শুন্য খাঁচা

Post ID # 023

করিডোর দিয়ে কিছু দূর হেটে যেতেই নিশুকে দেখলাম। ডাক দিতেই থামল নিশু। পিছন ফিরে একবাই দেখল একটু হাসার ভান করে ফের হাটা ধরল করিডোরের পথে। নিশু এমন আচারনের কারন আমার জানা। বন্ধুরা মিলে যাচ্ছে সমুদ্র ভ্রমনে। তাদের এই পরিকল্পনা ১ বছর আগ থেকে। এই পরিকল্পনায় আমিও ছিলাম একটা সময়। এখন গুটিয়ে নিয়েছি। সেই স্কুল জীবন থেকে এক সাথে আমরা। প্রত্যেক ভ্রমনে আমার নামটাই কাটা পরত। বাবার নির্দেশ। তবে সমুদ্রপাড় ঘোরার ইচ্ছেটা আমার বহু দিনের। প্রথম যখন ভ্রমনের কথা তোলা হলো সবচেয়ে খুশি আমি ছিলাম। কত প্লানিং ছিলো আমার! কিন্তু ভুলে গিয়েছিলাম পারিবারি পরিবন্ধকতার শেকল আমার পায়ে বেধে দেওয়া হয়েছে সেই ছোটবেলা থেকে। বাবা মাকে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন বন্ধুদের সাথে যাওয়া হচ্ছে না আমার। নিশু , মিথিলা খুব করে চায়ছিল আমাকে। বাবার অবাধ্য হওয়ার সাহস আমার নেই।

বাবাকে আমি ভালোবাসি। তবে তার বেধে দেওয়া শেকল দেখে নিজকে বড্ড বেশি পরাধীন মনে হয়।

এসব ভাবতে ভাবতে ক্লাস রুমের সামনে এসে দাড়ালাম। নিশু পাশে রফি , মিথিলা আর সুমিতও আছে। আমি নিশুর দিকে আগাতেই সে অন্য দিক হয়ে সরে দাড়াল। সবাই কেমন চুপ হয়ে গেছে। আমি আসার আগে তাদের গুন্জন শুনছিলাম। আমাকে নিয়ে ছিলো হয়তো। তাদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। তাদের এই অভিমান সেই ছোটবেলা থেকে বাড়তে বাড়তে আজ এই পর্যায় এসেছে। সবার দিকে তাকিয়ে একবার হাসলাম আমি। তাদের চেহারার কোন পরির্বতন এলো না। অনেকক্ষণ চুপ ছিলাম। আমাকে দেখে তারাও কথা বলছে না। অসস্থি সরাতেই মুখ খুললাম আমি

“কি তোদের প্লানিং কত দূর?” প্রশ্নটা করে নিজেকে বোকা মনে হলো। তাদের মধ্য থেকে কেউ উত্তর দিলো না।

_ “কিরে কিছু বলছিস না যে?” না পেরে ফের বললাম। এইবার মিথিলা মুখ খুলল

“সামনের সপ্তাহে” _ রফির বোধহয় মায়া হলো। আমাকে দেখে উত্তরটা দিলো সে।

“ক্লাসের দেরি হচ্ছে” _ বলেই পিছন দিকে হাটা ধরল মিথিলা। তার পিছন পিছন হাটা ধরল অন্যরা শুধু নিশু বাদে।

– “কিরে কিছু বলবি?” _ আমার কথা শুনে নিশু তাকিয়ে বলল

“আঙ্কেল অনুমতি দিয়েছে?” _ নিশুর প্রশ্নে উত্তর দিলাম না আমি। বাবা যেতে দিবে না তা সবার জানা। অনেকের ধারনা ইচ্ছেকৃত এমন করি আমি। শুধু নিশুই বুঝে।

আমি আর নিশু ক্লাসের পথে হাটা ধরেছি। পিছন থেকে রুদ্রের ডাক শুনতে পেলাম। দৌড়াতে দৌড়াতে আসছে সে। প্রতিদিনের মতোই ক্লাসে লেইট পারসন।

আমাদের চেহারা দেখে ভুর কুচকাল রুদ্র। “তাড়াতাড়ি ক্লাসে চল , দেরি হচ্ছে” _ রুদ্রের দিকে তাকিয়ে বললাম আমি।

পুরো ক্লাসের ব্যাঞ্চের এক কোণে বসে ছিলাম। কেউ আগ্রহ দেখায়নি কথা বলার। সত্যি বলতে কি , একটা সময় রাগ হতো। লজ্জা পেতাম। তাদের কাছে ছোট হতে হচ্ছে। এখন আর হয় না। আমার অনুভুতি গুলো যেন লোভ পাচ্ছে। চার দেয়ালে বন্ধি থাকা মেয়েটির কিসের আবার অনুভুতি?

আমার বন্ধু গুলো এমন ছিলো না। আমার জন্যই এমন হচ্ছে। তাদের অভিমান একদিনের না। অনেক দিনের। বন্ধ বান্ধবের সাথে আড্ডা, ঘুরোঘুরি এসবে কোনো কালেঈ ছিলাম না। ক্লাস ছুটিতে বন্ধুরা যখন গল্পে মেতে থাকত আমি তখন ছুটতাম বাসার উদ্ধেশ্যে। সময়মত বাড়ি না ফেরলে বাবার হাজার প্রশ্ন। আমার জীবনটা একটা নির্দিষ্ট গন্ডির ভেতর আটকে আছে। যে শেকলটা বেধেছে আমার বাবা। বাবার কড়া শাসন আর কথার বিরুদ্ধে যাওয়ার সাহস আমার নেই। আমার বন্ধুদের মতো স্বাধীনতা আমি পাইনি। বন্ধু গুলোর ধারনা , “একবার বুঝিয়ে বললে হবে”

কিন্তু বাবাকে বুঝিয়ে বলা অর্থ হলো তার মুখের উপর তর্ক।
একবার নিশুর বাসায় থেকে গিয়েছিলাম সবার অনুরোধে। বাবা মুখে কিছু না বললে ও আমার সাথে এক মাস কথা বলেনি। সেদিন নিজেকে বড্ড বেশি অপরাধী মনে হয়েছিল। বাবাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে বলেছিলাম তার অবাদ্ধ আর হবো না। আমার ইচ্ছে গুলোকে সেইদিন মনের খাঁচায় বন্ধি করে রেখে দিয়েছিলাম।

এসব ভাবতে ভাবতে হাটছি। কখন যে পিছ থেকে এসে রুদ্র ধরল খেয়াল করিনি। রুদ্রের সামনে দাড়ালাম।

“কিরে কানে শুনিস না?কখন থেকে ডাকছি” _ হাঁপাতে হাঁপাতে বলল রুদ্র।

” তোর কথা ভেবে হাটছিলাম তাই শুনিনি” _ রসিকতা করি আমি। একটা লম্বা নিশ্বাস নিয় রুদ্র হাটা ধরল আমার সাথে।

রিক্সায় বসে আছি আমরা দুজন। সবার চায়তে রুদ্র আমাকে বুঝে। সেই ছোটবেলার বন্ধু। আমি চুপ মেরে আছি। হঠাত্ রুদ্র বলল

“জানিস তিথি , আমার এখন কি মনে হচ্ছে?”

“কি?”

“মনে হচ্ছে শরত্চন্দের ফিমেল দেবদাশ বসে আছে পাশ” _ বলেই হাসতে লাগল সে। আমিও হেসে দিলাম। রুদ্রের সামনে কেউ মন খারাপ করে থাকতেই পারে না। বিশেষ করে আমি। আমার মন ভালো করার বন্ধু সে।

“হুমম এইবার বল কি হয়েছে?_ গম্ভির ভাবে জানতে চায় রুদ্র

“ক্লাসের সবাই রেগে আছে। বাবার অনুমতি পাইনি। কিভাবে যাই?”

রুদ্র চুপ হয়ে থাকে। বাবাকে চেনা আছে তার। রুদ্রের সাথে সাথে আমিও চুপ। যেন কারো কোন কিছু করার ক্ষমতা নেই।

[]

রুমে এসে বসে আছি। হঠাত্ মোবাইল বেজে উঠল। হাতে নিয়ে দেখি নিশুর ফোন। পরশুদিন তারা যাচ্ছে। যাওয়ার আগে শেষবার জেনে নিতেই ফোন দিয়েছে

_ তাহলে তুই যাচ্ছিস না তিথি?
এপাশে আমি চুপ থাকি। বলতেও লজ্জা লাগছে

অপাশে নিশু ক্ষানিক চুপ থেকে লাইন কেটে দেয়। বড্ড বেশি অপরাধী মনে হয় নিজেকে।
মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে প্রতিবাদ করে বাবাকে কিছু বলি। বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে বলা হয়ে উঠে না। মানুষটা অনেক ভালোবাসে আমাকে। বাবার হাসির জন্য আমার ইচ্ছের ড়ানা গুলোকে মেলতে দেই না।

ফোন রেখে চুপ হয়ে বসে আছি অনেকক্ষণ ধরে। মা কখন এসে দরজায় দাড়িয়েছে খেয়াল করিনি। মা পাশে এসে বসে হাত ধরলেন। মায়ের স্পর্শ পেয়ে তাকালাম

_”তোর মন খারাপ?” _ জানতে চায়লেন মা। আমি উত্তর না দিয়ে চুপ হয়ে আছি

“তোর বাবাকে নিয়ে বলার কিছু নেই। এক কথার মানুষ”

মায়ের এ কথার ও কোন উত্তর দেই নিই। কেনো যেন মায়ের উপর প্রচন্ড রাগ হচ্ছে। রাগটা অভিমান ও বলা যায়। আজ এতটা বছর বাবার সাথে থাকছেন মা। একটা বার ও প্রতিবাদ করেনি। করলে হয়তো আজ আমার পায়ে শেকল বাধা থাকত না। মা তার সব শখ , ইচ্ছে , স্বপ্নকে গলা টিপে মেরেছি শুধুমাত্র সংসারটি আগলে রাখার জন্য। আচ্ছা এসব কিছু কেনো একটা মেয়েকেই করতে হয়? এর উত্তর মায়ের কাছে নেই। মাঝে মাঝে মনে হয় আমার এই বন্ধি জীবনের জন্য মা দায়ী।

মায়ের দিকে তাকিয়ে বললাম, “_ একটা কথা বলব মা?

“বল মা” _ আমার হাত ধরে বলল মা।

“এই পরিবারে তোমার ভুমিকাটা কি জানো?”

মা চুপ হয়ে আছেন। আমি বলতে শুরু করলাম

“এই পরিবারে তুমি হচ্ছো একটা রোবট। যার কন্ট্রোলার বাবার হাতে। বাবার নির্দেশ মতো তুমি আমাকে আর ভাইয়াকে বানিয়েছ। এই ঘরে সবচেয়ে নিষ্ক্রিয় হচ্ছ তুমি”

প্রচন্ড কষ্ট হচ্ছিল কথা গুলো বলতে। হেটে বারান্দায় চলে এলাম। ভেতরটা মোচর দিয়ে উঠছে বারবার। কেনোই বা বললাম কথা গুলো? প্রচন্ড কান্না পাচ্ছে আমার

সকাল নয়টা । জাফর সাহেব এই সময়টাতে তার বারান্দায় বসেন। জাফর সাহেব তিথির বাবা। এক কথার মানুষ। এখন তিনি খোশ মেজাজেই আছেন। দিনের এই সময়টাতে তিনি খোশ মেজাজেই থাকেন। তার বারান্দায় একটা খাঁচা আছে। খাঁচায় একটা ময়না পাখি। এই ময়না পাখি কথা বলতে পারে। জাফর সাহেব যেদিন ময়না পাখির মুখ থেকে “বাবা” ডাক শুনেছেন সেইদিন কেঁদে ফেলেছিলেন। ময়না পাখি বাবা ডাকে না। তার পোষা পাখি ডেকেছে। জাফর সাহেবের দূটো ছেলে মেয়ে। ময়না পাখিটি থেকে বাবা ডাক শোনার পর তিনি মনে মনে তাকেও তার সন্তান মেনেছেন। জাফর সাহেবের এখন তিনটা সন্তান।

জাফর সাহেব নিজেকে সফল একজন বাবা ভাবেন। ভাবার কারন তার দুটো ছেলেমেয়েই তার কথা শুনে তাকে সম্মান করে। তার বড় ছেলে ইন্জেনিয়ারিং পড়ছে । তার কথাতেই সে পড়ছে। ছেলের ইচ্ছে ছিল ডাক্তার হওয়ার তবে জাফর সাহেবের কথার অবাধ্য হননি।

মেয়ে তিথিকে নিয়ে জাফর সাহেব কিছুটা চিন্তিত। মেয়ে মানুষ হলো ঘরের ইজ্জত। পড়া শেষে মেয়ে ঘরে থাকবে। বাহিরে ধেই ধেই করে ঘুরে বেড়ানো সভ্য মেয়ের কাজ না। জাফর সাহেব মেয়ে তিথিকে বেড়াতে যেতে দেননি। মেয়ে এত পড়াশোনা করানোতে তিনি পক্ষে না। তবুও মেয়ের জন্যই রাজি হয়েছেন। তাই বলে ধেই ধেই করে ঘোরার অনুমতিসকাল নয়টা । জাফর সাহেব এই সময়টাতে তার বারান্দায় বসেন। জাফর সাহেব তিথির বাবা। এক কথার মানুষ। এখন তিনি খোশ মেজাজেই আছেন। দিনের এই সময়টাতে তিনি খোশ মেজাজেই থাকেন। তার বারান্দায় একটা খাঁচা আছে। খাঁচায় একটা ময়না পাখি। এই ময়না পাখি কথা বলতে পারে। জাফর সাহেব যেদিন ময়না পাখির মুখ থেকে “বাবা” ডাক শুনেছেন সেইদিন কেঁদে ফেলেছিলেন। ময়না পাখি বাবা ডাকে না। তার পোষা পাখি ডেকেছে। জাফর সাহেবের দূটো ছেলে মেয়ে। ময়না পাখিটি থেকে বাবা ডাক শোনার পর তিনি মনে মনে তাকেও তার সন্তান মেনেছেন। জাফর সাহেবের এখন তিনটা সন্তান।

জাফর সাহেব নিজেকে সফল একজন বাবা ভাবেন। ভাবার কারন তার দুটো ছেলেমেয়েই তার কথা শুনে তাকে সম্মান করে। তার বড় ছেলে ইন্জেনিয়ারিং পড়ছে । তার কথাতেই সে পড়ছে। ছেলের ইচ্ছে ছিল ডাক্তার হওয়ার তবে জাফর সাহেবের কথার অবাধ্য হননি।

সকালে রুদ্রর ফোন পেয়ে ঘুম ভাঙ্গল। তাদের সাথে রুদ্র যায়নি। রুদ্র অসুস্থ্যতার কথা বলে না গেলেও আসল কারণ আমার ঠিকই জানা। রুদ্র আমার জন্যই যায়নি। এখন ফোন দিয়ে বলেছে ক্যাম্পাসে যেতে। যাওয়ার ইচ্ছে নেই আমার। দ্বিতীয়বার রিং হতে মোবাইল হাতে তুলে নিলাম। রুদ্রের ফোন। নাছড়বান্দা ছেলে

– হ্যালো

– তুই এখনো বাসায়?

– আমি কোথাও বের হচ্ছিনা রুদ্র

– ক্যাম্পাসের নাম দিয়ে বের হয়ে আস

– আমি আসছি না

– তুই না আসলে আমি এখানেই বসে থাকব

কথাটুকু বলে ঐপাশে লাইন কাটল রুদ্র। এপাশে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লাম আমি। দরজার দিকে তাকাতেই বাবাকে দেখতে পেলাম। আমার রুমের দিকেই আসছেন তিনি

জাফর সাহেব মেয়ের সামনে বসে আছেন। সন্তানকে লাইনে আনতে হলে মাঝে মাঝে শাসনের প্রয়োজন হয়। জাফর সাহেব মেয়েকে কড়া ভাষায় কিছু শোনাতেই এসেছেন।

বাবাকে দেখলে আমি বুঝে ফেলি তার মাথায় কি চলছে। ঘুরতে না গেলেও তার কথা শুনতে হবে। কোন কিছুর অনুমতি চাওয়াও এই ঘরের বড় ভুল

আমি বাবাকে চুপ থাকতে দেখে বললাম

– বাবা কিছু বলবে?

– হু

– বলো বাবা

– আমার মনে হচ্ছে টাকা খরচ করে পড়িয়ে আমি অসভ্যকে পালছি

বাবার এমন কথার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না মোটেও। ভিতরটা মোচর দিয়ে উঠল

– মেয়ে মানুষের ঘর হচ্ছে নিজের রুম। তাদের আনন্দ খুশি সব ফ্যামেলির মানুষ নিয়ে। বন্ধুবান্ধব নিয়ে ধেই ধেই করে ঘুরে বেড়ানোকে বেহায়াপনা বলে

– আমি যাইনি বাবা

– যাও নাই। যেতে চেয়েছ। তোমার থেকে এসব আমি আশা করিনা।

– একটু বেড়ুলে তাতে সম্মান যাই না বাবা। আমারও স্বাধীনতা বলতে কিছু আছে

– মুখে তর্ক আমার একদম পছন্দ না। তোমার মাকে দেখেছ? কত বছর সে আছে। সেও তো মেয়ে। সে স্বাধীনতা পায় নাই? এসব হচ্ছে শিক্ষা। তোমার শিক্ষা দিয়ে এসব ঢুকবে না।

বলেই হনহন করে উঠে গেলেন বাবা। আমার কেনো যেন কাঁদতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু বাসায় না। মাকে বেড় হবো বলে বলতে রান্না ঘরের দিকে পা বাড়ালাম।

রান্না ঘরের দরজায় দাড়িয়ে আছি। মা কপালের ঘাম মুসছেন। রান্না বসিয়েছেন চুলোয়। মাকে দেখে বুকের ভেতরটা হুহু করে উঠল। আচ্ছা আমার মতোই কি মায়ের জীবনটা?

– কিছু লাগবে তিথি? _ মা জানতে চায়লেন

আমি আর পারিনি। দৌড়ে গিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদলাম। মা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। মায়ের চোখেও পানি।

*

রিক্সার মাঝে বসে আছি। আমার পাশে রুদ্র। রুদ্রর এমন কান্ডের কারন আমি বুঝি। সে অনেক কিছু বলতে চায় আমাকে। আমি সুযোগ দেই না। যে পরিবারে নিশ্বাস নেওয়ার জন্য অনুমতি লাগে সেই পরিবারে এমন কথা ভাবাও পাপ

– তুই আসবি না বলে এলি কেন?

– তো এখন চলে যাবো? _ রেগে বললাম আমি।

রুদ্র কিছু না বলে হাসল শুধু

– তিথি, কিছু মানুষের জীবনে সুখ গুলো দেরি করে ধরা দেয়। এরা এক প্রকার দুঃখী আরেক দিক দিয়ে সুখী

– সুখী কোন দিক দিয়ে দেখলি তুই?

– সুখী কারন এদের কাজে সুখ এলে আর যেতে চায় না। তাই আসে ক্ষানিক দেরিতে

– তুই কোন ভাগে পরিস?

– আমি একজন দুঃখীর পাশে বসে সুখী হতে চাইছি

কথাটুকু বলেই হাসল রুদ্র। রুদ্রের এই কথার অর্থ বুঝেছি আমি।

– রুদ্র আমাকে ভালোবাসিস?

– সে তো পুরনো কথা

– ভুলে যা। কষ্ট ছাড়া দেওয়ার কিছু নেই আমার

– যেতে আসিনি। চাইলে সম্ভব। দরকার একটু সাহস। নিজের অধিকারের কথা বলার সাহস

– সম্ভব না।

বলে রিক্সা থামাতে বললাম আম। নেমে রাস্তার পাশ ঘেরে হাটছি। কাউকে কষ্ট দেওয়ার অধিকার নেই আমার। রুদ্রকে কাঁদাতে পারব না আমি।

বাসায় ঢুকে দেখলাম জনকয়েক লোক বসে আছে ড্রইং রুমে। আমাকে দেখে মা দৌড়ে এসে রুমে নিয়ে গেলেন।

– ওরা কারা? _ মাকে বললাম আমি। মা চুপ হয়ে আছেন।

– বলো মা

– তোর বাবার বন্ধুর পরিচিত কলিঙ্গের ছেলে। বাবা তোর জন্য ঠিক করেছে

– আমি বিয়ে করব না মা।

– তোর বাবা কিছুতেই মানবে না।

মায়ের কথায় পাথরের মতো জমে বসে আছি। আমার পড়ালেখার ইচ্ছেটুকুকেও মরতে দিতে চাইনা আমি। একটুপর বাবা এসে রুমে ঢুকলেন

– তৈরি হতে বলেছি। ছেলে পক্ষ অপেক্ষা করছে। আজকেই এঙ্গেজমেন্ট সেরে নিতে চাইছে।

– বাবা আমার পড়ালেখাটা আগে শেষ হওক? _ বাবার দিকে তাকিয়ে বললাম আমি

বাবা তাতে কর্ণপাত করলেন না। মাকে বলেই বের হয়ে গেলেন। আমি আমার শেষ ইচ্ছেটুকুকে মাটি চাপা দিয়ে মায়ের সাথে বের হয়ে এলাম।

ক্যাম্পাসে আজ শেষ দিন। ছেলে পক্ষ বাবার মতাদর্শেই বিশ্বাসী। মেয়েদের জন্য জায়গা হচ্ছে স্বামীর ঘর। স্বামীর সেভা। পান খেতে খেতে কালচে লাল ঠোঁট নিয়ে কথা গুলো বলেছে আমার হবুও শ্বশুর

আজ আমার সেগুলো ভাবার সময় নেই। এই একটা দিন নিজের জন্য বাঁচতে চাই আমি। অবাক হয়ে লক্ষ করলাম বন্ধুদের সবাই আমার সাথে খুব ভালো ভাবেই কথা বলছে। শুধু রুদ্র ছাড়া। এক কোণে বসে আছে সে

– কি রে চুপ হয়ে আছিস?

আমার কথায় নির্বাক হয়ে তাকায় রুদ্র। আমি চেহারায় হাসি ফোটায়। আকাশে ঘন কালো মেঘ জমেছে। হঠাত্‍ আমার আচরন দেখে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে নিশুরা। হাতে বৃষ্টির ফোটা পড়তেই ক্যাম্পাসের মাঠে গিয়ে দাড়ালাম। ঝুমঝুমিয়ে বৃষ্টি পরছে। আমি সেই বৃষ্টিতে দু হাত উচু করে ভিজছি।

আমার পাশে কখন রফি , সুমিত , নিশু , মিথিলারা এসে দাড়িয়েছে খেয়াল করিনি। বৃষ্টির মাঝে আমার কান্নার শব্দ তাদের চোখ এরিয়ে যায়নি। হঠাত্‍ লক্ষ করলাম আমার কান্না দেখে নিশু আর মিথিলাও কাঁদছে। আজ আমার বিয়ে। আমার হাসার কথা। আমি কাঁদছি কেন??

সকালে ঘুম থেকেই উঠে আয়নার সামনে বসেছিলাম অনেকক্ষণ। তারপর বাবার রুমের দিকে পা বাড়ালাম। এসময়টায় বারান্দায় থাকেন তিনি

যা ভেবেছি তাই হলো। বাবা তার আদরের সন্তান ময়না পাখিটাকে খাওয়াচ্ছে। বাবার ধারনা তার এই সন্তানটাই তার সবচেয়ে প্রিয়। তার কথা মানে

আমাকে দেখে বাবা ডাকলেন। চেহারায় হাসি নিয়ে বাবার পাশে বসলাম। আজ বাবাকে কিছু কথা বলার আছে। বাহিরে বিয়ের আয়োজন চলছে। তবুও কথা গুলো বলতে হবে বাবাকে। সিরিয়াস কথা গুলো গুছিয়ে বলতে হয়। আমি একটা বড় নিশ্বাস নিলাম।

_ কিছু বলবি মা? _ বাবা জানতে চাইলেন

– ময়না পাখিটা কি তোমার খুব প্রিয় বাবা?

– হ্যা, ও তো আমার সন্তান।

– তোমার সন্তানটা মাঝে মাঝে ডানা ঝাপ্টায়। কেনো জানো বাবা?

আমার কথা শুনে বাবা তাকালেন। আমি বলতে শুরু করলাম

– তাকে কখনো চোখে বিষাদ নিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখেছ বাবা?

বাবা চুপ তাকিয়ে আছেন এক দৃষ্টিতে। কিছু বলছেন না।

– আমি দেখেছি বাবা। তার খুব উড়তে ইচ্ছে হয় ঐ আকাশটায় অন্য পাখি গুলোকে দেখে। উড়তে পারছে না কেনো জানো? কারন সে তোমার শেকলে বন্ধি। নিজের সন্তানকে বন্দী রেখেছ কেন বাবা? তাকে সন্তান বলার অধিকার তোমার আছে?

বাবা দাড়ানো থেকে হঠাত্‍ বসে পড়লেন।

– বাবা ভাইয়া আমার বিয়েতেও বাসায় আসেনি। সে তোমার স্বপ্ন পূরণ করতে গিয়ে নিজেরটাকে হত্যা করেছে। সে কষ্টটা বাবা হয়ে দেখছ তুমি?

– বাবা আমাদের না পারো। পাখিটাকে উড়ার স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করো না। সে তোমাকে বাবা ডেকেছে।

বলেই বের হয়ে এলাম বাবার রুম থেকে। মা আমাকে নিয়ে রুমে গেলেন। আজ দুপুরে বিয়ে আমার। আমার কান্না পাচ্ছে না। বাবাকে বলার পর শান্তি লাগছে ভেতর থেকে।

*

জাফর সাহেব ময়না পাখির খাঁচার দিকে তাকালেন একবার। ডানা ঝাপ্টা দিলো পাখিটি কয়েকবার।

[] আশরাফ মামুন []

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s