সবাই দেখছে ছেলেটাকে!

Post ID # 021

সবাই দেখছে ছেলেটাকে!

অবাক হয়েই দেখে। কিন্তু কেউ কিছু বলেনা। সময় খুব খারাপ। কিসে কি হয় কে জানে। দেখতে দেখতে তার পাশ দিয়ে চলে যায়। কেউ দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। কারো চোখ ব্যাথায় টলমল করে। তবুও কেউ কথা বলার সাহস পায়না।

ছেলেটা দাড়িয়ে আছে গুলিস্তানের মোড়ে। ফুটপাতে। লোক যাতায়াতের মুখোমুখি জায়গায়। যে যতো ভাবনা নিয়েই থাকুক না কেন ছেলেটাকে এড়িয়ে যেতে পারেনা। পাষাণ মানুষকেও একদন্ড দাঁড়াতে হয়, একনজর দেখতে হয় ছেলেটাকে। দুঃখিত হয় সবাই কিন্তু সময়টা খুব খারাপ বলে চলে যেতে হয় নীরবে। মুখে কিছু না বললেও মন থেকে কেউ ছেলেটার দুঃখময় চেহারাটাকে মুছে ফেলতে পারেনা। ভাবতে হয় অনেকক্ষণ। টের পাওয়া যায় ছেলেটা খুব ক্ষুধার্ত। হাতে পায়ে জোর নেই। কাঁপছে। অথচ কাউকেই কিছু বলতে পারছে না।

ফ্যালফ্যালে চোখ। শুকনো খটখটে মুখ। টিঙটিঙে শরীর। বোঝা যায়, বাবা-মা নেই। এ ক’দিনের গন্ডগোলে কি হয়েছে কে জানে। এমন একটি এতীম স্বভাবের ছেলেকে দেখলে কার না দয়া হয়! সময়টা খুব খারাপ বলে কেউ কোন রকমভাবে সাহায্য করার সাহস পাচ্ছে না। গ্রাম হলে অনেক আগেই ছেলেটাকে নিয়ে কেউ চলে যেতো। কিন্তু ঢাকা শহর এখন ভয়ঙ্কর। রাত হলেই চোখ বেঁধে মানুষ নিয়ে যায়। দিনে দুপুরেও গোলাগুলির শব্দ হয়। যারা আছে, তারা সব সময়ই মৃত্যুভয়ে কাঁপছে। একজন মানুষ আর চুপ করে থাকতে পারলো না। চট করে ছেলেটির কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বললো,
: নাম কি?
: বিপ্লব।
লোকটা চমকে ওঠে। তারপর নিজেকে সামলিয়ে বলে,
: তোমরা কি হিন্দু?
ছেলেটা ছলছল চোখে মাথা নেড়ে বলে,
: না, আমরা মুসলমান।

রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের পর থেকেই ছেলেমেয়েদের নাম অনেকেই বাংলা ভাষাতে রাখার চেষ্টা করেছে। সে কারণেই হয়তো ছেলেটার নাম এরকম। তাড়াতাড়ি লোকটা অন্য প্রসঙ্গ তোলে। তোমার বাপ-মা কোথায়?
: জিঞ্জিরার অপারেশনে মারা গেছে।
নিঃশব্দে কেঁদে ফেলে ছেলেটা। দু’চোখ জলে ভাসতে থাকে।
: কেঁদো না। কাঁদলে অসুবিধা হবে। ওরা যদি জানে, তোমার বাবা-মা ওদের গুলিতে মারা গেছে তাহলে তোমাকেও ওরা মেরে ফেলবে। খবরদার, এ কথা আর কাউকে বলো না। আর তোমার এই নামটাও এমন বলো না কাউকে। ‘শহীদ’ কিংবা ‘শাহেদ’ এই ধরনের একটা খাঁটি মুসলমানি নাম বলবে। এই টাকাটা রাখো। কিছু খেয়ে নিয়ো।

আর এক মুহূর্ত দেরি না করে হনহন করে চলে গেলো মানুষটা। মিশে গেলো আর সব মানুষের ভিড়ে। ছেলেটা অনেকক্ষণ সেই ভিড়ের দিকে তাকিয়ে রইলো। এপ্রিল মাসের দুপুর। নিশ্চুপ খাঁ খাঁ রোদ চতুর্দিকে। নীল পাথরের আকাশ। বাতাস নেই কোথাও। মানুষের মত পাখিরাও পালিয়েছে ঢাকা শহর থেকে। একটা কাকের শব্দও নেই কোনখানে। গুমোট গুমোট গরম। সবাই ঘামছে। ঘাম নেই শুধু ছেলেটার। রোদে পুড়ে শরীরটা আরো কাঠ কাঠ হয়ে যাচ্ছে।

কারফিউয়ের মেয়াদ এখন অনেক শিথিল করেছে। রাত ন’টা থেকে ভোর পাঁচটা। ঢাকা শহরটাকে সবদিক থেকেই নাকি ওরা স্বাভাবিক দেখানোর চেষ্টা করছে। তবুও কিছুতেই হচ্ছে না। আগের সেই হৈ চৈ মুখর ঢাকা কেমন যেন একটা ভয় ভয় ভাব নিয়ে নীরব নিথর হয়ে পড়ে থাকছে সারাক্ষণ। দোকানপাট খুলেছে ঠিকই। অফিস- আদালতে লোকজনও যাচ্ছে। কিন্তু সেই ভয়াবহ ২৫শে মার্চের রাত। রাস্তাঘাটে গুলিবিদ্ধ লাশ। পাখির মত মানুষ মারার যুদ্ধ যুদ্ধ শব্দ। এসব কেউ ভুলতে পারছে না এখনো। মৃত্যুটাকে যেন হাতে নিয়ে চলাফেরা করছে সবাই। এখনো ওখানেই দাড়িয়ে আছে ছেলেটা। আগের মত হৈ চৈ কলরব নেই, কিন্তু মানুষের ভিড় আছে ঠিকই।

হঠাৎ বাবার কথা মনে হলো বিপ্লবের। তার বাবা ছিল হরবোলা। নানা রকম পশুপাখি জীবজন্তুর শব্দ করতে পারতো। তার কন্টে পশুপাখির শব্দ শোনার জন্য মানুষ ভিড় করে দাঁড়াতো। বাঘ- ভাল্লুকের শব্দ শুনলে সত্যি সত্যি মানুষ ভয় পেয়ে যেতো। আবার যখন বর্ষার বিভিন্ন ব্যাঙের শব্দ করতো তখন সবাই হো হো করে হেসে উঠতো। বিষাক্ত সাপের ফুঁসফুঁস শব্দে গোটা ভিড়টাই শিউরে উঠতো। আতঙ্কে ক্রমাগত পিছিয়ে যেতো। আবার দুই মোরগের ঝগড়া কিংবা দুই নেড়ী কুত্তার ঝগড়ার শব্দ শুনলে হাসাহাসি করে হাততালি দিতো পাবলিক। এই ছিলো তার বাবার ব্যবসা। লোকের কাছ থেকে হাতজোড় করে গামছা পেতে যে পয়সা কড়ি পেতো তাই দিয়েই তার সংসার চলতো।

বাবার কাছ থেকে প্রায় সব পশুপাখির ডাকই শিখেছে বিপ্লব। কিন্তু বাবার বারণ আছে, এসব সে কোনদিনই অন্যকে শোনাতে পারবে না। বাবা একরকম বিপদে পড়েই এসব করেছে, টাকা- পয়সা থাকলে অন্য ব্যবসা করতো কিংবা একটা মুদি দোকান দিতো। টাকা- পয়সা নেই বলেই হরবোলা সেজেছে। এসব ভালো না। সবসময় পশুপাখি জীবজন্তুর ডাকাডাকি নকল করে বেড়ালে কিছুদিন পর মানুষও পশুর মতো হয়ে যায়। মানুষ আর তখন তাকে মানুষের মত দেখে না। পশুই ভাবে। পশুর মতই ব্যবহার করে। বাবা মনে খুব দুঃখ নিয়ে এসব কথা বলতো বিপ্লবকে। বাবার স্বপ্ন, লেখাপড়া শিখতে শিখতে তার বিপ্লব একদিন মওলানা ভাসানী কিংবা শেখ মুজিবের মতো গরম গরম বক্তৃতা দেবে। দেশের লক্ষ জনতা তার বক্তৃতা শুনবে। তার বিপ্লব হবে দেশের নেতা। তাদের জ্বালাময় বক্তৃতাও নকল করতে পারতো বাবা। বিপ্লবকেও শিখিয়েছে।

বারবার মার কথাও মনে পড়লো। পশুপাখির ডাক মা সহ্যই করতে পারতো না। এসব শুনলে তার শরীরে যেন আগুন লাগতো। দাউ দাউ করে জ্বলে উঠতো মেজাজ। এ নিয়ে প্রায় সর্বক্ষণই বাবা-মার ঝগড়া হতো। বাবার কাছ থেকে দূরে দূরে রাখতে চাইতো বিপ্লবকে। কিন্তু বিপ্লবের খুব শখ ছিল এসব ডাক শেখার। এক এক সময় গোঁ ধরতো। স্কুলে যেতে চাইতো না। বাবা-ছেলের ভেতরে তখন একটা গোপন চুক্তি হতো। বাবা দূরে থেকে ঘুঘু কিংবা কোকিলের ডাক ডাকবে। সেই ডাক অনুসরণ করে গেলেই জায়গামত গিয়ে পাবে বাবাকে। বাবা তখন সেই নিঝুম- নিরালা জায়গায় সুন্দর সুন্দর পাখপাখালির ডাক শেখাবে বিপ্লবকে। এভাবেই গোপনে গোপনে বাবার কাছ থেকে শিখেছে সব।

বাবা- মার কথা ভাবতে ভাবতে এখানকার কথা ভুলে গিয়েছিলো বিপ্লব। দুপুর গড়িয়ে যাচ্ছে, সেই সঙ্গে মানুষও কমে যাচ্ছে শহর থেকে। ভাবসাব দেখে মনে হচ্ছে বিকেলের দিকে কোন মানুষই থাকবে না শহরে। গোরস্তানের মত নিঝুম হয়ে পড়ে থাকবে। কোথায় যাবে, কি করবে, কিছুই ভেবে পাচ্ছে না বিপ্লব। হঠাৎ আবার বাবার কথাই মনে পড়ল বিপ্লবের। বাবা বলেছিল, মানুষ আর আজকাল মানুষের দুঃখ বোঝেনা। শেয়াল- কুকুরের মত যদি কেউ কাঁদতে পারে, তখন একটু দয়ামায়া দেখা যায়। দুই একজন এগিয়ে আসে। সময় খুব খারাপ। আর এক মুহূর্ত দেরি না করে তিন- চারদিনের ক্ষুধার্ত কুকুরের মত গুলিস্তানের মোড়েই দিন দুপুরে কাঁদতে লাগলো বিপ্লব। টানা সুরের হৃদয়ভাঙ্গা কান্না।
চমকে উঠলো মানুষ।
চমকে উঠলো শহর।
ছোটখাট ভিড় জমে গেল বিপ্লবের চতুর্দিকে।
বিপ্লব ক্ষুধার্ত কুকুরের মত কাঁদে। তেরো- চৌদ্দ বছরের বছরের ছেলেটার এই অবস্থা দেখে সবারই মায়া হয়। যে যা পারে টাকা- পয়সা দিয়ে সাহায্য করতে থাকে। ভিড় বড় হয়। মিলিটারীর ভয়ে আবার তা ভেঙ্গে যায়। আবার কিছু লোক আসে। সাহায্য করে। শহরের অবস্থা ভাল নয় বলে খুব দ্রুত চলেও যায় তারা। এক সময় একদম ফাঁকা হয়ে গেল শহর। বিকেল বেলাতেই শহর শূন্য। দোকানপাট গুলোও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে দ্রুত। যানবাহন নেই বললেই চলে। হলুদ রঙের টুকরো টুকরো রোদ ফেলে দিয়ে সূর্যও খুব দ্রুত চলে যাচ্ছে পশ্চিমে।

ঠিক এমনি সময় সুন্দর ঝকঝকে লাল টুকটুকে একটা গাড়ি এসে থামলো বিপ্লবের সামনে। গাড়ির ভেতরে বেদানা রঙের দুটি কচিবাচ্চা পুতুল নিয়ে খেলছে। খিলখিল করে হাসছে। আর আছে সাহেব-মেমসাহেব। বিপ্লবের হঠাৎ মনে হলো কুকুরের মত কাঁদলে বাচ্চা দুটি যদি ফসফস করে কেঁদে ওঠে? তাই সে বিভিন্ন পাখির ডাক দিতে লাগলো। টুনটুনি বাবুই টিয়ে পাখির ডাক। বাচ্চারা খিলখিল করে হেসে উঠে। আবার দুষ্টু বানরের মত শব্দ করে হাত-পা চুলকালে বাচ্চা দুটি হাসিতে ফেটে পড়ে।

বিপ্লব যখন আবার ময়না পাখির সুরে সুরে কথা বলে, সালাম জানায়, তখন বাচ্চা দুটি তখন তাকে ধরার জন্য কচি কচি হাত মেলে ডাকে। এসব ডাকাডাকির খেলা খেলতে খেলতে বিপ্লব সেই লাল টুকটুকে গাড়ির কাছে এসে দাড়িয়ে পড়েছিলো অনেক আগেই। গাড়ি থেকে মুখ বের করে সাহেব এখন তাকে জিজ্ঞেস করছে,
: টুমার নাম কি?
হঠাৎ সেই লোকটার কথা মনে পড়ে যায় বিপ্লবের। তাড়াতাড়ি সে মিথ্যা নাম বলে,
: শহীদ।
: ঘর কোনখানে?
: আমার কোন ঘরবাড়ি নাই।
: বাপ মা ভাই বোন?
: কেউ নাই।
: টুমি হামার বাচ্চাদের সঙ্গে পাখি পাখি খিলা করতে পারবে?
: পারবো।
: হামার বাড়িতে থাকবে? ভাল ভাল খাবার পাবে। জামা- কাপড় পাবে, যাবে টুমি?
চারদিক একবার দেখে নেয় বিপ্লব। সন্ধ্যার আগেই শহর শূন্য। তাড়াতাড়ি বিপ্লব বলে- যাবো।

এখন তার নাম শহীদ। দু’দিন পরই টের পেয়েছে তার সাহেব-মেমসাহেব বিহারি। বিরাট বড়লোক। অনেক রকম ভাষা জানে তারা। উর্দু, ইংরেজি। বাংলাও বলতে পারে ভাল। শহীদের সঙ্গে তারা বাংলাতেই কথা বলে। খুব আদর করে শহীদকে। ভাল ভাল খাবার খাওয়ায়। নতুন নতুন জামাকাপড় কিনে দিয়েছে। দামী দামী ফলমূলও দেয় শহীদকে। তার কাজের মধ্যে কাজ শুধু বাচ্চা দুটিকে নিয়ে খেলা করা। পাখি পাখি ডাকাডাকির খেলা।
সারাদিন আনন্দেই থাকে শহীদ। রাতে মাঝে মাঝে শুধু আওয়াজ পায় সে। প্রায় সব রাতেই গোলাগুলির শব্দ শোনা যায়। জীপ নিয়ে ঝাঁক বেঁধে মিলিটারী আসে এ বাড়িতে। অনেক রাত পর্যন্ত সাহেব মেমসাহেবের সঙ্গে আড্ডা দেয়। তারপর আবার হাসাহাসি করে চলে যায়। সাহেব তখন শহীদকে ডাকে না। শহীদ ঘুমের মত পড়ে থাকে নিজের ঘরে।
শহীদকে হঠাৎ একদিন নতুন ডিউটি দিল সাহেব। তার আগে অবশ্য শহীদকে জিজ্ঞেস করেছে, রাগী অ্যালসেসিয়ান কুকুরে ডাক সে দিতে পারে কিনা।

সাহেব মেমসাহেব খুব আদর করে বলে, তাই সে আর মিথ্যে বলতে পারেনি। বলেছে, সে পারে। তারপরও বিশ্বাস হয়নি সাহেবের। রীতিমত অ্যালসেসিয়ান কুত্তার ডাকের পরীক্ষা দিতে হয়েছে তাকে। পাশ করেছে শহীদ। সাহেব মেমসাহেব আরো খুশি তার উপর। সেদিন থেকেই শুরু হয়েছে তার এই নতুন ডিউটি। সাহেব বলেছে, বাড়িতে সে কোন কুকুর রাখবে না। দিনকাল ভাল নয়। চোর ডাকাতের ভয় আছে। তার আদেশ, আজ থেকে শহীদকেই সারারাত জাগতে হবে। মাঝে মাঝেই ভীষণ রাগী এক অ্যালসেসিয়ান কুত্তার মত ডাকতে হবে। যে ডাক শুনে চোর ডাকাত তো ভয় পাবেই, পাড়াপড়শীরাও মনে করবে এ বাড়িতে ভয়ঙ্কর এক অ্যালসেসিয়ান কুত্তা আছে। কাছে পেলেই বত্রিশটা দাঁত বসিয়ে দেবে শরীরে। তখন আর বাঁচার উপায় থাকবে না। হয়েছেও তাই। সারারাত আর ঘুমায় না। অ্যালসেসিয়ানের মত ডিউটি দেয় শহীদ। তার ভয়ঙ্কর ডাকে রাতের এই ধানমন্ডি এলাকা কাঁপে। নিঝুম- নিশুটি রাত বলে অনেক দুর পর্যন্ত শোনা যায় তার ডাক। মাঝে মাঝেই সে ‘ঘাউ ঘাউ’ করে ডেকে ওঠে। সাহেব শুধু বলে দিয়েছে, মিলিটারীরা যখন তার বাড়িতে আসবে তখন যেন সে চুপ থাকে। ওরা ফিরে যাবার সময় জীপে ওঠা মাত্রই তাকে আবার খুব জোরেশোরে ডাকতে তে হবে। শহীদ তাই করে। অক্ষরে অক্ষরে পালন করে সাহেবের কথা।

দেশের কি অবস্থা হচ্ছে তা সে জানে না। বেরোতেই পারেনা এ বাড়ি থেকে, জানবে কি করে। তবে তার শরীরের অবস্থা খুব খারাপ। রাত জাগতে জাগতে কেমন যেন দুর্বল হয়ে যাচ্ছে দিনের পর দিন। সারাদিনই জ্বরজ্বর লাগে। খাবার খেতে গেলেই জিবটা হয়ে যায় তেতো। সাহেব খুব চালাক। রাত জেগে ডাকাডাকির মধ্যে সেই তেজীভাবটা ক্রমশ দুর্বল হয়ে যাচ্ছে কেন? পরের দিনই বড় এক ডাক্তার এনেছে বাড়িতে। ভালভাবে পরীক্ষা করেছে শহীদের শরীর। ডাক্তার দামী ওষুধ দিয়েছে। ভাল ভাল পুষ্টিকর খাবার খেতে বলেছে। সাহেব কি ধুরন্ধর, ডাক্তারকেও জানায়নি যে সে সারারাত কুকুরের ডিউটি দেয়? শহীদ যদি হঠাৎ বলে দেয়, সেই জন্য ডাক্তার আসার আগেই শহীদকে সতর্ক করে দিয়েছে।

খাওয়া দাওয়ায় শরীর ভাল হলে কি হবে, মনটা খুবই খারাপ হয়ে গেছে শহীদের। মানুষ হয়ে শেষ পর্যন্ত সে একটা পোষা কুকুরের চাকরি করছে একটা বাড়িতে? এ কথা মনে হলেই অ্যালসেসিয়ান কুত্তার মতই রেগে যায় সে। একটা লাফ দিয়ে সাহেবের ঘাড় মটকাতে ইচ্ছা করে। কিন্তু মনটা যে আবার মানুষের মত। সময়টা খারাপ বলে চুপ করেই থাকতে হয় তাকে।

সবচেয়ে বেশি কষ্ট হয় বৃষ্টির রাতে। এবারের বৃষ্টিও জিঞ্জিরার অপারেশনের মত। হঠাৎ ঝমঝম করে নামে। বিদ্যুৎ বজ্রপাতে পৃথিবী কাঁপে। মিলিটারীর মত ঝড় এসে গাছপালা ছিন্নভিন্ন করে যায়। ছিটা গুলির মত শিলাবৃষ্টিতে কেটে ছেটে যায় সারা শরীর। তারপরও ঘাউ ঘাউ করে ডাকতে হয় সারারাত। গাড়ি বারান্দায় আশ্রয় নেবার একটু জায়গা থাকে। কিন্তু এবারের বৃষ্টির ভীষণ তেজ। চতুর্দিক থেকেই দাপাদাপি করে ছুটে এসে আঘাত করে। ভিজে জবজবে হয়ে যায় শরীর। ঠান্ডা হয়ে যায় রক্ত। শরীর তখন ঠকঠক করে কাঁপতে থাকে। ঐ অবস্থাতেও ডিউটি দিতে হয়। ঘাউ ঘাউ করে চিৎকার করতে হয় সারা বাড়ি ঘুরে ঘুরে। জিঞ্জিরার অপারেশনের কথা মনে হতেই বাবা মার কথা মনে পড়ল অনেকদিন পর। কুকুর হয়ে ডিউটি দিতে দিতে সবই যেন ভুলে গিয়েছিল সে। মনে পড়লেও তেমন কিছু মনে পড়েনা। হাজার মানুষের ভেতরে সেও বাবা মার সাথে দৌড়ে দৌড়ে যাচ্ছিল। চতুর্দিকেই যুদ্ধ যুদ্ধ শব্দ। হঠায় গুলি খেয়ে পাখির মত মাটিতে পড়ে গেল বাবা মা। চারদিকে ছিল কুয়াশার মতই গোলাবারুদের ধোঁয়া। বাবা মার বুকে পড়ে যে একটু কাঁদবে, হাজার মানুষের ভিড়ে সেই সুযোগও পেল না। মানুষের দৌড়াদৌড়ি এবং ধাক্কাধাক্কিতে হারিয়ে ফেলেছে বাবা মার লাশ। পেছনে যাওয়ার উপায় নেই। মানুষের ভিড় তাকে ঠেলে নিয়ে গিয়েছে অনেক দুরে। তাদের কবর দেয়া হয়েছে কিনা তাও জানেনা সে। বাবা মার কথা মনে হলেই শুধু একটা যুদ্ধ যুদ্ধ দৃশ্যের কথা মনে পড়ে শহীদের। এছাড়া আর কিছুই মনে পড়েনা তার। কান্নাও আসেনা। কেমন যেন বাপ মা হারানো একটা নিশ্চুপ ব্যাথা অনুভব করে শুধু। সে ব্যাথাটাও শুকনো শুকনো খড়ি কাঠের মত। বাবা মা যেন ঝরাপাতা। হঠাৎ খসে পড়েছে। কোথাও হারিয়ে গেছে সেদিনের বাতাসে। অনুশোচনা এইটুকুই। এর বেশি কোন দুঃখ সে অনুভব করতে পারেনা। কুকুরের মত ডাকতে ডাকতে কুকুরই হয়ে গেছে। মানুষের স্বভাবচরিত্র নষ্ট হয়ে যাচ্ছে তার। সে বুঝতে পারছে ঠিকই কিন্তু শুধরানোর উপায় নেই। দিনের বেলায় ঘুমুতে হয়। বাইরের কারো সঙ্গে দেখা সাক্ষাতের উপায় নেই। বাড়ির মানুষ কথা বলে উর্দুতে। সন্ধ্যা হলেই আবার সে কুকুর হয়ে যায়। সুতরাং নিজের মাতৃভাষাও যেন সে ভুলে যাচ্ছে দিনের পর দিন। একটানা বৃষ্টি হচ্ছে তিন চার দিন যাবত। টিপ টিপ বৃষ্টি। ঝড় বিদ্যুতের দাপাদাপি নেই। বাবার দুর্ব্যবহারে মা যেমন চুপিচুপি কাঁদতো সারাদিন, এই বৃষ্টির ধরনটাও সেই রকম। রাগ নেই। দুঃখে দুঃখে দিনরাত শুধু কাঁদছেই।

আকাশেও কাদামাটির মত নরম মেঘ। অন্ধকার কেমন যেন ফ্যাকাশে। আগের মত সেই ভয়ঙ্কর কালো রং নেই। মিলিটারীরাও আজকাল আর হৈ চৈ করেনা। চুপচাপ করে আসে এই বাড়িতে। ফিসফিস টুসটাস কি কি বলাবলি করে আবার নিশব্দেই চলে যায়। সাহেবের মনও ভালো না। আজকাল কথা বলে খুব কম। ঝিম ধরে থাকে দিনরাত। কোথায় যেন কি হচ্ছে, শহীদ ঠিক বুঝতে পারছে না।

এখন অনেক রাত। চারদিক চুপচাপ। গাড়ি বারান্দায় ভেজা কুকুরের মতো গুটিশুটি মেরে বসে আছে শহীদ। ভেজা চাদরে শরীর ঢেকে হঠাৎ বাইশ তেইশ বছরের এক যুবক নিঃশব্দে শহীদের কাছে এসে বসতেই ঘাউ ঘাউ করে গর্জে ওঠে শহীদ। যুবকটি নিজেকে বাঙ্গালি বলে ফিসফিস শব্দে পরিচয় দেয়। খুব অবাক হয়ে যায় শহীদ। সাহেব যদি টের পায় সেই কারণে আবার কিছুক্ষণ কুকুর হয়ে ডাকাডাকি করে চুপ হয়ে যায়। অন্ধকারে যুবকটিকে চিনবার চেষ্টা করে শহীদ। অনেকদিন পর এ বাড়িতে বাইরের একজন মানুষের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পেয়েছে সে। তাও আবার একজন বাঙ্গালি মানুষ। কাদাতে আকাশ। টিপটিপানি বৃষ্টি। মেঘলা মেঘলা অন্ধকারে কিছুতেই মানুষের মুখটা ভালভাবে দেখতে পারছে না। মুখের অর্ধেকটা আবার চাদর দিয়ে প্যাঁচানো। তবে তার কথাগুলো বাবা মার আদরের মত। স্নেহ মায়া মেশানো। একটানা বেশিক্ষণ আবার কথা শুনতে পারেনা শহীদ। সাহেবের ভয়ে ঘাউ ঘাউ করে ডাকতেই হয় মাঝে মাঝে। সাহেব জানুক, সে জেগে আছে। প্রভুভক্ত কুকুরের মত এই মেঘবৃষ্টির দিনেও সে পাহারা দিচ্ছে।
এই দিনে বৃষ্টিরও বিশ্বাস নেই। হঠাৎ ঝমঝম করে বৃষ্টি নামলো খুব জোরে। দশদিকেই বৃষ্টির তুমুল শব্দ। এর ভেতরে ঘাউ ঘাউ করে ডাকাডাকি করলেও সাহেব শুনতে পাবেনা। ভালোই হলো। নিজেরা অনেক্ষন আলাপ আলোচনা করতে পারবে। কিন্তু বৃষ্টির শব্দ ক্রমাগত বাড়ছেই। আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টি পড়ছে। নিজেরাও নিজেদের কথা ভালোভাবে শুনতে পাচ্ছে না।

মুক্তিযোদ্ধা। স্বাধীনতা যুদ্ধ। থ্রী নট থ্রী। গ্রেনেড। এরকম কোন শব্দের সঙ্গেই পরিচয় নেই শহীদের। এর আগে সে কখনো শোনেওনি। শুনবে কি করে? সে তো আর মানুষ নেই। কুকুর হয়ে গেছে। তবে হ্যাঁ, এই বৃষ্টিতেও শব্দগুলো গনগনে আগুনের মত লাগছিল শহীদের কাছে। অনেক রকম কথা বলে বলে মানুষটা ক্লান্ত হয়ে গেছে। কোন কিছুই বোঝাতে পারছে না শহীদকে। শেষে যখন বললো,

: তোমার বাবা মাকে মেরেছে কারা?
এই কথাটা সহজেই বুঝতে পারলো শহীদ। তাড়াতাড়ি জবাব দিলো,
: মিলিটারীরা।
: সেই মিলিটারীরা এই বাড়িতে আসে?
: প্রায়ই আসে।
: তাদেরকে দেখলে তোমার রাগ হয়না? বাবা মার প্রতিশোধ নিতে ইচ্ছা করেনা? আগুন জ্বলে ওঠে না বুকে?
: দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে। বাবা মার সেই মৃত্যুর দৃশ্যের কথা মনে পড়ে। কিন্তু কি করবো? আমি তো ছেলেমানুষ। রাত হলেই এ বাড়ির কুকুর হয়ে থাকি। জানেন, আমার আসল নাম বিপ্লব। ভয়ে সাহেবের কাছে বলেছি আমার নাম শহীদ।
কথাগুলো বললো খুবই সরলভাবে। মানুষটার কাছে তা বুক বোঝাই কান্নার মত লাগলো। আবেগে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে মানুষটা বলতে চেয়েছিলো,
: আমি মুক্তিযোদ্ধা। আমার সঙ্গে অস্ত্র আছে। ওরা আমাদের বাংলাদেশটাকেই তোমার মতো কুকুর বানিয়ে রেখেছে। কিন্তু বলতে পারলো না কথাগুলো। সে খুব সহজ সরল ছেলে। এসব কথা বুঝার মতো তার বুদ্ধি নেই। মানুষটা বরং খুব আদর দিয়ে বললো,
: আমি তোমার বাবা মার প্রতিশোধ নেবো।
: কেমন করে?
মানুষটা আরো ফিসফিস করে বলে,
: এ বাড়িতে মিলিটারীরা আসলেই আমাকে জানাবে।
: আমাকে তো বাড়ির বাইরেই যেতে দেয়না। আপনি কোথায় থাকেন তাও তো জানিনা। জানাবো কি করে?
: আমি তোমার কাছেই থাকি। তুমি তো প্রতি রাতেই ঘাউ ঘাউ করে অ্যালসেসিয়ানের মতো ডাকো। যখন তুমি ঘনঘন ডাকবে। খুব জোরে জোরে কতোক্ষণ ডাকলেই আমি টের পাবো এই বাড়িতে মিলিটারী এসেছে।
: আচ্ছা।
যেন সে পরম তৃপ্তির মতো খুব খুশি হয়ে আচ্ছা শব্দটা বললো।
তুমুল বৃষ্টির মধ্যেই চট করে মানুষটা চলে গেলো। হাঁ হয়ে রইলো শহীদ। মানুষটা কি ভূত না জ্বীন। তার আসা যাওয়ার কোন শব্দ পাওয়া গেল না। বেশ একটু ভয়ই পেলো শহীদ। মনে হলো অনেকক্ষন সে ডাকাডাকি করেনি। সাহেব কি সব টের পেলো? ওই ঝমঝমে তুমুল বৃষ্টির মধ্যেও আবার সে ঘুরে ঘুরে বাড়ির এ মাথা থেকে ও মাথা পর্যন্ত ভিজে ভিজে ডাকা ডাকি করলো। ঘাউ ঘাউ, ঘাউ ঘাউ।

আজকাল আর বৃষ্টি হয়না। আকাশ খুব পরিষ্কার থাকে। খুব জোছনা থাকে রাতে। মা একদিন বলেছিলো, এ রকম জোছনায় পরী নামে পৃথিবীতে। ঝিকমিক ঝলমল করে আকাশের তারা। একটু একটু শীত লাগে। চুপচুপ করে শিশির পড়ে। ভেজা থাকে ঘন ঘাস। কুয়াশা কুয়াশা লাগে মাঝে মাঝে। এইরকম এক রাতে একদল মিলিটারী আসলো এই বাড়িতে। জীপ থেকে নেমেই গাড়ির বাতি নিভিয়ে দিলো। তাদের মন খুব খারাপ। আগের মত হৈ হল্লা নেই। সবাই দুঃখ দুঃখ ভাব নিয়ে বসে আছে। একজন শুধু তার সাহেবকে বললো, জলদি বাড়ি ছাড়ো। টিকিট কাটো করাচির।

এতদিন থাকার পর ওদের কথা এখন কিছু কিছু বুঝে শহীদ। সে ভাবলো, ওরা আর এই দেশে থাকবে না, পালাবে। মানুষটার কথা মনে পড়লো শহীদের। বলেই গেছে খুব কাছেই সে থাকে। তাকে খবরটা জানানো দরকার। সত্যি সত্যি যদি সে মানুষ হয় তাহলে নিশ্চয়ই আসবে। শহীদ কুকুর হয়ে খুব জোরে জোরে ঘাউ ঘাউ শব্দ করে ডাকতে লাগলো। সাহেবের নিষেধ ছিল, বাড়িতে মিলিটারী থাকলে সে যেন তখন না ডাকে। আজ সেই হুকুম ভুলে গেছে বিপ্লব। খুব রেগে যাওয়া অ্যালসেসিয়ানের মতো ডাকছে তো ডাকছেই। দোতলা থেকে সাহেব চিৎকার করে বলছে, চোপ রাও, চোপ রাও। সেদিকে কোন খেয়ালই নেই বিপ্লবের। পাগলা কুকুরের মত সে শুধু দৌড়াদৌড়ি করছে আর ডাকছে। সাহেবের কোন বাধাই সে মানছে না। মিলিটারীদের সন্দেহ হয়। রাগে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে সাহেব তাকে গুলি করে। উপরের দিকে লাফ দিয়ে উঠেই ধপাস করে মাটিতে পড়ে যায় বিপ্লব। কারা যেন পাল্টা গুলি করে সঙ্গে সঙ্গেই। টের পায় মিলিটারীরা। তারা আর পালাতে পারেনা। সমস্ত বাড়িটা চতুর্দিক থেকেই ঘিরে ফেলেছে মুক্তিযোদ্ধারা। একে একে বাড়ির সবাই আত্মসমর্পণ করলো মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে।

মানুষটা তখন কোলে তুলে নিয়েছে বিপ্লবের রক্তাক্ত শরীর। বিপ্লব খুব কষ্ট করে বলছে,
: তুমি সেই মানুষ?
: হ্যাঁ।
: আমার ডাক শুনেছো?
: হ্যাঁ।
: স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ- এসবের মানে কি তাই, আমি কোনদিন দেখিনাই।
মানুষটা এবার কেঁদে ফেলে। তারপর বিপ্লবের রক্তেই ভিজে যাওয়া নিজের হাতটা দেখিয়ে বলে,
: এই দ্যাখো, স্বাধীনতা এই রকম!

বিপ্লব তখন আর বেঁচে নেই। তার নিষ্প্রান দুটি খোলা চোখ শুধু তাকিয়ে আছে মানুষটার দিকে। বিপ্লব স্তব্ধ।

লেখাঃ Amoeba Shuvo
‪#‎হরবোলা‬

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s