবো! …… দুই সপ্তাহ ওর খবর নেই। দুই সপ্তাহে শালী একটা কল দেয় নি। শালী! আমাকে ভালোবাসে না একটুও! ‘

খিক করে হেসে হঠাৎ হু হু করে কান্না করতে লাগলো রফিক। জাহাঙ্গীর বিরক্ত হচ্ছে। নেশায় বুদ হয়ে আছে রফিক, বুঝা যাচ্ছে। এই হারামী এখনও তার মানে রোকেয়াকে ছাড়ে নি। রোকেয়ার জীবন তামা তামা করে দিয়ে এখনও রফিকের আশ মিটেনি।

হঠাৎ দরজায় কেউ একজন কড়া নাড়লো।

‘ দোস্ত দরজাটা খুলে দে। সিল্কি এসেছে। ‘

জাহাঙ্গীর ভয়ে ভয়ে দরজা খুললো। সিল্কি না, দাঁড়িয়ে আছে রোকেয়া। তার চেহারায় মনমরা ভাব স্পষ্ট। তার হাতে একটা হটপট। জাহাঙ্গীরকে দেখে সেও কিছুটা ভয় পেয়েছে। কিছুটা বললে ভুল হবে, অনেক ভয় পেয়েছে। ভয়ে মেয়েটার ঠোট লাল হয়ে গেছে। মেয়েরা লজ্জায় বা ভয়ে লাল হয়ে যায়। সেই লাল আভা ফুটে ওঠে গালে। এই মেয়ের ঠোটে ফুটে উঠে ব্যাপারটা। অদ্ভুত কাহিনী।

‘ জাহাঙ্গীর ভাই কেমন আছেন? ‘

‘ তুমি এখানে কি করতে? ‘

‘ রফিকের সাথে দেখা করতে আসলাম। ও আছে না? ‘

‘ আছে। ‘

রফিক চুপচাপ তাকিয়ে তাকিয়ে রোকেয়ার কাহিনী দেখতে লাগলো। হটপট খুলে খাবার ঠান্ডা করতে দিলো। ভাত, গরুর মাংস কালো করে ভুনা, আলু ভর্তা, ডাল, সামান্য ঘি পর্যন্ত এনেছে। ঘরের জানালা খুলে, ঘরটাকে আধা ঘন্টার মধ্যে বেহেশতখানা বানিয়ে ফেললো। ব্যাগ থেকে এয়ার ফ্রেশনার বের করে ঘরে ছিটালো। রফিককে তুলে বাথরুমে নিয়ে গেল। পিছনে পিছনে জাহাঙ্গীরও যাচ্ছিলো। রোকেয়া মানা করলো। রোকেয়া রফিককে গোসল করাবে।

গোসল শেষে নিজ হাতে খাবার বেড়ে দিলো রোকেয়া। মেয়েটা কাঁদছে। দৃশ্যটা দেখে জাহাঙ্গীরের খুব খারাপ লাগে। মেয়েটা বিয়ের পরেও লুকিয়ে রফিককে ঠিক রাখতে এসব করে। মাতাল রফিক কখনও কখনও রোকেয়াকে নিয়ে বিছানাতেও যায়। রোকেয়া মানা করতে পারে না। মানা করেছিলো প্রথমবার। সেইবার হাতের রগ কেটে বিতিকিচ্ছিরি অবস্থা। জাহাঙ্গীর এই সেই জায়গায় ছুটাছুটি করে সেইবারের মত বাচালো। কিন্তু রোকেয়ার মনে সেই যে ভয় ঢুকলো, সেই ভয় আজও কাটেনি। রফিক যেই সিল্কির কথা বলেছিলো, সেই সিল্কিই রোকেয়া। রোকেয়াই মাঝে মাঝে নাচ করে। রফিকের কথাতেই নাচে। দুই মেয়ের মা একটা আধামরা মানুষকে আধাবাচা রাখতে কত কষ্টই না করছে।

‘ জাহাঙ্গীর ভাই, মাংস কম এনে ফেলেছি। রফিক খেতে চেয়েছিলো, ওকে বেশিটা দিয়ে ফেলেছি। আপনাকে কিছু রান্না করে দেই? ‘

‘ আমি আলু ভর্তা দিয়েই খেতে পারবো। ‘

‘ কি বলেন? আচ্ছা দাঁড়ান আমি আপনার জন্য একটা ডিম ভেজে দিই। কড়া করে বেশি করে পিঁয়াজ মরিচ দিয়ে মোটা ডিম ভাজি। তাই না জাহাঙ্গীর ভাই? ‘

‘ তুমি বাসায় যাবে না? বাসায় স্বামী টেনশন করবে না? ‘

‘ আমার ডিভোর্স হয়ে যাচ্ছে জাহাঙ্গীর ভাই। আগে টেনশন হতো। এখন হয় না। বাচ্চার কাস্টাডিও মনে হয় পাবো না। ‘

‘ কি বল এসব? ‘

‘ স্বামীকে ঠকিয়ে আর কয়দিন? বাচ্চাগুলোকেও ঠকাচ্ছি। একজন আজও জানতে পারলো না যে ওর আসল পিতার নাম রফিক। ‘

কান গরম হয়ে গেল জাহাঙ্গীরের। রোকেয়া নির্লিপ্ত ভঙ্গীতে রান্নাঘরে চলে গেল। কিছুক্ষন পর ভেতর থেকে রোকেয়া কথা বলে উঠলো, ‘ জাহাঙ্গীর ভাই, একটা ডিম নিয়া আসেন। ডিম নেই। ‘

জাহাঙ্গীর বাসা থেকে বের হয়ে গেল। এই বাসায় সে আর কোনদিন ঢুকবে না। তার বুক ফেটে কান্না আসছে। ঠিকানাহীন কিছুক্ষন হাঁটাহাঁটি চালালো জাহাঙ্গীর। শৈলীর কথা খুব মনে পড়ছে। এখন শৈলীর কথা ভাবা ঠিক হচ্ছে না। শৈলীর উপর থেকে রাগ চলে যাচ্ছে, মায়া ভর করছে। লক্ষণ ভালো না।

কিছুদুর হেঁটে সামনে জুম্মনবাড়ি। এইদিক সেইদিক কিছু না ভেবে জাহাঙ্গীর ভিতরে ঢুকলো। রাস্তার এই জায়গা সেই জায়গায় রিকসা দিয়ে ব্যারিকেট দিয়ে রাখা। এই এলাকায় রফিকের সাথে একবার সে এসেছিলো। ওই শেষবার। আজ কেন ঢুকছে সে? সে কি শৈলীকে শাস্তি দিতে চায়? একটু আগে তার কথা ভেবে না জাহাঙ্গীরের খারাপ লাগছিলো?

কিসের খারাপ? দিন দিন এই সমস্যা সেই সমস্যায় জাহাঙ্গীর জর্জরিত। জীবনে আনন্দ নেই। ওর না আছে টাকার অভাব, না আছে কোনও সমস্যা। তবুও সে অসুখী। জাহাঙ্গীরের সুখ চাই। সে আজ এখানে থাকবে। আগামী এক সপ্তাহ এখানে থাকার চিন্তাভাবনা মাথায় ঘুরছে।

‘ ভাইসাব কি নতুন? কিছু লাগবে নাকি? ‘

বিশাল ভুড়িওয়ালা লোকটা লাল লাল দাঁত দিয়ে কেলিয়ে হাসলো। জাহাঙ্গীরের গায়ে রিরি দিয়ে উঠলো।

‘ চুসত মাল আছে! লাগবো নাকি? ‘

‘ জ্বি লাগবে। ‘

‘ ওরে রসের নাঙ্গর! জ্বি লাগবে! বাসায় বউ বাচ্চার লগে খিস্তি মাইরা আসছো নাকি? ‘

লোকটার কথাবার্তা খুব অশালীন ভঙ্গীমায়। এই লোক যদি কাউকে বলে, ভাই ভালো আছেন, সেখানেও অশালীনতা থাকবে।

‘ কয় টিপ মারবা? ‘

‘ জ্বি? ‘

‘ ঘন্টা না দিন? ‘

‘ সপ্তাহ। ‘

‘ ইয়া আল্লাহ! কও কি? ‘ লোকটার মুখ দিয়ে লাল লাল লালা ঝরে পড়লো।

‘ এক সপ্তাহের মত থাকার ব্যবস্থা হবে? ‘

‘ ভিতরে থাকবা? নাকি নিয়া যাবা? ‘

‘ আমি থাকবো এখানে। ‘

‘ মাশাল্লাহ! আমার লগে আসো …… ‘

জাহাঙ্গীর লোকটার পিছনে পিছনে যাচ্ছে। তার মাথায় ঝিম ঝিম করছে। সে কি করছে? যা করছে তা কি সে নিজে করছে? নিজে না করলে কে করাচ্ছে? কেন করাচ্ছে?

এক জায়গা থেকে একটা অদ্ভুত গান ভেসে আসছে। ‘ আমার রসে ভরা যৌবন তোর লাইগে জমায়ছি! তুই গিলে খাবি কি, না তুই চুষে খাবি কি …… ‘ কথা শুনে মাথার তার ছিড়ে যাওয়ার উপক্রম। এইসব গান কে লিখে, আর কে গায়? এই কে গুলোকে একদিন নিজ চোখে দেখা দরকার।

দুইতলা বাসার সিড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেছে জাহাঙ্গীর। সে এবার রীতিমত কাঁপছে। তার এখানে আসাটা ঠিক হয় নি। শৈলীকে সে শাস্তি দিতে এখানে এসেছে। শাস্তি পাওয়ার কথা তার। শৈলী কেন শাস্তি পাবে? সে তো কিছু করে নি! জাহাঙ্গীর এই সব কি করছে?

‘ মাল কত আনছো? ‘

‘ কত লাগবে? ‘

‘ ওরে বাপরে! কত লাকবে! কত আছে? ‘

‘ আচ্ছা আমি যদি এখন বাসায় চলে যেতে চাই তো …… ‘

‘ হাওয়ার নাতি, ফাইজলামি করস? ‘

‘ পাঁচ হাজার আছে। এখন চলবে না? ‘

জাহাঙ্গীর পকেটের পাঁচ হাজার লোকটার হাতে তুলে দিলো। লোকটা টাকা নিয়ে সেখান থেকে চলে গেল। জাহাঙ্গীর ভয়ে ঘামছে। সে বেঘোরে কি করছে!

‘ ম্যাডাম ফ্রি আছে। ভিতরে যান। ‘

‘ কোন ম্যাডাম? ‘

‘ ভিতরে যান। বলদার মত কথা বলেন ক্যান? ভিতরে যান। ‘

জাহাঙ্গীর ভিতরে গেল। বাইরে সদরঘাট, ভিতরে ফিটফাট। রাজার বাড়ির মত ঝকমক করছে সব। সবকিছুর মাঝে একটা সোফা। ঘরের মাঝখানে সোফা রাখার ব্যাপার এই প্রথম দেখলো জাহাঙ্গীর। সে এবার মাথা ঘুরে পড়ে যাবে যাবে অবস্থায় আছে। সোফায় একটা মেয়ে বসে আছে। মেয়েটাকে সুন্দর বললে সুন্দরের অসম্মান হবে। পুরো ঘর আলো হয়ে আছে মেয়ের রূপে। জাহাঙ্গীর সামান্য কাঁপানো থামাতে পেরেছে। কিন্তু কাঁপুনি আবার ফেরত চলে এলো।

‘ কি নাম? ‘

‘ জা… হাঙ্গীর। ‘

‘ এখানে আসেন। বসেন। দুইটা গল্প করি। ‘

মেয়ের ঠোট টকটকে লাল। সে হাতের ইশারায় জাহাঙ্গীরকে ডাকলো। জাহাঙ্গীর রোবটের মত মেয়েটার সামনে গিয়ে বসলো।

‘ আমার নাম শান্তি। শান্তি বিলাই আমি। ‘

‘ জ্বি। ‘

‘ কাছে আসেন। ‘

‘ না ঠিক আছে। ‘

শান্তি নিজেই কাছে এসে বসলো। হুট করে সরে বসতে গিয়ে শান্তির বুকের আচল খুলে মাটিতে পড়ে গেল। শান্তি সেদিকে ঘুরেও তাকালো না।

হঠাৎ শান্তি জাহাঙ্গীরের কানে কানে সুর করে গাইতে লাগলো, ‘ ও তুই গিলে খাবি কি …… ‘

জাহাঙ্গীরের হার্ট বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। সে শৈলীর কথা ভাবছে। শৈলী আজ সকালে খুব খুশি ছিল। কলাপাতা রঙের শাড়ি পড়ে তার সামনে এসেছিলো।

‘ চল…… ঘরে চল। আজকে আমি তোমার ঘাম আমার সাড়া গায়ে মাখবো। আসো। ‘

‘ না। ‘

‘ লজ্জা পেয়ো না। আসো। ‘

‘ আমি বাসায় যাবো। …… আ আমি আপনার লোককে পাঁচ হাজার দিয়েছি। ওটা রেখে দিন। ‘

‘ কি হলো? আমাকে দেখে সুন্দর লাগছে না? তুমি যেভাবে বলবা আমি সেভাবেই সাজবো। আমি সব খুলে ফেলি। তুমি আমাকে সাজাও। ‘

‘ ছি ছি! আমি চলে যাবো। থাকবো না আমি! ‘

‘ সমস্যা কি তোর । বাল ছাড়া বাচ্চার মত করস ক্যান? ক্যারা উঠসে তোর, ক্যারা? ‘

‘ আপনি ওই পাঁচ হাজার রেখে দিন। ‘

জাহাঙ্গীর সাথে সাথে উঠে দাঁড়ালো। শান্তির মনে অশান্তির আগুন জ্বালিয়ে দিয়ে জাহাঙ্গীর বের হয়ে গেল। এক দমে সে হাঁটতে হাঁটতে এলাকার বাইরে বের হয়ে এসেই হড়হড় করে বমি করে দিলো। তার চোখে মুখে অন্ধকার। সে হাউমাউ করে কান্না করতে লাগলো। রাস্তার কুকুরগুলো জিব বার করে কিছুক্ষন তা দেখলো।

জাহাঙ্গীর খুব কষ্ট করে একটা রিকসা নিলো। রিকসা ভাড়া তার কাছে নেই। সে শুন্য। সব টাকা খরচ। বাসায় গিয়ে আলমারি থেকে ভাড়া দেয়া ছাড়া উপায় নেই। জাহাঙ্গীর বাচ্চাদের মত কান্না করছে। সে শৈলীকে আজকেই নিয়ে আসবে। শৈলীর সামনে কানে ধরে উঠবস করবে। দরকার হলে পায়ে পড়বে।

‘ ভাইজান কি অসুস্থ্য? পানি খাইবেন? ‘

‘ আছে? ‘

‘ সিটের নিচে। রিকসা থামাইয়া নেই? ‘

‘ আচ্ছা। ‘

রিকসা থামিয়ে রিকসাওয়ালা জাহাঙ্গীরকে এক বোতল পানি দিলো। পানি দিয়ে জাহাঙ্গীর কুলিকুচি করলো। মুখে মাথায় পানি দিল। রিকসাওয়ালা কি মনে করে জাহাঙ্গীরের পিঠে হাত বুলাতে লাগলো। জাহাঙ্গীরের এখন আরাম লাগছে। সে খুব ভালো বোধ করছে।

রিকসা থেকে বাসার সামনে নেমেই চোখ বড় বড় হয়ে গেল জাহাঙ্গীরের। বাসার ভিতর আলো জ্বলছে। ভিতরে শৈলী আছে। সে রিকসাওয়ালাকে দাঁড়াতে বলে ভিতরে গেল। কলিং বেল বাজাতেই শৈলী দরজা খুলে দিল।

‘ কোথায় ছিলে সারাদিন? ‘

‘ একটা পাঁচশো টাকার নোট দাও। রিকসা ভাড়া দিবো। ‘

‘ ভাংতি টাকা আছে। দিবো? ‘

‘ পাঁচশো টাকা ভাড়া দিবো। রিকসাওয়ালা আমার খুব উপকার করেছে। ‘

‘ তুমি বসো। আমি রিকসাভাড়া দিয়ে আসি। ‘

জাহাঙ্গীর বসলো। শৈলী বাইরে চলে যেতেই জাহাঙ্গীর রান্নাঘরে গিয়ে ঢুকে, চাপাতি চিনি সব ফেলে দিলো। পরক্ষনেই ভাবলো, চিনি ফেলাটা ঠিক হয় নি। চিনি অন্য কাজেও লাগে। আবার ভাবলো, চা পাতি রেখে দিলে ভালো হতো। মেহমানদের চা করে দেয়া যেত।

‘ তুমি রান্নাঘরে কেন? চা খাবে? ‘

জাহাঙ্গীর ঘুরে দাঁড়ায়। শৈলী অবাক চোখে জাহাঙ্গীরের দিকে তাকিয়ে আছে। জাহাঙ্গীর ভ্যা ভ্যা করে কান্না করতে শুরু করলো। বাচ্চাদের মত ভাঙা ভাঙা পায়ে সে এগিয়ে এলো শৈলীর দিকে। শৈলীকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলো। সেই কান্না থামানোর সাধ্য কারও নেই। শৈলীরও নেই। সে স্বামীর কাঁধে মাথা রেখে, স্বামীর পিঠে হাত বুলিয়ে স্বামীকে থামাতে গিয়ে শৈলী নিজেই কান্না করে দিলো। ঘর এখন কান্নাকাটিতে একাকার।

লেখাঃ আবির আহম্মেদ পিয়াস

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s