ছেলেগুলো

Post ID # 018

আমি মাঝে মাঝে আমার আশ পাশের ছেলেগুলোকে দেখে খুব কষ্ট পাই। তাদের কথা একটু মন দিয়ে ভাবলেই কেমন মন খারাপ হয়ে যায়। এই জগতে ছেলেরা না থাকলে আমাদের কিন্তু খবরই ছিল। হঠাৎ করে ছেলেদের প্রতি এত আবেগ উথলে উঠার কারন ব্যাখ্যা করি। আসলে প্রায়ই উঠে। বলা হয়ে উঠেনা। চারপাশে যে হারে মেয়েদের জন্যে সিমপ্যাথি উড়ে বেড়ায় বা মেয়েদের ত্যাগের মহিমা নিয়ে লেখালেখি হয়, সেভাবে আমরা কখনোই ছেলেদের উদারতার কথা লিখিনা। তাদের জীবন যুদ্ধের খোঁজ আমরা খুব কম ই রাখি। তাই আজ শুধু ছেলেদের ত্যাগের গল্প বলবো। সত্যিকারের গল্প।
.
একটা পরিবারে পিঠেপিঠি দুই ভাই বোন বড় হয় একেবারেই দুই রকমের ভাবনা নিয়ে। অস্বীকার করার উপায় নেই। ছেকেটাকে বড় হয়ে একজন সাকসেসফুল মানুষ হতে হবে। সাকসেসফুল বলতে আমরা বুঝাই ভাল পড়াশুনা, ভাল রেজাল্ট, ভাল জব বা বিজনেজ, সর্বোপরি ভাল ইনকাম।
ছোট বোনটার ধুমধাম করে বিয়ে দিতে হবে। বাবা মার সমস্ত খরচের দায়িত্ব নিতে হবে, নিজের ছেলেটার জন্যে ভবিষ্যৎ গড়ে দিতে হবে, থাকার জন্যে একটা বাড়ি করতে হবে। বিয়ের পরে বোনটার কোন বিপদ হলে পাশে দাঁড়াতে হবে, বউ এর বাবা মা সহ ছোট ভাই বোন থাকলে তাদের দায়িত্ব ও কিন্তু কম বর্তায় না। এমন হাজারো লিখিত অলিখিত দায়িত্ব কাঁধে নেয়ার প্রস্তুতি নিয়েই একটা ছেলেকে বড় হতে হয়। একজন সুস্থ সয়ংসম্পূর্ন মানুষের যেই দায়িত্ব একজন কানা খোঁড়া ছেলের ও একটা সংসারে একই দায়িত্ব থাকে। কারন তাদের সংসারের মাথা বলা হয়। বট বৃক্ষ বলা হয়।
এর মাঝে আমরা খোঁজ রাখি সেই ছেলেটার যে পাড়ার মোড়ে দাঁড়িয়ে হিসেব রাখে, কোন মেয়ের জামার গলা কত বড়। কোন মেয়েকে দেখে ছেলেটা সিটি বাজালো বা কোন ছেলেটা নেশা করে বিপথে গেল।
.
আমরা কেউ সেই ছেলেটার খোঁজ হয়ত রাখিনা, যে ছেলেটা বন্ধুদের আড্ডায় চায়ের বিল দেয়ার ভয়ে আড্ডায় না গিয়ে আর একটা নতুন টিউশনি নিয়েছে। যেন পরের মাসে মায়ের হাতে কিছু টাকা তুলে দিতে পারে। আমরা সেই ছেলেটার খবর রাখিনা, যে নিজের পড়াশুনার খরচ নিজে চালাতে সন্ধ্যার পর মুখ ঢেকে নিজের এলাকার বাইরে এসে রিকশা চালায়, বা শখের গিটার টা বিক্রি করে বাবার ঔষুধ কিনে, বা প্রতিমাসে মাত্র সাতশো টাকা আয় করে নিজের প্রাইভেট খরচ দেয় ছয়শ টাকা আর একশ টাকা রাখে সারা মাসের হাত খরচের জন্যে। আমরা সেই ছেলেটার খবর ও কখনো রাখিনা, যে পারিবারিক দৈন্যতা দেখে পড়ার খরচ চালাতে না পেরে বুয়েটে চান্স পেয়েও ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার স্বপ্ন কে ছুঁতে পারেনি।
.
মুহিন, বয়স ৩৬। এখনো বিয়ে করেনি। বাবাকে দেখেছে অল্প বয়সে ক্লান্ত পরিশ্রান্ত চেহারায় ঘরে ফিরতে। মেয়েটার ভাল একটা বিয়ে দেয়ার চিন্তায় রাতের পর রাত জেগে কাটাতে। অল্প কিছু হলেও বাড়তি আয়ের জন্যে দিনের পর দিন ওভার টাইম করে অসুস্ত হয়ে অনেক দিন বিছানায় পড়ে থেকে বাবাটা চোখের সামনে মারা গেল। মুহিন কিছুই করতে পারেনি। পারেনি ভাল চিকিৎসা দিয়ে বাবাকে সুস্থ করার চেষ্টা করতে।
.
আশফাক, ঢাকা ভার্সিটি থেকে চারুকলায় পড়াশুনা করে সেরকম সুবিধা করতে পারছিল না বলে আঁকা আঁকি ছেড়ে দিয়ে এখন সে হোটেল বিজনেজ করে। সংসার এর হাল তো ধরতে হবে।
.
জামান। বিরাট বড় লোকের ছেলে। ঘুষের টাকায় বাপ দালানের পর দালান তুলছে। সব থেকে দামী গাড়ি জন্মদিনে গিফট পায়। বাবার পাপের প্রতিবাদ করতে একদিন ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসে। তারপর বুঝতে পারে জীবন যুদ্ধ আসলে কি? ভালবেসে এক মেয়েকে বিয়ে করে, টানাটানির সংসার বেশিদিন টেকেনি। বউটা ওকে ছেড়ে চলে যায়। জামান বুঝতে পারেনা বেঁচে থাকার জন্যে আসলে কি প্রয়োজন? সততা নাকি টাকা??
.
আমরা মেয়েরা কত ভাগ্য নিয়ে এই পৃথিবীতে এসেছি! আমাদের খবর রাখতে হয়না আমাদের বাবারা সকাল ছয়টা থেকে রাত এগারটা পর্যন্ত বাইরে কি করে? অফিসে তাদের অন্যের কথা শুনে মাস শেষে সেলারী গুনতে হচ্ছে কিনা। আমাদের খোঁজ রাখতে হয়না, সামনের মাসের ছেলের সেমিস্টার ফাইনালের পঞ্চাশ হাজার টাকা স্বামী কোথা থেকে যোগাড় করে আনলো? রুপাকে কখনো বুঝতে হয়না ওর শখের চাকরী টা সংসারে কতটা প্রয়োজনীয় ভুমিকা রাখতে পারে! নিশিকে কখনো বুঝতে হয়না, মারুফের একার ইনকামে সংসার চালাতে মারুফ সামনের মাসে অফিসের পরে ও একটা পার্ট টাইম জব করবে।
.
বউ মা শখ করেছে সামনের মাসে সমুদ্র দেখতে যাবে। ওরা জানেনা, রিপন বসের পেছন পেছন ঘুরেও এখনো লোনটা নিতে পারেনি। রিপনের ছোট ভাইটা পড়াশুনা শেষ করে একটা চাকরি যোগাড় করতে না পেরে লজ্জায় কারোর সামনে আসেনা। বড় ভাই এর একার রোজগারে বাসায় খেতেও তার লজ্জা করে।
.
কি অদ্ভুত সব গ্লানী !! কি কঠিন জীবন যুদ্ধ আমাদের বাবা ভাইয়াদের, স্বামীদের !! নিজেকে ওদের জায়গায় ভাবলে কেঁপে উঠি। আল্লাহ কতটা মনোবল দিয়ে ছেলেদের এই পৃথিবীতে পাঠিয়েছে !! কতটা নির্ভরতায়, ভালোবাসায় ওরা আমাদের আগলে রাখে !! কতটা মনের জোর থাকলে এত কষ্ট করেও হাসি মুখে শুনে যায় বাবা, মা, ভাই, বোন, বউ, বাচ্চার অনেক কিছু না পাওয়ার আক্ষেপের খোঁটা। কতটা উদার হলে কখনো হিসেব করতে বসে না ইনকামের একটা পয়সাও তো নিজের জন্যে জমানো হয়না !! অনেক দিন নিজের জন্যে একটা ভাল শার্ট কেনা হয়না, অফিসের চটি জোড়াও পুরনো হয়ে গেছে! হাতের ঘড়িটা সেই কবে বউ গিফট করেছিল! মাঝে দুইবার ব্যাটারি চেঞ্জ করতে হয়েছে।
.
আশেপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে এমন হাজারো গল্প। মন খারাপ করা জীবনের এক এক টা পরিচ্ছেদ।
ছেলেরা, আপনাদের আন্তরিক ধন্যবাদ এবং কৃতজ্ঞতা।

লিখা: লিমা কবির

টিউশনি মানেই বিনোদন

Post ID # 015

টিউশনি মানেই বিনোদন। স্টুডেন্টের বাবা মা মানেই বিনোদনের বাক্স। এরা ছোটলোক থেকে ছোটলোক হতে পারে। বিশেষ করে যারা নব্য “বড়লোক” এরাই সবচেয়ে ছোটলোক!
.
কয়েকদিন আগে এক ছোটভাই ফোন দিয়ে টাকা ধার চাইলো, “ভাইয়া, এ মাসে টিউশনি থেকে টাকা পাই নি, কিছু টাকা ধার দিতে হবে”

বললাম, “টাকা দেয়নি কেন?”

–স্টুডেন্টের বাবা তো হজ্জে চলে গেছে।
স্টুডেন্টের মা বললেন হজ্জ থেকে আসলে দিবেন

— ওহ, আচ্ছা, তা বাসার এরা কি না খেয়ে আছে? তিন হাজার টাকা
রেখে যায় নি?

— ভাই, কি করবো, বলেন। কালই এরা শপিংয়ে গেসিলো।স্টুডেন্ট সাত হাজার টাকা দিয়ে একটা ড্রেস কিনছে। সেটা
আবার আজকে আমাকে দেখাইলো!

….. (কিচ্ছু বলার নাই। মনে পড়লো কয়েক বছর আগের একটা ঘটনা।)
.
এক ফ্রেন্ড ইংলিশ অনার্সে পড়তো সেকেন্ড ইয়ারে। খুব উৎসাহ উদ্দীপনা নিয়ে টিউশনিতে জয়েন করতে গেছে। ঠিক ততটা মন খারাপ করে বাসায় আসছে। জিজ্ঞেস
করলাম, ঘটনা কি? সে যা বর্ণনা করলো, তাতে হাসবো না কাঁদবো নাকি উঠে দৌড় দিবো কিছুই বুঝতে পারছিলাম না।

….. স্টুডেন্টের বাবা বলতেসে আড়াই হাজার টাকা দিবে।

(তিনতলা নিজস্ব বাসায় থাকে। বাসায় এসি আছে)
এইটুকুও ঠিক ছিল।

স্টুডেন্টের বাবা জিজ্ঞেস করলো,

–তোমার এসএসসি ইন্টারে রেজাল্ট কি?

— জি, এসএসসিতে এ+, ইন্টারে 4.50

— ও, এ+ পাও নাই? তুমি কোন ইয়ারে?

— জি, এই তো সেকেন্ড ইয়ারে উঠছি।

— ও, তাহলে তো তুমি অনেক জুনিয়র! IELTS বা ইংলিশ কোন কোর্স করা আছে?

— জি,না আংকেল, আমি পড়াইতে পারবো না,আসি!

( রাগ করে চলে আসলো)

………..স্টুডেন্ট কোন ক্লাসের ছিল জানেন? স্ট্যান্ডার্ড ফোর!
..
সবচেয়ে বড় বিনোদন পেলাম আজ। কিছুক্ষণ আগে আমার কাজিন এসে হাসতে হাসতে হাসতে বলতেছে,
ভাই, আমার স্টুডেন্টের দাঁত অনেক শক্ত!

— হোয়াট??
.
— প্রায় দুইমাস হলো পড়াচ্ছি। পড়ানোর প্রথম দিন হতেই লক্ষ্য করছিলাম,পর্দার ওইপাশে দুইটা পা দেখা যায়। মানে
হলো, স্টুডেন্টের মা ওইপাশে দাঁড়াইয়া পাহারা দেন!
.
— তারপর?
.
— আজকে ছাত্রীকে বললাম, ক্যালকুলেটর নিয়ে আসো। আর সে যেই না দৌড় দিলো, পর্দার ওই পাশে তার মায়ের সাথে সংঘর্ষ! ছাত্রীর দাঁত লেগে তার মায়ের কপাল থেকে রক্ত বের হয়ে গেছে।
.
.
— কাউসার আলম

‘আন্ধাগলি’

Post ID # 013

আমাদের এলাকায় গলি আছে অনেক পুরানো। ওদিকটা কেউ মাড়ায় না। কথিত আছে, যে একবার ওই চিপা গলিতে ঢুকে, সে আর জীবিত বের হতে পারে না। লাশটাও নাকি খুজে পাওয়া যায় না। স্রেফ উধাও। মরতে কে চায়? তাই এমনকি এলাকার বখাটেরাও তাস-মদ-গাঁজার আসর হিসেবে ওই জায়গাটাকে গ্রহন করে না। গলিটার একটা নামও আছে। লোকে বলে ‘আন্ধাগলি’। দিন কি রাত, সব সময় গাঢ় অন্ধকারে ডুবে থাকে ওই গলিটা। যুগের পর যুগ এসেছে। আশেপাশে ঢাউস সাইজের সব বিল্ডিং গজিয়েছে। কিন্তু আন্ধাগলির ব্যাপারে কেউ নাক গলায় নি। তাই আজ অবদি অক্ষত মরালাশের মত দাড়িয়ে আছে আন্ধাগলি। জন্মের পর থেকে আমার জীবনের অনেকগুলো লক্ষ্যের মধ্যে একটি ছিল আন্ধাগলিতে হানা দেয়া। অবশ্য ৪-৫ বার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছি। ফিরে এসেছি গলির সম্মুখ থেকে। অতটা সাহস হয় নি কখনও।
.
কয়েকদিন আগে এলাকায় এক নতুন বখাটের আগমন ঘটে। অল্পদিনে উড়ে এসে জুড়ে বসার ক্ষমতা আছে তার। আমরা ডাকি সুজন ভাই বলে। সুজন ভাই নিজেকে উঠতি মাস্তানা দাবি করেন। এলাকার মেয়েদের উত্যাক্ত করেন। দিনে রাতে গাঁজা সেবন করেন। এভাবেই তার দিনকাল চলছিল। পরিচিতির তুঙ্গে ছিল সে। এলাকার বড় ভাইরাও সমীহের দৃষ্টিতে দেখতো তাকে। একদিন হঠাৎ সে উধাও হয়ে যায়। সারা এলাকা তন্নতন্ন করে খোঁজার পর মুরব্বীদের নির্দেশে আমরা কয়েকজন সাহসী তরুন ভয়ে ভয়ে আন্ধাগলিতে একবার খুঁজে দেখার জন্য এগিয়ে যাই। তখন ছিল সন্ধ্যা সাতটা। সূর্যের রক্তিম আলোয় আর রাস্তার সোডিয়াম আলোর মিশেলে অদ্ভুত রঙ ধারন করে আন্ধাগলির চারপাশের পরিবেশ। আমার হাতে টর্চ ছিলো। কেউ এগুচ্ছে না দেখে আমি টর্চ নিয়ে এগিয়ে গেলাম। যা হয় হবে। ভূত টুথ থাকলে টর্চের বাড়িতে কুপোকাত করবো, কুছ পারওয়া নেহি। ভিতরে ঢুকলাম এবং ঢুকেই চক্ষু ছানাবড়া। প্রথমে তো আঁতকেই উঠেছিলাম। আমার চিৎকার শুনে দলের বাকিরা যথেষ্ট দুরত্বের দিকে মাগো বাবাগো বলে ছুট দিলো। সুজন ভাইয়ের লাশ বসে আছে আন্ধাগলির শেষ মাথায়। লাশ কি বসে থাকতে পারে! না পারে না। ভয়ের সাথে কৌতুহলের যুদ্ধ বাধলো। কৌতুহলে জয় হল। এগিয়ে গেলাম শেষ মাথায়। আবিষ্কার করলাম, উনি বেঁচে আছেন। ডাক দিলাম,

-ভাই?

-কে?

-আমি।

-কি এখানে? যা ভাগ!
.
আমি ছুট দিলাম। পরবর্তীতে প্রায়ই উনাকে ঘন্টার পর ঘন্টা আন্ধাগলিতে পাওয়া যেতো। মাঝে মধ্যে বেরিয়ে আসতো, তবে কেউ ভয়ে কথা বলতো না। আন্ধাগলির ভয় এলাকাবাসীর মন থেকে উবে গেলো। তবে নতুন এক কুসংস্কারের জন্ম হতেও সময় লাগল না। মানুষের ধারনা, সুজন ভাইকে জ্বীনে পাইসে। কয়েকদিন পর আবার নতুন কথা চালু হল। লোকে বলাবলি করতে লাগলো, সুজন ভাই হয়তো “আধ্যাত্মিক বাবা” টাইপের কিছু একটা। বাংলার মাটিতে অনেক বাবার জন্ম হয়েছে। যেমন, বিড়ি বাবা, ময়লা বাবা, হেন বাবা, তেন বাবা। সুজন ভাইয়ের নাম হয়ে গেলো মোবাইল বাবা। অনেকেই নাকি সুজন ভাইকে আন্ধাগলিতে বসে মোবাইল টিপতে দেখেছে। শুরু হল মোবাইল বাবার আরাধনা। এলাকয় যখনই কারো কোনো সমস্যা হত, তখনি সেই ব্যাক্তি মোবাইল বাবার গর্ত, অর্থাৎ আন্ধাগলির সামনে এসে বসে থাকতো।
.
এভাবে বেশ কয়েকদিন কাটার পর একদিন মোবাইল বাবা অর্থাৎ সুজন ভাইকে এলাকার টং য়ে চা সিগারের খেতে দেখা গেলো। কেউ ভয়ে কথা বলে না, কিন্তু ভয় আর সম্মানের দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে। উনি কিছুটা বিরক্ত বোধ করলেন। তবে এরপর থেকে তাকে আর আন্ধাগলিতে পাওয়া গেল না। তিনি এখন বেশ সুস্থ ও স্বাভাবিক। তবুও লোকজনের ভয় কাটে না। আমি ভাবলাম সাহস করে ২-১ টা কথা জিজ্ঞেস করি। যো ভি হোগা, দেখা যায়েগা। একদিন ভয়ে ভয়ে তাকে শুধালাম,

-সুজন ভাই?

-বলে ফেল কি বলবি।

-আপনে ওই আন্ধাগলিতে দিনের পর তিন কিসের ধ্যানে মগ্ন ছিলেন? প্রেত আত্মা টাইপের কিছু? নাকি সরাসরি সৃষ্টিকর্তার সাথে আপনার যোগাযোগ?

-মানে? (কন্ঠ যথেষ্ট হতভম্ব)

-ওই গলিতে কাম কাজ রাইখা কি করতেন? এখনই বা আর যান না কেন? সৃষ্টিকর্তা কি লাইন কাইটা দিসে?

-আরে কি কস না কস? গাঁজা ধরসস নাকি?

-কি করতেন ওখানে?

-আরে কইস না। একদিন ঢুকসিলাম ওই জায়গায়। দেখি ওয়াইফাই নেটওয়ার্ক পাওয়া যাইতেসে। পাসওয়ার্ডও দেয়া নাই। আসারে আর পায় কে! সারাদিন ডাউনলোড দিলাম। ক্ল্যাস অব ক্ল্যান খেল্লাম। এরপর থেকে চিন্তা করলাম, ট্যাকা খরচ করার কি দরকার? ওইখানে গিয়া ক্ল্যাশ অব ক্ল্যান খেললেই পারি! যেই ভাবা সরই কাজ। ডেইলি যাওয়া শুরু করলাম। নেশা লাইগা গেলো। একদিন হঠাৎ দেখি ওয়াইফাইতে পাসওয়ার্ড মাইরা দিসে বা**তের বাচ্চায়। কোন বা**ত এটা, একবার যদি পাইতাম!!!
.
আমি উনার দিকে হা করিয়া চাহিয়া রইলাম। একটি মাছি আমার মুখের ভেতর গমন করিলো।

—Abdullah Al Mehraj

বুয়েট থেকে পাশ করে…

Post ID # 011

বুয়েট থেকে পাশ করে কিছু কারনে আমার দেশে থাকতে হলো। আমার মা বাবা কে ছেড়ে যাওয়া টা সম্ভব ছিলো না ওই সময়। অনেকে হায়ার স্টাডিজ এর জন্য বিদেশ চলে গেলো। আবার আমরা বন্ধু রা কেউ কেউ বাংলাদেশে রয়ে গেলাম। আমি পাশ করার সাথে সাথেই একটা চাকরী পেয়ে গেলাম। যদি ও ঢাকার বাইরে। আমার যথেষ্ট আপত্তি থাকা সত্ত্বেও বাবা একপ্রকার জোর করেই পাঠালেন। বাবা একটা কথা ই বল্লেন, মিল কারখানায় কিছু দিন কাটিয়ে আসো, অনেক এক্সপেরিয়েন্স হবে। মানুষ ঠেকে শেখে, তুমি ও ঠেকে শিখবা। বাবার আদেশ শিরোধার্য, চলে গেলাম টাঙ্গাইলের এক স্পিনিং মিলে।

প্রথম প্রথম আমার কান্না চলে আসতো। অসহ্য কষ্ট। প্রচন্ড গরমে টানা আট ঘন্টা ডিউটি। তাও আবার শিফটের চাকুরী। নাইট শিফট মানে রাত ১০ টা থেকে ভোর ৬ টা। আমি ছিলাম প্রোডাকশন ইঞ্জিনিয়ার। স্পিনিং মিলে তুলা থেকে ইয়ার্ন তৈরী হয়। এর প্রোসেস বেশ লম্বা। আমি ছিলাম রিং স্পিনিং সেকশনে। সবচেয়ে যন্ত্রণাময় সেকশন। আকাশে বাতাসে তুলার আশ উড়ছে। নাক মুখ বন্ধ হয়ে আসে। আর কাজ ছিলো শ্রমিক দের সাথে। তাও আবার আমার সেকশনে ৪৫ জন শ্রমিক। এর মধ্যে বেশীর ভাগই মেয়ে। সবচেয়ে যন্ত্রণা ছিলো এদের ঝাড়ি মারা যেতো না। বকা দিলে ই ঘাড়ত্যাড়া করে গ্যাট ধরে থাকবে। আর যেহেতু কন্টিনিউয়াস প্রসেস, কাজে একটু ঢিলা দিলে পুরা প্রসেসে বারোটা বেজে যায়। আমি কূল কিনারা না পেয়ে চোখে অন্ধকার দেখা শুরু করলাম। আমার দুঃস্বপ্ন ছিলো রিং স্পিনিং সেকশনের মহিলা শ্রমিক গুলা। মাঝে মাঝে সিনিয়র কলিগ দের সাথে কথা বলতাম। উনারা বিভিন্ন টিপস দিতেন। প্রথমত টেক্সটাইল মিলের শ্রমিক রা বান্দরের মতো। বেশী আস্কারা দিলে মাথায় উঠে উকুন বাছা শুরু করবে, উকুন না পেলে চুল টেনে ছিড়বে। সো আস্কারা দেয়া যাবে না। দ্বিতীয়ত এরা জন্মই হইসে কথা না শুনার জন্য। এদের শায়েস্তার উপায় একটা ই। কাজ থেকে বের করে দুই তিন দিন ঘুরানো। মিল কারখানায় এল,ডব্লিউ,পি নামক শাস্তি আছে। যার মানে লিভ উইথআআউট পে। সহজ বাংলায় ছুটি নিয়া বাতাস খা, বেতন পাবি না। এই পদ্ধতি তে এরা ঘায়েল।

আমি চালু করলাম এই পদ্ধতি, ম্যাজিকের মতো কাজ হলো। মাস দুয়েক পর আমার জব ভালো লাগা শুরু করলো। এদের সাথে দা-কুমড়া সম্পর্কের অবসান ঘটলো। আমি একটা জিনিস বের করলাম, এদের আই,ডি নাম্বার ধরে না ডেকে নাম ধরে ডাকলে খুব সন্মানিত বোধ করে। আমি ধীরে ধীরে ৪৫ জনের নাম মুখস্ত করে ফেল্লাম। আসমা, জমিরন, রাহেলা, হনুফা, তসলিমা, ঝর্না, শিরিন, লাভলী… এক সময় এদের সাথে গল্প করে এমন এক অবস্থা হলো, আমি কোনো অর্ডার দিলে এরা এক সাথে তিন জন ছুটে আসে, কে কাজ টা করবে। এক দিন আমার শিফটে প্রোডাকশন টার্গেট ছিলো ৭ টন। মোটামুটি অনেক বেশী। টার্গেট ফিল আপ না হলে ঝামেলা লেগে যাবে। কারন কাল এম,ডি নিজে প্রোডাকশনের সাথে মিটিং এ বসবে। আমি নতুন মানুষ, এই অবস্থায় আমি যদি টার্গেট অ্যাচিভ করতে না পারি, আমার ব্যাপারে সবাই প্রশ্ন তুলবে। আর টেক্সটাইল মিল মানে ই অনেক রকম পলিটিক্স, যাতে বলি হয় আমার মতো নতুন ইঞ্জিনিয়ার গুলো।

সেই দিন টা আমার মনে আছে। প্রচন্ড বৃষ্টি ছিলো। এর উপর নাইট শিফট। আমি ফ্লোরে গিয়ে দেখি আগের শিফট অনেক কাজ বাকী রেখে চলে গেছে। আর আমার শিফটে ৪৫ জনের যায়গায় ৩২ জন ওয়ার্কার এসেছে। আমার হাত পা অসাড়। বৃষ্টির কারনে অনেক ওয়ার্কার আসে নাই, এই ব্যাপারে কিছু বলার নাই। আমি আগের শিফটের বাকী কাজ শেষ করতেই ১ ঘন্টা খেয়ে ফেল্লাম। এরপর ডাক দিলাম আসমা কে। অনেক করুণ কন্ঠে বল্লাম, “আজ সাত টন প্রোডাকশন দিতে হবে। এমন এক দিনে তোমাদের অনুরোধ করলাম, যেই দিনে লোক নাই, সময় ও নাই। কাজ না করতে পারলে তোমাদের কোনো সমস্য নাই, কারন কাজ টা এই কয় জন মিলে করা সম্ভব না আমি জানি। শুধু মনে কইরো, আজ ৩২ না, ৩৩ জন ওয়ার্কার, আমি সহ।”

আমার কথা শুনে আসমা বল্লো, “স্যার, আইজ সাড়ে সাত টন নামামু, আপনে আমাগোর উপ্রে ছাইড়া দেন, এক এক জন দুই টা কইরা লাইন দেখুম। (সাধারনত এক ওয়ার্কার এক লাইন করে দেখে, মোট ছিলো ৪০ লাইন)

সেই রাতে আমি ও নিজের হাতে ববিনের ট্রলি ঠেলেছি। নিজের হাতে রোভিং (ইয়ার্ন যা থেকে তৈরী হয়) লোড করেছি। আর আমার সেই ৩২ জন ওয়ার্কার? মাঝে টিফিন ব্রেকে ওরা খেতেও যায় নি কেউ! ভোর পাচ টা চল্লিশে আমাদের পৌনে আট টন সুতা রেডী।

আমি বাক্য হারা। হনুফা আমাকে বলে, “স্যার আপনের অসন্মান হইবো, এই টা কহনো হইবো না।”

আমার চাকুরী জীবনের টিম মেম্বার এই পঁয়তাল্লিশ জন অশিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত শ্রমিক। যারা মাঝে মাঝে আমার জন্য পিঠা, পায়েস রান্না করে নিয়ে আসতো। কেউ কেউ গাছের আম, নারিকেল অথবা কামরাঙ্গা ব্যাগ ভরে নিয়ে আসতো। বিনিময়ে তাদের প্রত্যাশা ছিলো একটু মমতা, একটু কোমল গলায় কথা। টেক্সটাইল মিলের ওয়ার্কারদের যে কী পরিমান কষ্ট করতে হয়, তা কেউ না দেখলে বিশ্বাস করতে পারবে না। এদের কেউ কেউ নিজের প্রচন্ড জ্বর, বাচ্চার অসুখ রেখে কাজ করতে আসে। কেউ কেউ না খেয়ে আসে। কেউ কেউ একটু পয়সা বাচানোর জন্য টিফিন খায় না। কারো কারো এতো বেশী কষ্ট যে নিজের কষ্ট কে হাস্যকর মনে হয়।
আমি এর হয়তো কিছুই জানতাম না। জেনেছি এদের সাথে মিশে।

রাশেদা, ও পাচ নম্বর মেশিনে কাজ করতো। চুপচাপ মেয়ে। কাজে খুব দক্ষ। জানলাম ও খুব ভালো ছাত্রী। এস,এস,সি দেবে কিছু দিন পর। আমার কাছে খুব ভয়ে ভয়ে মাথা নিচু করে এলো। “স্যার আমি পরীক্ষা দিমু, মাঝে পরীক্ষার দিন গুলান ছুটি লাগবো।”

আমি হেসে ফেল্লাম। ওকে পাচশ টাকা দিয়ে বল্লাম, “দোয়া করি, ভালো মতো পরীক্ষা দাও, আর এই টাকা টা দিয়ে পছন্দ মতো কিছু কিনে খেও, তোমার ছুটি পাশ”

বোকা মেয়ে টা কেঁদে ফেল্লো। আমি চূড়ান্ত পর্যায়ের অপ্রস্তুত। হয়তো এতো সামান্য স্নেহ টুকু ও কারো কাছ থেকে পায়নি।

তিন দিন পরই রাশেদা কাজে এলো। আমি তো খুব ই অবাক। আমাকে দেখে ও আড়ালে চলে গেলো। যা জানলাম তা হলো, রাশেদার স্বামী ওকে এস,এস,সি পরীক্ষা দিতে দেবে না। কারন বেশী শিক্ষিত বউ থাকা অশান্তির কারন। কিন্তু রাশেদা জেদ করেছিলো। আর এই কারনে ওর শ্বাশুরী ওর পিঠে জ্বলন্ত চ্যালাকাঠ চেপে ধরেছিলো। রাশেদার পরীক্ষা দেয়া হয় নি। এরপর থেকে রাশেদা পড়াশুনা বাদ দিয়েছিলো। ও এক বার আমাকে বলেছিলো ও নার্স হয়ে সবার সেবা করতে চায়।

হনুফা ছিলো খুব ই চঞ্চল একটা মেয়ে। ঠাশ ঠাশ কথা বলতো। কাজে ছিলো অসাধারন। ও মেটারনিটি লিভে যাবে। আমি ই সব পাশ করিয়ে জি,এম স্যার কে বলে অ্যাডভান্স টাকার ব্যাবস্থা করে ওর হাতে তুলে দিলাম। যাবার সময় আমাকে সালাম করে গেলো। আমি যথারীতি অপ্রস্তুত! সে আমাকে বল্লো, “স্যার আমার বাচ্চা রে দেখবার আইবেন! আমার বাড়ি এই থন এক কিলো। না আইলে আমি রাগ করুম। আপনের আইতেই হইবো”

আমি বুক টা কেমন করে উঠলো। আমি এতো ভালোবাসার যোগ্য না। খুব সাধারন একটা ছেলে। এরা আমাকে অনেক বেশী উপরে স্থান দিয়েছে।

ঠিক সময় মতো ও এলো। ওর বাচ্চা টা কে দেখতে যাওয়া হয়নি। হনুফা কে দেখে আমি বেশ একটা ভয় ই পেলাম। না জানি কি বলে!

নাহ! ও কিছুই বল্লো না। আমি জিজ্ঞাসা করলাম ওর বাচ্চার খবর। ক্লান্ত দৃষ্টি তে তাকালো। বাচ্চা টা কে নিয়ে ও বাবার বাড়ি চলে এসেছে। ছেলে বাচ্চা হয় নাই বলে ওর শ্বশুর বাড়ির মানুষ ওকে লাথি মেরে ওই রাতেই বাচ্চা সহ বের করে দিয়েছিলো যে রাতে ওর কোল জুড়ে বাচ্চা টা এসেছিলো। ওর বাচ্চাকে বুকে নিয়ে তিন চার কিলো হেটে ওর বাবার বাড়ি গিয়েছিলো। ঠিক তার তিন দিন পর হনুফার স্বামী আরেক টা বিয়ে করে।

হনুফার স্বপ্ন ছিলো টাকা জমিয়ে স্বামীর জন্য একটা সাইকেল কিনবে। স্বামীর অফিস যেতে খুব ই সমস্যা হয়। সে ঐ চিন্তায় প্রায় ই বিচলিত থাকতো।

ঝর্ণা তিন দিন ধরে কাজে আসে না। নাইট শিফটে মাঝে মাঝে ই ওয়ার্কার রা হুট হাট আসে না। তিন দিন পর বিধ্বস্ত ঝর্ণা কাজে এলো। অন্যদের কাছ থেকে যা শুনলাম তাতে আমার গা টা গুলিয়ে গেলো। তিন দিন আগে ও ফ্যাক্টরি তে আসছিলো, পথে এক যুবক তার দুই বন্ধু মিলে তাকে জোড় করে টেনে নিয়ে পাশবিক অত্যাচার চালায়।

সে কাউকে ঘটনা বলে নাই ভয়ে, কিন্তু ঘটনা সবাই জেনে যায়। এরপর পুলিশের কাছে তো বিচার যায় ই নাই বরং “অসভ্য” চালচলনের জন্য ঝর্নাকে সবার সামনে মাফ চাইতে হলো। ঝর্ণা এখন পাথর হয়ে গেছে। ফড়িং এর মতো উড়ে উড়ে যে কাজ করতো, সে হঠাৎ করেই যেনো বুড়িয়ে গেছে৷

ঝর্নার কিছুদিন পর বিয়ে হবার কথা ছিলো। সংসার করার কথা ছিলো। যে যুবক তার বন্ধু দের নিয়ে পশুর মতো কাজ টা করেছিলো, সেই পশু টার সাথেই তার বিয়ে হবার কথা ছিলো।

এই প্রতি টা ঘটনা দিনের মতো সত্য আর প্রতি টা ঘটনার পর এরা সবাই পেটের দায়ে আবার কাজে ফিরে এসেছে। আবার এরা পরম মমতায় সুতা বানিয়েছে, মেশিনে ববিন লাগিয়েছে। ওদের চোখের জল মিলে মিশে গেছে প্রতিটা সুতার সাথে। যে সুতা রপ্তানি হয়েছে এইচ,এন,এম, ভার্সাচে, পিয়েরে কার্ডিন, টমি হিল্ফিগারের মতো নামীদামী ব্র‍্যান্ডে ৷

সেই ব্র‍্যান্ডের শার্ট পড়ে আমরা আমাদের স্ত্রীর সাথে, প্রেমিকার সাথে ক্যান্ডেল লাইট ডিনার করি। আর রাশেদা, হনুফা ঝর্না রা সুতা বানিয়ে যায়।

আমার আজ অনেক কষ্টেও কষ্ট লাগে না। অনেক দুঃখেও চোখে পানি আসেনা। কারন আমাদের দুঃখ বিলাস ওদের হাসায়। আর ওদের কষ্ট আমাদের অবাক করে।
.
by- Sabbir Ahmed Emon

ইন্টার্নী করার সময় একদিন…

Post ID # 009

ইন্টার্নী করার সময় একদিন খুব করে জানলাম আমি ” Lower” শব্দটার উচ্চারন পারি না। বহু মানুষের সামনে স্যার প্রায় চিবিয়ে চিবিয়ে উচ্চারনটা শেখালেন। ওয়াশরুমে গিয়ে দেখি চোখ জোড়া শুধু লাল হয় নি, মুক্তার মত স্বচ্ছ পানির কনা চিকচিক করছে। বুড়ো বয়সে মনটা ভেংগে প্রায় গুড়িয়ে গেল।
……
রেটিনার স্টুডেন্ট থাকার সময় খুলনা মেডিকেলের এক ভাইয়া মূত্রতন্ত্র পড়িয়েছিলেন। আমি কিছুই বুঝি নি। ক্লাশ শেষে বেকুবের মত প্রশ্ন করেছিলাম ::: ভাইয়া, Urine মানে কি???”
পুরো ক্লাশে যেন বিষ্ফোরোণ ঘটেছিল। হাঁসতে হাঁসতে কেউ কেউ বেঞের উপর শুয়ে পড়েছিল। দুই দিন শুয়ে ছিলাম আর তিনদিন কোচিংয়ে যাই নি। তারপর চোরের মত যেদিন হাজির হলাম, লজ্জাকর এক কান্ড ঘটে গেল।
আমার হাত ঘড়ি ছিল না। বাড়ি থেকে আসার সময় ছোট আপা তার স্টিলের ঘড়ি আমাকে দিয়েছিল। স্টিলের ঘড়ি পরে সেদিন গিয়েছিলাম। ফুলকাটা ঘড়িগুলো যে শুধু মেয়েদের হয়, খুব বোকা আর গ্রাম থেকে আসা ছেলেগুলো যে না জেনে তা হাতে পরে আমি জানতাম না। ক্লাশে আর এক দফা সার্কাস হয়ে গেল। সেদিন দুপুর থেকে প্রায় মাঝ রাত অবধি ম্যাচের ছাদে একা একা বসেছিলাম।
……..
মেডিকেলে ভর্তি হলে বড় ভাইয়েরা দলবেধে বিরিয়ানি খেতে নিয়ে গিয়েছিলেন। বিল দেওয়ার সময় বিপত্তি ঘটল। একজনকে ছাড়া বিল করা হয়েছে। দলের ভিতর থেকেও আমাকে ওদের মত মনে হয়নি। ওয়েটার আমাকে দেখিয়ে বলেছিল:: ও কি আপনাদের সাথে??? মনে আছে
রিক্সায় বসে প্রায় সারাটা পথ সেদিন চোখ মুছেছিলাম।
…..
এস এস সির পর ছোট মামা খুব ধণী লোক এক আত্মীয়ের বাসায় নিয়ে গিয়েছিলেন। হাত ধুঁতে যেয়ে বেসিনের কল ভেংগে ফেলেছিলাম। কাজের মেয়ে সহ আটজন সদস্যের সেই বাসায় আটবার আমাকে শেখানো হয়েছিল কল কিভাবে ছাড়তে হয়। চার বছর পর সেই সোফাতেই আবার বসেছিলাম তাদের পছন্দের পাত্র হিসেবে। এ যাত্রায় আমার রুচী অবশ্য সায় দেয় নি।
……..
দোষগুলো আমার নয়। যে ছেলে ক্লাস টেনে নয় জনের সাথে , আর ইন্টারমিডিয়েটে উনিশ জনের সাথে পড়েছে , সে বহু ইংরেজি শব্দ জানবে না, বহু শুদ্ধ উচ্চারন জানবে না এটাই সত্য।
কিন্তু ওটি রুমে রুগী যখন আমাকে প্রশ্ন করে::: Excuse me doctor, আপনার বাসা খুলনা? আপনি ঝর ঝরা ভাষায় কথা বলেন, দশ জন এক জায়গায় থাকলে বাকি নয় জন আপনার কথাই শুনবে। “”
.
আমি তখন ধাধায় পড়ে যাই। এই ওটি রুমে ঢুকতে যেয়ে, এই মাস্ক, ক্যাপ মাথায় পরতে যেয়ে জীবন টা আর জীবন থাকে নি, হাজার হাজার এলোমেলো বাঁক পাড়ি দিতে হয়েছে। স্বাভাবিক জীবনে যারা মন্থর, যারা বেশি বোকা, তাদের নিজেদের জীবনে এরা অনেক বেশি সচল। বিধাতা কাউকেই ঠকায় না।
……
বাবার চেয়েও বড় কেউ যখন কাঁধে হাত রেখে বলে :: এরা স্মার্ট ছেলে, এরা সার্জন। তখন সাত বছর আগের ওয়েটারের কথা মনে পড়ে, আমি আর বোকা নই, আমি আর গেয়ো নই। গলায় ময়লা মাফলার পেচিয়ে আর রাস্তায় যাই না।
…..
প্রতিটা বিন্দু সময়ের হিসাব রাখেন তিনি, যিনি সময় সৃষ্টি করেছেন। সময়ের ফেরে আমরা কেউ বোকা, কেউ অতি চালাক। কেউ ময়লা মাফলার পরে, কেউ বিদেশী জ্যাকেট । Urine এর মানে না জানলে কেউ অমানুষ হয়ে যায় না। কিন্তু বিশাল আকাশের উপরে যিনি থাকেন, উনি প্রতিটা হাঁসি আর প্রতি ফোটা চোখের হিসাব রাখেন। সে হিসেবে কেউ ঠকে না।
.
ভুতুড়ে ম্যাচের স্যাঁত স্যাঁতে রুমে ৬০ ওয়াটের অনুজ্জ্বল হলুদ আলোয় আমি আর কামাল যখন গোবারের ঘুটি আর কাঠের গুড়ো দিয়ে আধা সিদ্ধ ভাত রান্না করতাম, সেই সন্ধায় ও আমার মনে হয় নি বহু পরে একদিন আমি আর বোকা থাকব না।
——-
.
.
লেখাঃ Dr abdur rob
FCPS part 2,surgery

Try To Be Different

Post ID # 008

প্র্যাক্টিকালসহ আমাদের এসএসসি পরিক্ষা শেষ হয়েছিল ১৫ মার্চ, ২০১১। আর আমি ১০ তারিখেই একটা স্পোকেন ইংলিশ কোচিং আর কম্পিউটার ট্রেনিং ইন্সটিটিউটে ভর্তি হয়ে এসেছিলাম বাসায় না বলেই। ক্লাস শুরু হয়েছিল ১৬ মার্চ বিকেল থেকে। এসএসসির জন্য একটা দিনও ছুটি কাটাইনি আমি
.
আব্বু জিজ্ঞাসা করেছিলেন, কেন এই কাজ করলাম। আমি আব্বুকে একটা পরিসংখ্যান দেখালাম যেটা আমার ভাবনাতে ছিল আগে থেকেই
.
… ম্যাথ আমার ফেভারেট সাবজেক্ট। ২০১৩-১৪ সেশনে আমার অনার্সে ভর্তি হবার কথা। মনে করি, ম্যাথে অনার্সে ভর্তি হয়ে ২০১৮-১৯ সেশনে মাস্টার্স শেষ করে বের হবো; মনে করি, আমি অনার্স-মাস্টার্সে ফার্স্ট ক্লাস পেয়েই স্টাডি শেষ করলাম। বাংলাদেশে ইউনিভার্সিটি আছে ১৩৬টি। প্রতিটি ক্যাম্পাস থেকে যদি কমপক্ষে গড়ে তিনজন করেও ফার্স্ট ক্লাস পায়, তবুও সেইম ২০১৮-১৯ সেশনে অলমোস্ট ৪০৮ জন ফার্স্ট ক্লাস ক্যারিয়ার স্টুডেন্ট পাওয়া যাবে শুধুমাত্র ম্যাথ ডিপার্টমেন্ট থেকেই।
.
ধরা যাক, কোন এক কোম্পানিতে জব সার্কুলার দিলো এবং ক্রাইটেরিয়া হিসেবে দিলো জব সিকারকে ২০১৮-১৯ সেশনের ম্যাথ ডিপার্টমেন্ট থেকে ফার্স্ট ক্লাস রেজাল্ট নিয়ে পোস্ট-গ্র্যাজুয়েটেড হতে হবে। জব ভ্যাকেন্সি আছে অনলি একটি 🙂
.
… এবং সেখানে সেই আমিসহ ৪০৮ জনই অ্যাপ্লাই করলো। এখন আমার প্রশ্ন ছিল, “আমাদের এই ৪০৮ জনের প্রত্যেকেই ফার্স্ট ক্লাস রেজাল্ট ক্যারিয়ার, প্রত্যেকেই ২০১৮-১৯ সেশনের পোস্ট-গ্র্যাজুয়েটেড। সবারই হাতে অলমোস্ট একই প্রকারের সার্টিফিকেট। তাহলে কি দেখে, কোম্পানির অথোরিটি আমাকেই ‘অনলি ওয়ান’ হিসেবে জবটা দিবে?”
.
এই প্রশ্নের উত্তর সামনে উপবিষ্ট সকলেই চুপ ছিলেন। তখন আমি ব্যাখ্যা দিয়েছিলাম, “সময় যেভাবে সামনের দিকে আগাচ্ছে… বিশ্ব যেভাবে ডিজিটালাইজড হচ্ছে, সেখানে সেই জব প্লেসে আমার ‘গণিতে প্রথম শ্রেণিসহ স্নাতকোত্তর সনদপত্র’এর পাশাপাশি আমার ইংলিশ স্পোকেন স্কিল আর কম্পিউটার অপারেটিং স্কিলটাই আমাকে সাহায্য করবে, বাকি ৪০৭জনের চেয়ে আলাদা করতে। আর এই সার্টিফিকেটসহ ট্রেনিংটা এসএসসির এই তিন মাস ফ্রি টাইমের পর, আর কোন সময়েই পাবো না। এইচএসসির পর অ্যাডমিশন প্রিপারেশন, অনার্সে ইনকাম ভ্যালুসহ বিবিধ কারণে এই জিনিসটা আমি করেই উঠতে পারবো না
.
ঠিক এই একটা যুক্তিতেই আমি আমার ছুটিটাকে আম গাছের মগডালে তুলে দিয়েই ভর্তি হয়েছিলাম দুইটা ট্রেনিং ইন্সটিটিউটে 😛
.
ট্রাই টু বি ডিফারেন্ট ইন পজিটিভ ওয়ে… বিকজ, ইওর পজিটিভ ডিফারেন্স ক্যান হেল্প ইউ টু বি ফার অ্যাওয়ে!
.
লিখেছেন: Isha Khan