হায়রে, মানবজনম!

Post ID # 027

বসুন্ধরা সিটির সাত তলায় কেনাকাটা করছি।
এক সিকিউরিটি গার্ডকে চোখে পড়লো। কম দামি মোবাইল ফোনের ক্যামেরায় শপিং মলের ভিডিও করছে। চলন্ত সিঁড়ি, গম্বুজাকৃতির ছাদ, বাদ যাচ্ছে না আলো ঝলমলে বাতিও । পুরো উপমহাদেশজুড়ে যে হারে জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটছে তাতে চোখের সামনে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ভিডিও হতে দেখলে বুকের ভেতর ছ্যাৎ করে ওঠে!
পেশায় সাংবাদিক তাই কৌতুহলও বেশি। লোকটার কাছে গিয়ে জানতে চাইলাম, ঘটনা কী ভাই?
লোকটা চমকে উঠে আমার দিকে তাকালো। বয়স ত্রিশের কোটা পেরোয়নি মনে হয়। চোখেমুখে অবাক এক সারল্য। কাচুমাচু ভঙিতে লোকটা বললো, ভিডিও করতেছি স্যার!
আমি বললাম, তাতো দেখতেই পাচ্ছি। কিন্তু কেন ভিডিও করছেন?
লোকটা এই কথার কোন জবাব দিলো না অথবা দিতে চাইলো না। মাথা নিচু করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো। ভঙিটা এমন যেন বড় কোন অপরাধ করেছে। এবার আমার একটু খারাপই লাগলো। স্মার্ট ফোনের এই যুগে যে কেউ যে কোন কিছুই দেদারসে ক্যামেরাবন্দী করছে। কেউ তো বাধা দিচ্ছে না। সমাজের নিচু স্তরের বলেই কী আমি তার ব্যাপারে বাধা দিচ্ছি? উচু স্তরের কেউ হলে কী আমার এই কৌতুহল হতো?
এইসব ভাবনা পাশ কাটিয়ে আমি লোকটার নাম জানতে চাইলাম। বললো, আশরাফ।
পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে আমি হেসে দিয়ে বললাম, ঘাবড়ানোর কিছু নাই। এমনিতেই জানতে চাইলাম। বাড়ি কই, এখানে কী করেন?
আশরাফ বললেন, আমাগের বাড়ি যশোর। এইখানে এটিএম বুথের সিকিউরিটি গার্ডের চাকরি করি।
‘ঠিকাছে ভিডিও করেন’ বলে আর কথা বাড়ালাম না। চলে যেতে উদ্যত হতেই আশরাফ নিজ থেকেই বলতে শুরু করলেন, আসলে স্যার, আগে আমার কোন ক্যামেরা মোবাইল আছিল না। এই মোবাইল নতুন কিনছি।
আমি বললাম, বুঝতে পারছি, এজন্যই যা দেখছেন তাই ভিডিও করছেন। আমি যেবার প্রথম দামি ফোন কিনেছিলাম, আমিও করেছি। অসুবিধা নাই আশরাফ, আপনি আপনার কাজ করেন।
আশরাফ লজ্জায় লাল হয়ে গিয়ে বললেন, না না স্যার। সেই কারণে না। ভিডিও করার অন্য কারণ আছে।
আমি এবার থমকে দাঁড়ালাম। বললাম, অন্য কী কারন?
আশরাফ বাধো বাধো গলায় বললেন, আমি আসলে নতুন বিয়া করছি। বউ থাকে গিরামে। সে শুনছে বড় মার্কেটে চাকরি করি। শুনছে, এই মার্কেটের সিঁড়ির উপর দাঁড়াইলে আপনা-আপনিই মানুষ উপরের দিকে উইঠা যায়। হাটা লাগে না। সে তাজ্জাব হয়া গেছে। আমার বউ কোনদিন এতো বড় মার্কেট দ্যাখে নাই। তাই আমারে বলছে, আমি যেন সব কিছু ভিডিও কইরা নিয়া আসি। সে বইসা বইসা সব দেখবে। তাই আমি ভিডিও করতেছি স্যার। আমার তো তেমন টাকা পয়সা নাই। টাকা পয়সা হইলে একদিন স্বশরীরে তারে এইখানে নিয়া আসার ইচ্ছা আছে!
আশরাফের এই গল্প শুনে আমি কোন কথা বলতে পারলাম না। ভালোলাগার একটা শীতল স্রোত কেবল বয়ে গেল বুকের গহীনে। মনটা ভরে গেল অপার এক মুগ্ধতায়। আমি মুগদ্ধতা নিয়ে তাকিয়ে রইলাম লজ্জাবনত আশরাফের দিকে…!
আমাদের আশে-পাশে মুগ্ধ হবার এমন কতো-শতো ভালোবাসার গল্প আছে, কত যে মমতার গল্প আছে, ইতিবাচক জীবনের গল্প আছে- আমরা তার খোঁজ রাখি না। বিপুল কৌতুহলে আমরা খোঁজ রাখি, চারিধারের ভালোবাসাহীন, মমতাহীন কুৎসিত সব গল্পের। প্রবল আগ্রহে জীবন সমুদ্র থেকে আমরা বেছে বেছে কেবল তুলে আনি, অসীম বেদনা আর কষ্টমাখা হাহাকার। অথচ যত্নে গাথা ঝিনুকের মালা থেকে যায় আমাদের চোখের আড়ালে! হায়রে, মানবজনম!
from Abdullah Al Imran

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s