অবনীর বোধহয় অসস্থি লাগছে…

Post ID # 024

অবনীর বোধহয় অসস্থি লাগছে আমার পাশে বসতে। আমি যতটুকু পারা যায় রিক্সার সাইড ঘেষে বসে আছি। শুধু আড় চোখে অবনীর দিকে তাকানোর লোভ সামলাতে পারছি না। এই অবনীর সাথে ভার্সিটি লাইফের অবনীর কোনো মিল নেই। যার চোখে হাজারো পাগলামো খেলা করত, নিত্যনতুন দুষ্ট বুদ্বির আনাগোনা চোখ জলমল করে বেড়াত সেই অবনীর চোখ এখন নিষ্প্রাণ। চেহারায় গম্ভির প্রকৃতির একটা ভাব এসে পরেছে। নাকের ডগায় চশমা ঝুলানোর জন্যই অন্যরকম লাগছে। আমি কিছু না বলে চুপ করে রইলাম।

“আর একটু এইদিকে সরে আস। না হয় ঝাকুনি খেয়ে পরে যাবি”

নিরবতা ভেঙ্গে বলল অবনী। আমি পাশ ফিরে দেখলাম। সত্যি তো! আর একটু হলে রাস্তায় পরে যেতাম। আমি সরে বসলাম। আমার দিকে তাকিয়ে ম্লান করে হাসল অবনী। তার হাসিতে সেই আগের উচ্ছাসটুকু নেই।

আমার মাথায় কখন থেকে একটি স্মূতি ঘুরছে। অবনীর সাথে শেষ দেখা হওয়ার কথা। ক্যাম্পাসের শেষ দিন ছিলো। গ্রেজুয়েশন শেষে মেতে উঠেছিলাম আনন্দ। প্লেনিং ছিলো আগেই। রিতিশাকে প্রোপোজ করার।

রিতিশা আমাদের ব্যাচেরই মেয়ে। রূপলাবন্য ভরপুর। ক্যাম্পাসে প্রথম দিন থেকে তার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছিলাম। সেইদিন ৫ বছরের ভয়কে জয় করে ভালোবাসি বলেছিলাম। রিতিশা রাজি হয়ে গেল। অবনী এসে অভিনন্দন জানালো হেসে। সেইদিনের পর থেকে অবনীর দেখা মেলেনি। অনেক খোঁজার পরেও না। আজ হয়ে গেল নিউমার্কেটের সামনে। গুড়িগুড়ি বৃষ্টিতে দাড়িয়ে ছিলাম। বৃষ্টির দিনে রিক্সার অভাব, শেষে টুংটাং শব্দে পিছনে একটি রিক্সা থামল। অবনী বলায় উঠে বসলাম। এতটা বিষ্মিত ছিলাম কিছু বলার বা ভাবার কথা মাথায় আসেনি।

– কেমন আছিস রুদ্র?

অন্যদিকে তাকিয়ে বলল অবনী। আকাশ মেঘলা। বৃষ্টি পরছে না এখন আর।

– চলছে হেলেদুলে। তুই তো হারিয়ে গিয়েছিলি একেবারে।

আমার কথায় আবার নিষ্প্রাণ হাসি অবনীর চেহারায়। কিছু বলল না অবনী। আমি চুপ হয়ে বসে থাকতে পারলাম না।

– তোর দিন কেমন যাচ্ছে?

অবনী এইবার ও চুপ। কেমন যেন বিষাদ ভর করেছে চোখে। রিক্সা থামালাম। আর একটু হাটলেই সিআরবি মোড়। ক্লাস ফাঁকি দিয়ে কত সময় কাটিয়েছি এই জায়গাটাতে। রিক্সা থামাতে দেখে ভুর কুচকে তাকালো অবনী। আমি তাকে নামার ইশরা করলাম।

পুরনো কিছু স্মৃতি এখনো রঙ্গিন হয়ে আছে। একবার ক্যাম্পাসে যাওয়ার পথে হুট করে বৃষ্টি নামল। সেইদিন ও পাশে ছিলো অবনী। দুজন সারাদিন বৃষ্টিতে ভিজেছি। কখনো রিক্সায় কখনো হেটে। ঠান্ডায় কাঁপছিলাম দুজন। পাগলীটা ঐসময় হাতে আইসক্রিম ধরিয়ে দিলো। অবনীর কিছু হয়নি ঐদিনের বৃষ্টিতে ভেজার ফলে জ্বরে বিছানায় ছিলাম ৭ দিন। অবনী প্রায় ঐদিনটার কথা মনে করে হাসত।

সময়ের সাথে দুটো মানুষের অবস্থানের কত পরিবর্তন। অবনী হাটছে কিছুটা দূরত্ব নিয়েই। গুড়িগুড় বৃষ্টির ফোঁটা পরছে আবার।

– তুই এমন হয়ে গেলি কেন রে? _ না পেরে জিগেস করলাম।

– কেমন?

– তুই ভালো করেই জানিস অবনী।

– কোনো কিছু আগের মতো নেই রে। না তুই না আমি

গম্ভির হয়ে রইলাম। অবনী কথাটি বলে থেমে গেছে। প্রতিবাদ করে কিছু বলতে ইচ্ছে করছে। আমি তো বদলায় নিই। আগের মতোই আছি

– তুই বদলিয়েছিস অবনী। আমি না

– রুদ্র তুই বদলেছিস।

প্রতিবাদ করে কিছু বলতে যাবো। অবনীর চোখের দিকে তাকিয়ে থেমে গেলাম। আসলে কি বদলেছি?

ক্যাম্পাসের শেষ সময়টুকুতে এসে কিছুটা দূরুত্ব হয়ে গিয়েছিল অবনীর সাথে। সেটা অবশ্য রিতিশার মনোযোগ পাওয়ার জন্যই। তাই বলে বদলে তো যাই নিই।

– রিতিশা কেমন আছে রুদ্র?

হঠাত্‍ আমার দিকে তাকিয়ে বলল অবনী। চুপ হয়ে রইলাম। রিতিশার সাথে বেশিদিন সম্পর্ক টেকে নিই। প্রথম দিকে দুজনকে এক মনে হলেও পরে বুঝেছিলাম আমাদের ভাবনার জগতে বিস্তর তফাত।

– বড়জোর একবছর ছিলাম। অনেক চেষ্টা করেও টেকেনি সম্পর্ক। আমার স্বপ্ন গুলো ছোট ছোট। রিতিশার স্বপ্ন আকাশ ছোয়া।

কথাগুলো বলেই থামলাম। পাশ ফিরতে খেয়াল করলাম অবনী তাকিয়ে আছে এক দৃষ্টিতে। তার দিকে তাকিয়ে হাসলাম আমি।

– এখন একা একা ঘুরে বেড়ায়। মন্দ নেই। তোর খবর বল

আমার কখায় অবনী চুপ থাকে কিছুক্ষণ। আমি তাকিয়ে থাকি তার দিকে। আজ অনেক স্মৃতি অনেক প্রশ্ন আসছে মাথায়। এসব রিতিশা চলে যাওয়ার পরেও এসেছিল।

– গ্রেজুয়েশন করে বের হওয়ার পর বাবা বিয়ে ঠিক করলেন। কিছু না ভেবেই রাজি হয়ে গেলাম। মেলেনি ভাবনা গুলো। আজ আমাদের ডিবোর্স হলো।

অবনীর কথা শুনে চুপ হয়ে রইলাম কিছুক্ষণ। হাটা শুরু করলাম আবার। কিছুদূর হেটে অবনী থামল। বৃষ্টির মাত্রা বেড়েছে ততক্ষণে। সামনে আইসক্রিম। অবনী আমার দিকে তাকিয়ে হাসল। এই হাসি সেই ভার্সিটি লাইফে অবনীর হাসি !

একটা ছাউনির মাঝে দাড়িয়ে আছি আইসক্রিম হাতে। বাহিরে ঝুম বৃষ্টি। আশেপাশে পুরো জায়গা খালি। অবনী হাতের আইসক্রিম ফেলে ছুটলে বৃষ্টিতে। আমিও পিছু পিছু ছুটলাম। এই যেন সেই বছর ৫ এক আগের অবনী।

অবনী আকাশের দিকে তাকিয়ে ভিজছে। আমি তাকিয়ে আছি এক দৃষ্টিতে। অবনীর চেহারায় কান্নাহাসির মিশ্রণ। যেন এক বৃষ্টিতে সব দুঃখ গুলো মুছে দিতে চাইছে !

সন্ধা নেমেছে । দুজন ভিজে চুপসে গেছি। কিছুক্ষণ চুপ থেকে অবনী বলল

– রুদ্র , আমি হঠাত্‍ কেন হারিয়ে গেলাম জানতে চেয়েছিস?

অবনীর দিকে তাকালাম আমি। উত্তর নেই আমার কাছে

– রিতিশার সাথে তোর সম্পর্ক টিকবে না। আগে থেকেই জানতাম।

– বলিসনি কেন?

– বললে কি হতো? তুই মেনে নিতি?

আমি চুপ করে রইলাম।

– সেইদিন তোর জন্মদিন ছিলো। অন্যদিনের মতো আমার গিফট দেখেছিলি?

কিছু না বলে চুপ হয়ে রইলাম। অবনী চোখে স্পষ্ট জল দেখছি। একটা গেইটের কাছে রিক্সা থামিয়ে নেমে পরলো অবনী। যাওয়ার আগে একটাবার ও তাকায় নি সে

পুরো রিক্সায় জুড়ে আমার প্রতি জন্মদিনে দেওয়া অবনীর সারপ্রাইজ গুলোর কথা মনে পরছে। চোখের সামনে ভেসে আসছে তার দেওয়া শেষ গিফটি। ডায়রী ছিলো সেটি। পড়া হয়নি। অস্থিরতা অনুভব করলাম। রিক্সা এত আস্তে চলছে কেন। অবনীর ডায়রীটি এখনো কি আগের জায়গায় আছে?

*

আমাকে নিয়ে প্রত্যেকটি স্বপ্নের কথা অবনীর ডায়রীতে সাজানো আছে। পাগলীটা বলেওনি একটাবার। সেইদিন সারারাত অস্থিরতায় কাটালাম। পরেরদিন ছুটলাম অবনীর বাসায়। ততক্ষণে অবনীর চলে গিয়েছে। বাড়ির কেউ বলেনি সে কথায়। সে হয়তো জানত আমি আসব তাকে ফিরাতে

অনেক সময় আমরা ভালবাসাকে খুব কাছ থেকে পেয়েও বুঝিনা ক্ষনিকের মোহের জন্য হারিয়ে ফেলি

— আশরাফ মামুন

Advertisements

সকাল বেলা সকালে চা না পেলে…

Post ID # 020

সকাল বেলা সকালে চা না পেলে মেজাজ খারাপ হয়ে যায় জাহাঙ্গীর সাহেবের। তিরিশ ছুই ছুই মানুষটার চা খাওয়ার নেশা প্রবল হলেও, মাঝে মাঝে স্ত্রীর বলদামিতে সকালে বাইরে গিয়ে চা খেতে হয়। তবে আজকের ব্যাপারটা নিয়ে ভিতরে ভিতরে সে নিজেও লজ্জিত। আজকে ঝগড়া হওয়ার কারন সে নিজে।

পত্রিকা খুলে মাত্র সোফায় গা এলিয়ে বসেছে জাহাঙ্গীর। নিচু গলায় সে একবার বললো, চা দাও।

‘ চা নাই। চিনিও নেই। ‘

‘ আগে বললা না কেন? ‘

‘ মনে ছিল না। যাও বাজারে যাও। এক কেজি খাসির মাংস নিয়ে আসো। তোমার কোন বন্ধু না বলে আসবে? ‘

‘ বাজারে যেতে পারবো না। ‘

‘ দুপুরে গরমের মধ্যে আমিও রান্না করতে পারবো না, বলে দিলাম। ‘

‘ না পারলে নাই। ওরা আসলে বলে দিবে, রান্নাবাটি হয় নি। আপনারা চলে যান। ‘

‘ আচ্ছা। ‘

‘ কি আচ্ছা! অদ্ভুত তো! সকাল সকাল ঝগড়া করার শখ হলো কেন তোমার? ‘

‘ আমি কই ঝগড়া করছি? ‘

‘ আমার বন্ধুদেরকে চলে যেতে তুমি কে বলার? ‘

‘ আমি কি বললাম? বললাম এক কেজি খাসির মাংস নিয়ে আসো। ‘

‘ আমার ঘরে আমার টাকায় বসে বসে খাবা আর আমার উপর খবরদারি! ‘

‘ কি বললে তুমি? ‘

জাহাঙ্গীর পকেট থেকে দুটো পাঁচশো টাকার নোট বের করে শৈলীর দিকে ছুড়ে মারলো। অত্যন্ত হতভম্ব হয়ে শৈলী ঠোট কাঁপিয়ে কান্না করে দিল। জাহাঙ্গীরের সেদিকে খেয়াল নেই। সে সকালে চা পায় নি। এখন তার মাথা গরম।

শৈলী বাজার করতে বাইরে গিয়েছিলো। এক কেজি খাসির মাংসের সাথে চা পাতি চিনি, গরম মশলা, সব আনলো। খাসির মাংস কষানো বাদ দিয়ে সে জাহাঙ্গীরের জন্য চা বানালো। এক কাপ চা জাহাঙ্গীরের হাতে তুলে দিয়ে সে চুপচাপ রান্নাঘরে চলে গেল। রাগে ফোপাতে থাকা জাহাঙ্গীর, চায়ে দুই চুমুক দিয়ে লজ্জায় মাথা হেট করে ফেললো। শৈলীকে এভাবে বলা উচিত হয় নি।

রান্নাঘরে একবার উঁকি মারলে কেমন হবে? ও কি এখনও কান্না করছে? আজ সকালে খাওয়ার খুটা দেয়া হয়েছে ওকে। এখন যদি রান্না শেষে বলে, রান্না শেষ। বন্ধু এলে খেতে দিয়ো। আমি বাপের বাড়ি যাচ্ছি। কয়েকদিন ওইখানে খেয়ে এখানকার চাপ কমাই।

জাহাঙ্গীরের ভেতরে ভেতরে অস্থির অস্থির ভাব। সে স্পষ্ট দেখতে পারছে, শৈলী চোখ মুছলো।

<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>

রফিক খুব মজা করে খাসির মাংস আর ডাল দিয়ে চটকিয়ে ভাত খাচ্ছে। শৈলী রান্নাবান্না, ঘর মোছা থেকে শুরু করে সব কাজ করে দিয়ে বাপের বাড়ি চলে গেছে। জাহাঙ্গীর লজ্জা লজ্জা চেহারা নিয়ে রফিককে ভাত আর কই মাছ ভুনা তুলে দিচ্ছে। ভেতরে ভেতরে জাহাঙ্গীর রাগে ফেটে যাচ্ছে।

‘ ভাবী কবে আসবে? ‘

‘ যেই কয়দিন থাকতে চায়, থেকে চলে আসবে। ‘

‘ ও । ‘

‘ মাংস খেতে কেমন? ‘

‘ খারাপ না। ভালোই। মজা আছে। ‘

‘ হুম। ‘

‘ বাসায় তার মানে তুই একা? ‘

‘ হু। ‘

‘ ও। ‘

রফিক আবার খাওয়ায় মন দিলো। কিন্তু এবার তার খাওয়ায় মন নেই। চেহারা দেখে মনে হচ্ছে মুখের ভিতর হাড্ডি আটকেছে। জাহাঙ্গীর জানে, এইবার হারামী মেয়েলী আলাপ শুরু করবে।

‘ যাই বলিস, তুই অনেক লাকি। ভাবী কত ভালো রান্না করে। ‘

‘ হুম। ‘

‘ ডালটাও মজা হয়েছে। ‘

‘ আরেকটু খা। ‘

‘ দোস্ত ভাবী তো নাই। চল আজকে রাতে জুম্মনবাড়ি যাই। ‘

‘ তোর ইচ্ছে হলে তুই যা। আমি যাবো না। ‘

‘ আরে কেউ জানবে না। ‘

‘ না জানুক। ‘

‘ দোস্ত, আজকে মঙ্গলবার। রূপসী আসবে আজকে। ‘

‘ রূপসী কে? ‘

‘ গেলেই চিনবি। চল যাই। ‘

‘ তুই ভাত খা। আর কিছু লাগবে? ‘

‘ আরেকটা কই মাছ দে। ‘

জাহাঙ্গীর কই মাছ তুলে দিলো রফিককে। রফিক বেশি করে কই মাছ খাচ্ছে, কারণ কই মাছ নাকি পুরুষের শক্তি বাড়ায়। আজ সে প্রচুর শক্তি খরচ করবে। তার আজকে রূপসীর সাথে ডিল আছে।

খাওয়াদাওয়া শেষে ঢেকুর তুলতে তুলতে রফিক বাইরে চলে গেল। রফিক চলে যাওয়ার সাথে সাথে পুরো বাড়ি খা খা করে উঠলো। কিছু একটা নেই। জাহাঙ্গীর একা একা ভাত বাড়তে লাগলো নিজের জন্য। আরেকটা প্লেটে এমনি এমনি ভাত বাড়লো। কেন বাড়লো, সে নিজেও জানে না। হঠাৎ ভাত বাড়া রেখে সে শৈলী কে ফোন দিল। দুইবার ফোন ধরলো না। তিনবারের বেলায় সে ফোন ধরলো।

‘ হ্যালো? ‘

‘ বাসায় কবে আসবে তুমি? ‘

‘ দেখি। ‘

‘ সরি। ‘

‘ আচ্ছা ঠিক আছে। ‘

‘ ক্ষুধা লেগেছে। রফিক সব চেটেপুটে খেয়ে চলে গেছে। কিছুই খাওয়ার নেই। ‘

কথাটা মিথ্যা। শৈলী তাকে না খাইয়ে রাখবে না। সে বলবে, বেবিট্যাক্সিতে করে চলে আসো। আমাকে নিয়ে যাও। কিন্তু সে সেটা বললো না।

‘ ফ্রিজে ডিম আছে, ভেজে খাও। ‘

‘ মাংস তো পুরোটা রান্না কর নি মনে হয় …… আসো না! আমি বেবিট্যাক্সি নিয়ে আসছি। ‘

‘ আমি আসবো না। ‘

‘ সরি বলেছি তো! ‘

‘ বললাম তো পারবো না! ‘

ধপ করে ফোন কেটে দিলো শৈলী। জাহাঙ্গীর হতভম্ব হয়ে কয়েক মিনিট পুরো বিষয় বুঝার চেষ্টা করলো। কিন্তু পারলো না। সে কেন যেন মোবাইলের দিকে তাকিয়ে রইলো। শৈলী ফোন দিতে পারে।

দুই মিনিটের মধ্যে শৈলী ফোন দিয়ে জানালো, আধা ঘন্টার মধ্যে না আসলে লাগেজ নিয়ে সে আবার বাপের বাড়ি ঢুকে যাবে।

<<<<<<<<<<<<<<<<<<>>>>>>>>>>>>>>>>>

আজ সকালে ভয়ানক ঝগড়া হয়েছে। আজ ঘরে চা চিনি সব আছে। কিন্তু শৈলী চা বানায় নি। জাহাঙ্গীর খুব কড়া কিছু বলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ওদিকে শৈলীর চেহারা খুশি খুশি। সে সকালে গোসল করে একটা কাঁচা কলাপাতার রঙের শাড়ি পড়েছে। আগের রাতে জাহাঙ্গীর তাকে অনেক আদর করে ঘুম পাড়িয়েছে। বারবার বলেছে, আর কোনদিন কারন ছাড়া সে তাকে বকবে না। সেও নিজে প্রতিজ্ঞা করেছে, আর সে চা না বানিয়ে স্বামীকে রাগাবে না। আজকে গোসল করতে গিয়েই একটু দেরী হলো। এখন সে চা বানাবে।

চা বানিয়ে শৈলী স্বামীর সামনে বসলো। ভেজা চুল থেকে তখনও পানি চুইয়ে চুইয়ে পড়ছে। কপাল দিয়ে ফোটা ফোটা পানি গড়িয়ে পড়ছে নাকে। তার চেহারা থেকে পানির সাথে সাথে আহ্লাদও গলে গলে পড়ছে।

‘ চা করতে এত দেরী হলো কেন? ‘

‘ গোসল করছিলাম। ‘

‘ চা বানিয়ে দিয়ে গেলে কি সমস্যা ছিল? ‘

‘ তুমি এভাবে কথা বলছো কেন? ‘

‘ আজকে তো চা চিনি সব ছিল। তবুও চা করতে এত কষ্ট লাগে কেন? ‘

‘ এই যে চা করে আনলাম! ‘

‘ খাবো না এই চা। সকাল বেলা সকালে মেজাজ খারাপ না করে দিলে পেটের ভাত হজম হয় না, তাই না? ‘

‘ তোমার আবার কি হলো? ‘

শৈলীর চেহারা মুহুর্তেই কান্না কান্না ভাবে ভরে গেল। যেকোন সময় সে কান্না করে দিবে। তার চেহারা থেকে আহ্লাদ কর্পুরের মত উড়ে গেছে। সে এখন চোখ বড় করে জাহাঙ্গীরের দিকে তাকিয়ে আছে। নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখা হলো না, টুপ করে দুই ফোটা চোখের জল গড়য়ে পড়লো।

জাহাঙ্গীর জানে, চায়ে এক চুমুক দিলেই মেজাজ ভালো হয়ে যাবে। কিন্তু সে তা করলো না। মেজাজ খারাপ থাক। শৈলীকে বুঝানো উচিত, সকালে চা দেরী করে দেয়া যাবে না। গোসল সকালের নাস্তা হাগামুতা সব পরে, আগে চা।

শৈলী বুঝলো কি বুঝলো না, সেটা জাহাঙ্গীর বুঝার আগেই শৈলী ঘরে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিলো। ভিতর থেকে হুহু কান্নার শব্দ। জাহাঙ্গীর রাগে চা না খেয়েই বের হয়ে গেল। ঘরের চেয়ে বাইরে শান্তি। গতরাতে এত তুলুতুলু করেও যেই মেয়ে এক কাপ চা আনতে দেরী করে, তার সাথে সংসার করা খুব কষ্টের কাজ। সেই মেয়ে আবার কথায় কথায় কান্না করলে আরেক সমস্যা।

রাস্তায় বের হয়ে একবার চিন্তা হলো, রফিকের বাসায় যাওয়া যায়। রফিক কি বাসায় আছে? নাকি অফিসে যাবে? এখন তো ওর অফিসের সময়। চাকরির ঝামেলা জাহাঙ্গীরের নেই। সে বিজনেস করে। সেই বিজনেস দেখে তার ভাগ্নেরা। কাকাও দেখে। মাসে মাসে বাসা ভাড়া আসে। গুদাম ভাড়া আসে। ব্যবসার টাকা আসে। খালি বাসা ভাড়া দিয়ে সংসার রাজার হালে চালানো যায়। বাকি টাকা ব্যাংকে পড়ে থাকে।

উল্টোপাল্টা এই সেই ভাবা, রাস্তার ধারে চা খাওয়া আর দুপুরে বিরিয়ানি আর বাদাম শরবত। তৃপ্তির ঢেকুর তুলে বাসায় এসে আবার মেজাজ বিগড়ে গেল জাহাঙ্গীরের। বাসাতে তালা মারা। শৈলী আবার চলে গিয়েছে। এই মেয়ে কথায় কথায় বাসা ছেড়ে চলে যায়। পাঁচ টাকা ভাড়া দিয়ে বাসে করে বাপের বাড়ি চলে যাওয়া যায়, তাই এত দেমাগ। মুন্সিগঞ্জে মাড়িরংক এলাকার তিনতলা বাসায় চলে গেলে এই দেমাগ কই থাকে, দেখা যাবে।

বাসায় ঢুকার ইচ্ছে হলো না জাহাঙ্গীরের। বাসায় ঢুকলেই এই সমস্যা, সেই সমস্যায় শৈলীকে ফোন দিয়ে নিয়ে আসা। আর বাসায় আনার জন্য বলবে না সে। নিজ ইচ্ছেতে আসলে আসবে, না আসলে নাই। কয়েকদিন স্বামীর সাথে রাতে ঘুমাতে না পারলে এই মেয়ের পেটের ভাত যে হজম হয় না, জাহাঙ্গীর তা জানে। একবার শৈলী চার দিনের জন্য চলে গিয়েছিলো। চারদিন পর একা একা বাসায় এসে জাহাঙ্গীরকে জড়িয়ে ধরে কান্না করতে করতে ঘুমিয়ে পড়লো। জাহাঙ্গীরকে কোলে করে ঘরে নিয়ে শৈলীকে শুইয়ে দিতে হয়েছিলো। সেই ঘুম সকালে এসে গিয়েছিলো রাত এগারোটায়।

এরকম কিছুই করতে হবে, মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলো জাহাঙ্গীর।

<<<<<<<<<<<<<<<<>>>>>>>>>>>>>>>>

রফিকের বাসাকে বাসা না, চারতলায় স্থাপিত ডাস্টবিন বলা যায়। এই ছেলের বাসায় একটা জিনিস দেখে গায়ে ঘিন ধরে গেল জাহাঙ্গীরের। ছোট একটা বাস্কেটে কয়েকটা কনডমের প্যাকেট পড়ে আছে। রফিক তার মানে বাসাতেও মেয়ে আনে।

রফিক ধোয়া গোল গোল করে ছাড়ছে। সিগারেট খাওয়ার সময় সে এভাবেই ধোয়া ছাড়ে। জাহাঙ্গীর স্মোক করে না। কিন্তু রফিককে দেখলে ওর স্মোক করার ইচ্ছে হয়।

‘ দোস্ত যতদিন থাকবি থাক। কোন সমস্যা নেই। সমস্যা একটা। ‘

‘ এই না বললি সমস্যা নেই? ‘

‘ সেটা না। আমার কিছু বন্ধু আসে, মাঝে মাঝে থাকে। রাতে একটু হইহুল্লোড় হয়। বিরক্ত হতে পারিস। ‘

‘ আমি বিরক্ত হবো না। ‘

‘ তাহলে থাক। আজ সিল্কি আসবে দোস্ত। ‘

‘ সিল্কি কে? ‘

‘ সিল্কি। শালা একখান চিজ। ও যখন নাচে, দেখে বিশ্বাস করতে পারবি না যে হারামজাদাটা হিজড়া। মনে হবে পুরা আয়েশা তাকিয়া। ‘

‘ হিজড়া মানে? ‘

রফিকের হাসি দেখে গা জ্বলতে থাকলো জাহাঙ্গীরের। এই শয়তানের সাথে থাকা যাবে না। যেই পুরুষ হিজড়ার সাথে রাত কাটায়, সে অনেক কিছুই করতে পারে।

‘ দোস্ত ভয় পেলি? ভয় পাস না। মজা করলাম। হিজড়া আসবে না। দোস্ত একটা টান দে, গাজা পুরেছি ভিতরে। ‘

‘ এসব আমি খাই না। ‘

রফিক আর সাধলো না, গাজা ভরা সিগারেট টানতে লাগলো। ধোয়ায় ঘর অন্ধকার হয়ে গেছে। জাহাঙ্গীরের থাকতে কষ্ট হচ্ছে। এই ঘরে রফিক কিভাবে থাকে?

‘ ভাবীকে তার মানে এবার উচিত শিক্ষা দিবি? তাই না? ‘

‘ সেটা আমার ব্যাপার। তুই গাজা খা। ‘

‘ শাস্তি যদি দিতে হয়, নিজেকে শাস্তি দে। তুই যখন নিজেকে কারোও জন্য মেরে ফেলবি,তখন সে তোর জন্য জনম জনম কান্না করবে। আমাকে দেখ। রোকেয়া এখনও আমার জন্য কান্না করে। শালী বাচ্চাকাচ্চা স্বামী রেখে আমাকে শান্ত করতে এখনও ছুটে আসে। আমি শান্ত না হলে যে আমি আবার খারাপ হয়ে যাবো! …… দুই সপ্তাহ ওর খবর নেই। দুই সপ্তাহে শালী একটা কল দেয় নি। শালী! আমাকে ভালোবাসে না একটুও! ‘

খিক করে হেসে হঠাৎ হু হু করে কান্না করতে লাগলো রফিক। জাহাঙ্গীর বিরক্ত হচ্ছে। নেশায় বুদ হয়ে আছে রফিক, বুঝা যাচ্ছে। এই হারামী এখনও তার মানে রোকেয়াকে ছাড়ে নি। রোকেয়ার জীবন তামা তামা করে দিয়ে এখনও রফিকের আশ মিটেনি।

হঠাৎ দরজায় কেউ একজন কড়া নাড়লো।

‘ দোস্ত দরজাটা খুলে দে। সিল্কি এসেছে। ‘

জাহাঙ্গীর ভয়ে ভয়ে দরজা খুললো। সিল্কি না, দাঁড়িয়ে আছে রোকেয়া। তার চেহারায় মনমরা ভাব স্পষ্ট। তার হাতে একটা হটপট। জাহাঙ্গীরকে দেখে সেও কিছুটা ভয় পেয়েছে। কিছুটা বললে ভুল হবে, অনেক ভয় পেয়েছে। ভয়ে মেয়েটার ঠোট লাল হয়ে গেছে। মেয়েরা লজ্জায় বা ভয়ে লাল হয়ে যায়। সেই লাল আভা ফুটে ওঠে গালে। এই মেয়ের ঠোটে ফুটে উঠে ব্যাপারটা। অদ্ভুত কাহিনী।

‘ জাহাঙ্গীর ভাই কেমন আছেন? ‘

‘ তুমি এখানে কি করতে? ‘

‘ রফিকের সাথে দেখা করতে আসলাম। ও আছে না? ‘

‘ আছে। ‘

রফিক চুপচাপ তাকিয়ে তাকিয়ে রোকেয়ার কাহিনী দেখতে লাগলো। হটপট খুলে খাবার ঠান্ডা করতে দিলো। ভাত, গরুর মাংস কালো করে ভুনা, আলু ভর্তা, ডাল, সামান্য ঘি পর্যন্ত এনেছে। ঘরের জানালা খুলে, ঘরটাকে আধা ঘন্টার মধ্যে বেহেশতখানা বানিয়ে ফেললো। ব্যাগ থেকে এয়ার ফ্রেশনার বের করে ঘরে ছিটালো। রফিককে তুলে বাথরুমে নিয়ে গেল। পিছনে পিছনে জাহাঙ্গীরও যাচ্ছিলো। রোকেয়া মানা করলো। রোকেয়া রফিককে গোসল করাবে।

গোসল শেষে নিজ হাতে খাবার বেড়ে দিলো রোকেয়া। মেয়েটা কাঁদছে। দৃশ্যটা দেখে জাহাঙ্গীরের খুব খারাপ লাগে। মেয়েটা বিয়ের পরেও লুকিয়ে রফিককে ঠিক রাখতে এসব করে। মাতাল রফিক কখনও কখনও রোকেয়াকে নিয়ে বিছানাতেও যায়। রোকেয়া মানা করতে পারে না। মানা করেছিলো প্রথমবার। সেইবার হাতের রগ কেটে বিতিকিচ্ছিরি অবস্থা। জাহাঙ্গীর এই সেই জায়গায় ছুটাছুটি করে সেইবারের মত বাচালো। কিন্তু রোকেয়ার মনে সেই যে ভয় ঢুকলো, সেই ভয় আজও কাটেনি। রফিক যেই সিল্কির কথা বলেছিলো, সেই সিল্কিই রোকেয়া। রোকেয়াই মাঝে মাঝে নাচ করে। রফিকের কথাতেই নাচে। দুই মেয়ের মা একটা আধামরা মানুষকে আধাবাচা রাখতে কত কষ্টই না করছে।

‘ জাহাঙ্গীর ভাই, মাংস কম এনে ফেলেছি। রফিক খেতে চেয়েছিলো, ওকে বেশিটা দিয়ে ফেলেছি। আপনাকে কিছু রান্না করে দেই? ‘

‘ আমি আলু ভর্তা দিয়েই খেতে পারবো। ‘

‘ কি বলেন? আচ্ছা দাঁড়ান আমি আপনার জন্য একটা ডিম ভেজে দিই। কড়া করে বেশি করে পিঁয়াজ মরিচ দিয়ে মোটা ডিম ভাজি। তাই না জাহাঙ্গীর ভাই? ‘

‘ তুমি বাসায় যাবে না? বাসায় স্বামী টেনশন করবে না? ‘

‘ আমার ডিভোর্স হয়ে যাচ্ছে জাহাঙ্গীর ভাই। আগে টেনশন হতো। এখন হয় না। বাচ্চার কাস্টাডিও মনে হয় পাবো না। ‘

‘ কি বল এসব? ‘

‘ স্বামীকে ঠকিয়ে আর কয়দিন? বাচ্চাগুলোকেও ঠকাচ্ছি। একজন আজও জানতে পারলো না যে ওর আসল পিতার নাম রফিক। ‘

কান গরম হয়ে গেল জাহাঙ্গীরের। রোকেয়া নির্লিপ্ত ভঙ্গীতে রান্নাঘরে চলে গেল। কিছুক্ষন পর ভেতর থেকে রোকেয়া কথা বলে উঠলো, ‘ জাহাঙ্গীর ভাই, একটা ডিম নিয়া আসেন। ডিম নেই। ‘

জাহাঙ্গীর বাসা থেকে বের হয়ে গেল। এই বাসায় সে আর কোনদিন ঢুকবে না। তার বুক ফেটে কান্না আসছে। ঠিকানাহীন কিছুক্ষন হাঁটাহাঁটি চালালো জাহাঙ্গীর। শৈলীর কথা খুব মনে পড়ছে। এখন শৈলীর কথা ভাবা ঠিক হচ্ছে না। শৈলীর উপর থেকে রাগ চলে যাচ্ছে, মায়া ভর করছে। লক্ষণ ভালো না।

কিছুদুর হেঁটে সামনে জুম্মনবাড়ি। এইদিক সেইদিক কিছু না ভেবে জাহাঙ্গীর ভিতরে ঢুকলো। রাস্তার এই জায়গা সেই জায়গায় রিকসা দিয়ে ব্যারিকেট দিয়ে রাখা। এই এলাকায় রফিকের সাথে একবার সে এসেছিলো। ওই শেষবার। আজ কেন ঢুকছে সে? সে কি শৈলীকে শাস্তি দিতে চায়? একটু আগে তার কথা ভেবে না জাহাঙ্গীরের খারাপ লাগছিলো?

কিসের খারাপ? দিন দিন এই সমস্যা সেই সমস্যায় জাহাঙ্গীর জর্জরিত। জীবনে আনন্দ নেই। ওর না আছে টাকার অভাব, না আছে কোনও সমস্যা। তবুও সে অসুখী। জাহাঙ্গীরের সুখ চাই। সে আজ এখানে থাকবে। আগামী এক সপ্তাহ এখানে থাকার চিন্তাভাবনা মাথায় ঘুরছে।

‘ ভাইসাব কি নতুন? কিছু লাগবে নাকি? ‘

বিশাল ভুড়িওয়ালা লোকটা লাল লাল দাঁত দিয়ে কেলিয়ে হাসলো। জাহাঙ্গীরের গায়ে রিরি দিয়ে উঠলো।

‘ চুসত মাল আছে! লাগবো নাকি? ‘

‘ জ্বি লাগবে। ‘

‘ ওরে রসের নাঙ্গর! জ্বি লাগবে! বাসায় বউ বাচ্চার লগে খিস্তি মাইরা আসছো নাকি? ‘

লোকটার কথাবার্তা খুব অশালীন ভঙ্গীমায়। এই লোক যদি কাউকে বলে, ভাই ভালো আছেন, সেখানেও অশালীনতা থাকবে।

‘ কয় টিপ মারবা? ‘

‘ জ্বি? ‘

‘ ঘন্টা না দিন? ‘

‘ সপ্তাহ। ‘

‘ ইয়া আল্লাহ! কও কি? ‘ লোকটার মুখ দিয়ে লাল লাল লালা ঝরে পড়লো।

‘ এক সপ্তাহের মত থাকার ব্যবস্থা হবে? ‘

‘ ভিতরে থাকবা? নাকি নিয়া যাবা? ‘

‘ আমি থাকবো এখানে। ‘

‘ মাশাল্লাহ! আমার লগে আসো …… ‘

জাহাঙ্গীর লোকটার পিছনে পিছনে যাচ্ছে। তার মাথায় ঝিম ঝিম করছে। সে কি করছে? যা করছে তা কি সে নিজে করছে? নিজে না করলে কে করাচ্ছে? কেন করাচ্ছে?

এক জায়গা থেকে একটা অদ্ভুত গান ভেসে আসছে। ‘ আমার রসে ভরা যৌবন তোর লাইগে জমায়ছি! তুই গিলে খাবি কি, না তুই চুষে খাবি কি …… ‘ কথা শুনে মাথার তার ছিড়ে যাওয়ার উপক্রম। এইসব গান কে লিখে, আর কে গায়? এই কে গুলোকে একদিন নিজ চোখে দেখা দরকার।

দুইতলা বাসার সিড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেছে জাহাঙ্গীর। সে এবার রীতিমত কাঁপছে। তার এখানে আসাটা ঠিক হয় নি। শৈলীকে সে শাস্তি দিতে এখানে এসেছে। শাস্তি পাওয়ার কথা তার। শৈলী কেন শাস্তি পাবে? সে তো কিছু করে নি! জাহাঙ্গীর এই সব কি করছে?

‘ মাল কত আনছো? ‘

‘ কত লাগবে? ‘

‘ ওরে বাপরে! কত লাকবে! কত আছে? ‘

‘ আচ্ছা আমি যদি এখন বাসায় চলে যেতে চাই তো …… ‘

‘ হাওয়ার নাতি, ফাইজলামি করস? ‘

‘ পাঁচ হাজার আছে। এখন চলবে না? ‘

জাহাঙ্গীর পকেটের পাঁচ হাজার লোকটার হাতে তুলে দিলো। লোকটা টাকা নিয়ে সেখান থেকে চলে গেল। জাহাঙ্গীর ভয়ে ঘামছে। সে বেঘোরে কি করছে!

‘ ম্যাডাম ফ্রি আছে। ভিতরে যান। ‘

‘ কোন ম্যাডাম? ‘

‘ ভিতরে যান। বলদার মত কথা বলেন ক্যান? ভিতরে যান। ‘

জাহাঙ্গীর ভিতরে গেল। বাইরে সদরঘাট, ভিতরে ফিটফাট। রাজার বাড়ির মত ঝকমক করছে সব। সবকিছুর মাঝে একটা সোফা। ঘরের মাঝখানে সোফা রাখার ব্যাপার এই প্রথম দেখলো জাহাঙ্গীর। সে এবার মাথা ঘুরে পড়ে যাবে যাবে অবস্থায় আছে। সোফায় একটা মেয়ে বসে আছে। মেয়েটাকে সুন্দর বললে সুন্দরের অসম্মান হবে। পুরো ঘর আলো হয়ে আছে মেয়ের রূপে। জাহাঙ্গীর সামান্য কাঁপানো থামাতে পেরেছে। কিন্তু কাঁপুনি আবার ফেরত চলে এলো।

‘ কি নাম? ‘

‘ জা… হাঙ্গীর। ‘

‘ এখানে আসেন। বসেন। দুইটা গল্প করি। ‘

মেয়ের ঠোট টকটকে লাল। সে হাতের ইশারায় জাহাঙ্গীরকে ডাকলো। জাহাঙ্গীর রোবটের মত মেয়েটার সামনে গিয়ে বসলো।

‘ আমার নাম শান্তি। শান্তি বিলাই আমি। ‘

‘ জ্বি। ‘

‘ কাছে আসেন। ‘

‘ না ঠিক আছে। ‘

শান্তি নিজেই কাছে এসে বসলো। হুট করে সরে বসতে গিয়ে শান্তির বুকের আচল খুলে মাটিতে পড়ে গেল। শান্তি সেদিকে ঘুরেও তাকালো না।

হঠাৎ শান্তি জাহাঙ্গীরের কানে কানে সুর করে গাইতে লাগলো, ‘ ও তুই গিলে খাবি কি …… ‘

জাহাঙ্গীরের হার্ট বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। সে শৈলীর কথা ভাবছে। শৈলী আজ সকালে খুব খুশি ছিল। কলাপাতা রঙের শাড়ি পড়ে তার সামনে এসেছিলো।

‘ চল…… ঘরে চল। আজকে আমি তোমার ঘাম আমার সাড়া গায়ে মাখবো। আসো। ‘

‘ না। ‘

‘ লজ্জা পেয়ো না। আসো। ‘

‘ আমি বাসায় যাবো। …… আ আমি আপনার লোককে পাঁচ হাজার দিয়েছি। ওটা রেখে দিন। ‘

‘ কি হলো? আমাকে দেখে সুন্দর লাগছে না? তুমি যেভাবে বলবা আমি সেভাবেই সাজবো। আমি সব খুলে ফেলি। তুমি আমাকে সাজাও। ‘

‘ ছি ছি! আমি চলে যাবো। থাকবো না আমি! ‘

‘ সমস্যা কি তোর । বাল ছাড়া বাচ্চার মত করস ক্যান? ক্যারা উঠসে তোর, ক্যারা? ‘

‘ আপনি ওই পাঁচ হাজার রেখে দিন। ‘

জাহাঙ্গীর সাথে সাথে উঠে দাঁড়ালো। শান্তির মনে অশান্তির আগুন জ্বালিয়ে দিয়ে জাহাঙ্গীর বের হয়ে গেল। এক দমে সে হাঁটতে হাঁটতে এলাকার বাইরে বের হয়ে এসেই হড়হড় করে বমি করে দিলো। তার চোখে মুখে অন্ধকার। সে হাউমাউ করে কান্না করতে লাগলো। রাস্তার কুকুরগুলো জিব বার করে কিছুক্ষন তা দেখলো।

জাহাঙ্গীর খুব কষ্ট করে একটা রিকসা নিলো। রিকসা ভাড়া তার কাছে নেই। সে শুন্য। সব টাকা খরচ। বাসায় গিয়ে আলমারি থেকে ভাড়া দেয়া ছাড়া উপায় নেই। জাহাঙ্গীর বাচ্চাদের মত কান্না করছে। সে শৈলীকে আজকেই নিয়ে আসবে। শৈলীর সামনে কানে ধরে উঠবস করবে। দরকার হলে পায়ে পড়বে।

‘ ভাইজান কি অসুস্থ্য? পানি খাইবেন? ‘

‘ আছে? ‘

‘ সিটের নিচে। রিকসা থামাইয়া নেই? ‘

‘ আচ্ছা। ‘

রিকসা থামিয়ে রিকসাওয়ালা জাহাঙ্গীরকে এক বোতল পানি দিলো। পানি দিয়ে জাহাঙ্গীর কুলিকুচি করলো। মুখে মাথায় পানি দিল। রিকসাওয়ালা কি মনে করে জাহাঙ্গীরের পিঠে হাত বুলাতে লাগলো। জাহাঙ্গীরের এখন আরাম লাগছে। সে খুব ভালো বোধ করছে।

রিকসা থেকে বাসার সামনে নেমেই চোখ বড় বড় হয়ে গেল জাহাঙ্গীরের। বাসার ভিতর আলো জ্বলছে। ভিতরে শৈলী আছে। সে রিকসাওয়ালাকে দাঁড়াতে বলে ভিতরে গেল। কলিং বেল বাজাতেই শৈলী দরজা খুলে দিল।

‘ কোথায় ছিলে সারাদিন? ‘

‘ একটা পাঁচশো টাকার নোট দাও। রিকসা ভাড়া দিবো। ‘

‘ ভাংতি টাকা আছে। দিবো? ‘

‘ পাঁচশো টাকা ভাড়া দিবো। রিকসাওয়ালা আমার খুব উপকার করেছে। ‘

‘ তুমি বসো। আমি রিকসাভাড়া দিয়ে আসি। ‘

জাহাঙ্গীর বসলো। শৈলী বাইরে চলে যেতেই জাহাঙ্গীর রান্নাঘরে গিয়ে ঢুকে, চাপাতি চিনি সব ফেলে দিলো। পরক্ষনেই ভাবলো, চিনি ফেলাটা ঠিক হয় নি। চিনি অন্য কাজেও লাগে। আবার ভাবলো, চা পাতি রেখে দিলে ভালো হতো। মেহমানদের চা করে দেয়া যেত।

‘ তুমি রান্নাঘরে কেন? চা খাবে? ‘

জাহাঙ্গীর ঘুরে দাঁড়ায়। শৈলী অবাক চোখে জাহাঙ্গীরের দিকে তাকিয়ে আছে। জাহাঙ্গীর ভ্যা ভ্যা করে কান্না করতে শুরু করলো। বাচ্চাদের মত ভাঙা ভাঙা পায়ে সে এগিয়ে এলো শৈলীর দিকে। শৈলীকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলো। সেই কান্না থামানোর সাধ্য কারও নেই। শৈলীরও নেই। সে স্বামীর কাঁধে মাথা রেখে, স্বামীর পিঠে হাত বুলিয়ে স্বামীকে থামাতে গিয়ে শৈলী নিজেই কান্না করে দিলো। ঘর এখন কান্নাকাটিতে একাকার।

লেখাঃ আবির আহম্মেদ পিয়াস

স্মৃতিগুলো খেলা করে

Post ID # 012

আমি এখন যে মেয়েটির পাশে বসে আছি তার নাম নিনিতা। নিনিতার পরনে বিয়ের সাজ। এই বিয়ের সাজ নিয়ে নিনিতা একটু পরপর হাতে থাকা টিস্যু পেপার দিয়ে চোখ মুসছে। সম্পর্কের ৪ বছরে একটি দিনেও এই মেয়েকে আমি কাঁদতে দেখিনি। আজ কাঁদতে দেখে বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
.
আমি চোখে গোল গোল সাইজের দুটা চশমা ঝুলছে। চশমা গ্লাসের ফাঁকে নিনিতার চেহারাটা কেমন যেন অস্পষ্ট। আমি হাত দিয়ে চোখ মুছলাম। নিনিতা রেগে তাকালো
.
– উফফ প্লিজ তুমি আবার ভ্যা করে ছেড়ে দিয়ো না
.
ধমকের সুরে বলল নিনিতা। পরক্ষনেই চোখের কোনে জল মুছলো। আমি চোখ থেকে হাত সরালাম। নিনিতার সামনে কাঁদা যাবে না। এই মুহুর্তে অজস্র স্মৃতি মস্তিষ্কে ঘুরছে। একটা স্মৃতি বড্ড বেশি স্পষ্ট।
.
কোন একটা খারাপ সময়ে দুজন দুজনকে সামলাতে গিয়ে প্রেমে পরে গিয়েছিলাম দুজন। প্রেমে রাগ/ঝগড়া/অভিমানের পর্ব চুকিয়ে এক রাতে আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম দেখা করব। ক্লাস ফাকি দিয়ে ড্যাট নিনিতার একদম পছন্দ না
_”ক্লাস সেরে তবেই আসবে”_ রাগিরাগি কন্ঠে সেইদিন বলেছিল নিনিতা
.
সে রাতে গল্প বুনতে বুনতে ঘুমিয়েছি শেষ রাতে। ঘুম ভেঙ্গে দেখলাম ক্লাস শুরু হতে মিনাট ২০ এক বাকি। হুরমুর করে ছুটলাম পেটে কিছু না দিয়েই। ক্লাস শেষে বের হয়ে দিলাম ছুট। সময় গড়িয়েছিল অনেক। পাক্কা ২০ মিনিট দেরিতে হাজির হয়ে দেখলাম কিছু দূরে নিনিতা দাড়িয়ে। সকাল থেকে শরীরের ক্লান্তি গুলো নিমিষেই দূর হলো নিনিতার কাজল দেয়া চোখের দিকে তাকাতেই। আমি যখন মায়াবী মেয়েটির মায়াতে হারাচ্ছিলাম তখন ই চোখ নাচিয়ে কিছু দেখালো নিনিতা। টিফিনে করে বানিয়ে আনা নাস্তা
.
– সকালে না খেয়ে ক্লাসে ছুটেছিলে?
.
উপর নিচ মাথা দুলালাম আমি। নিনিতা নাস্তা বাড়িয়ে চোখ রাঙ্গিয়ে তাকালো। ঐ রাঙ্গানোর অর্থ বুঝি আমি , “এখন ই সব শেষ করতে হবে”
.
ভালোবাসা বলতে তখন টিভি নাটকেই দেখেছি। প্রথম বারের মতো অনুভব করলাম। এই অনুভবে আমার যত সমস্যা। চোখ ঝাপসা হয়ে এলো। আমি চোখ মুসতেই নিনিতা চোখ রাঙ্গিয়ে বলল
.
– ক্যান্দো রাম , কাঁদে না।
.
প্রচন্ড খামখেয়ালী অলস ছেলেটি জীবন নিয়ে হুট করে সিরিয়াস হয়ে গেল কারো সংস্পর্শে । এমন কারো স্পর্শ যাকে ছাড়া একটা সময় ভাবতাম আমি অস্তিত্বহীন। নিনিতা এসব মানতে নারাজ, বাঁচতে হবে ।
.
ক্যান্দো রামের চোখে কাঁন্না আসতে চাইলো, আমি দিচ্ছি না। ঘড়ির দিকে তাকালাম। ৬ টা বাজছে, সন্ধা এখন। আজ নিনিতার বিয়ে।
.
ব্যাগে থাকা কিছু একটা বের করতে নিলো নিনিতা। ছোট্ট একটা টিফিন বক্স। পরিচিত ঘ্রাণ।আমার দিকে বাড়িয়ে ধরলো বক্সটি। আমি নিনিতার চোখে তাকাতে পারছিনা
.
– এখন ই শেষ করবে । সময় নেই
.
সময় আসলে টুপ করে শেষ হয়ে যায়। প্রতিবার ই ঘুরতে বের হলে বাহানা ধরতাম আমি। দুই চার পাঁচ মিনিট যদি আরো থাকায় যায়… ঘন্টা তিন পার হলেও , “সবে তো এলে, আরো কিছুক্ষণ?” বলতাম আমি। আমার কথায় হাসতো নিনিতা। ঐ হাসির দিকে তাকিয়ে বাকি টা সময় কিভাবে কিভাবে যেন শেষ হয়ে যেত ।
.
খাবার গুলো ভিতরে যাচ্ছে না। নিনিতার দিকে তাকালাম। চোখ দুটো লাল। দ্বীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবলাম সময়টা যদি ধরে রাখা যেতো!
.
নিনিতা চোখ মুছে আমার দিকে তাকালো।
.
– আমাকে যেতে হবে
– হুম
– যাওয়ার পর পাগলামো করবে না তো?
.
মাথা দুলালাম আমি। নিনিতার কন্ঠ জড়িয়ে আসছে। নিজেকে সামলে বলল নিনিতা
.
– শোন যেমনটা রেখে যাচ্ছি একেবারে তেমনটাই থাকবে ।
– থাকতে হবে কেন?
– আমি হচ্ছি বাড়ির বড় মেয়ে। বাড়ির বড় মেয়ের বিয়ের পর তার প্রেমিক এইভাবে না থাকলে লোকে কি ভাববে?
.
নিনিতার কথায় হাসলাম আমি। নিনিতার ঠোটে হাসি চোখের কোনে জল। কাঁপা কাঁপা কন্ঠ বলল নিনিতা
.
– হাটার সময় একদম শব্দ করবে না।
.
আমার হাটা নিনিতার যতো রাগ ছিলো। একটুও শব্দ করা যাবে না। নিনিতার কানে অদৃশ্য শক্তি আছে। হাটার মাঝে কথা বলার সময় কথা থামিয়ে বলত নিনিতা
.
– এই তুমি শব্দ করে হাটছ কেন?
আচমকা দাড়ালেই বলত
– এই তোমাকে দাড়াতে বলেছি?
পা টিপে টিপে হাটা ধরতাম ফের। নিনিতা কথা থামিয়ে ফের বলত
– এই তুমি চোরের মতো হাটছ কেন?
.
স্মৃতিগুলো ঘুনোপোকাড় মতো আঘাত করবে জানি। তবুও কাঁদা যাবে না। আজ নিনিতার বিয়ে। ভালোবাসাটা দুজনের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকে না। অন্যদের কাঁদিয়ে আমরা আজ হাসতে পারতাম হয়তো। চাইনি দুজনের কেউ সেটি। অন্যেদের হাসি বড্ড বেশি দামি তার চেয়ে।
.
নিনিতার পাশে হাত ধরে হাটছি। জানি ফের ঐ হাত ধরার অধিকার থাকবে না কখনো। নিনিতার হাতে টুংটাং রেশমী চুড়ি বাজছে। সম্পর্কে শুরুতে দেয়া সেই চুড়ি গুলো। নিনিতা একবার বলল তার হরেক রঙের রেশমী চুড়ি চায়। একদিন হুট করে নিয়ে হাজির হলাম। সেইবার বেগুনী রঙের চুড়ি ভেঙ্গেছি বলে তার সেই কি রাগ ! সেই চুড়ি গুলো বড্ড বেশি যত্ন করে রেখেদিয়েছে। আগা গোড়া সেজে থাকা মেয়েটার হাতে রেশমী চুড়িগুলো তে মায়া জড়িয়ে আছে। টুংটাং শব্দে স্মৃতিগুলো খেলছে …
.
সেইদিন নিনিতাকে বিদায় দেয়ার সময় তার চোখের দিকে তাকাইনি। সেইদিন তাকালে আজ দাঁড়াতে পারতাম না হয়তো। আমার চোখে ঝুলে থাকা গোল চোশমার ফাকে আকাশের দিকে তাকালাম। আমার আকাশটা আজো ঝাপসা হয়ে এলো। পকেটে থাকা মানিব্যাগ থেকে নিনিতার সেই দিনের টিস্যু পেপার বের করলাম। টিস্যু পেপারে সেইদিন নিনিতার কাজল দেয়া চোখের পানি শুকিয়ে গেছে ঠিকই তবে শুকনো কাজল স্মৃতি হয়ে রয়ে গেছে । আচ্ছা নিনিতার হাতে সেইদিনের রেশমি চুড়ি গুলোতে কি আজো টুংটাং শব্দে স্মৃতিগুলো খেলা করে??….
.
.
[] আশরাফ মামুন []

প্রিয়ন্তি

Post ID # 010

প্রিয়ন্তির দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছে বহু বছর পর পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্যটি দেখছি। আমার পাশে প্রিয়ন্তি ঘুমিয়ে আছে। কত নিশ্পাপ তার চেহারা! প্রিয় মানুষটার ঘুমন্ত চেহারাটি ভিষণ মায়াভরা হয়। প্রিয়ন্তির চেহারার সে মায়া আমাকে আচ্ছন্ন করে ফেলল। একটা সময় ছিলো রোজ ভোরে উঠে প্রিয়ন্তির পাশে বসে থাকতাম। তার চেহারার দিকে তাকিয়ে ভাবতাম , এটা কি স্বপ্ন নাকি বাস্তবে প্রিয়ন্তি আমার পাশে? সত্যি বলতে কি ! ভাবার পিছনে কারণ ছিলো , বছর পাঁচ এক আগেও প্রিয়ন্তিকে কল্পনা করা যেতো না । আমি একটা দ্বীর্ঘশ্বাস ফেলে বাহিরে তাকায় , ভোরের আলো ফুটছে । প্রিয়ন্তি তখনো ঘুমিয়ে । আচ্ছা প্রিয়ন্তি কি কখনো আমার রোজ ভোরে উঠা এই পাগলামো খেয়াল করেছিল? নিজের কাছে প্রশ্নটি করে নিজেকে বোকা মনে হয় আজকাল। মাঝে মাঝে নিজের কাছে এমন অনেক প্রশ্ন করি এখন।
.
প্রিয়ন্তি আনমোড়া দিলো , শীত পড়ছে রুমটিতে। জোড়সড় হয়ে শুয়ে আছে প্রিয়ন্তি । আমি লেপটা এগিয়ে প্রিয়ন্তির শরীরে জড়িয়ে দেই। প্রিয়ন্তির চুলগুলো তার চোখের উপরে এসে পড়ে। একটা মেয়ের চেহারায় এত মায়াভরা হয় কিভাবে! ভেবে পাই না আমি। প্রিয়ন্তির চোখের উপর ছড়িয়ে থাকা চুলগুলো আমি আলতো ভাবে সরিয়ে দেই , কপালে চুমু এঁকে উঠে দাড়ায়। ততক্ষণ বাহিরে ভোরের আলো ফুটে গেছে ।
.
আজ বিশেষ একটি দিন । সময় অনেক গড়িয়েছে । এতদিন পর প্রিয়ন্তি কি মনে রেখেছে সেই কথা?
.
প্রিয়ন্তির সাথে প্রথম পরিচয়টা হয় ক্লাস সিক্সে। ছোটছোট চুলে ফ্রক পড়ে আসতো মেয়েটি। আমি অবশ্য বড় ছিলাম কয় ! হাফ হাতা শার্টে কোমড়ের উপর অবদি প্যান্ট পড়াতো মা। তখনকার ছবি দেখে আনমনে আজো হাসি আমি। আমি যখন সেবার স্কুলে গেলাম তখন পিটি শুরু হয়েছে । কোন রকম সুযোগ বুঝে লাইনে দাঁড়িয়ে গেলাম। প্রিয়ন্তি পারল না , স্কুল সমাবেশ যখন শেষ তখন প্রিয়ন্তির আগমন । চেহারা কাচুমুচু করে গেইটে দাঁড়িয়ে ছিলো মেয়েটি। সমাবেশে যোগ না দেয়ায় ম্যাডাম যখন বকছিল তখন প্রিয়ন্তির চোখে জল ! অদ্ভুত লাগে এখনো। সম্পূর্ন অপরিচিত একটি মেয়ের চোখে জল দেখে সারাটা ক্লাস মন খারাপ ছিলো আমার ।
.
ক্লাসে বাকপটু ছেলেটা প্রিয়ন্তিকে দেখলেই চুপ হয়ে যেতাম। প্রথম দেখার দিন ছুটির পরের কথা আমার আজো মনে পরে , প্রিয়ন্তি যখন বিকেলে বাড়ি ফিরছিলো আমি তখন তার পিছুপিছু হাটতে লাগলাম। প্রিয়ন্তি প্রথমে কিছু বলেনি পরে যখন লক্ষ করল তখন অবাক হয়ে তাকালো।
.
_ এই ছেলে তোমার বাসা এইদিকে? _ চোখ নাচিয়ে জানতে চাইল প্রিয়ন্তি । আমি থতমত খেয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম । মুখে থেকে কথা বের হচ্ছে না। আমার দিকে তাকিয়ে প্রিয়ন্তি তখন উত্তরের অপেক্ষায়। আমি তখন কিছু না বলে , পিছন ফিরে হাটতে লাগলাম। অনেকটা দৌড়ানোর মতো। প্রিয়ন্তি তখন পিছন থেকে ডেকেই যাচ্ছে
– এই ছেলে এই …
স্মৃতিগুলো বড্ড বেশি স্পষ্ট । ভাবতে গেলে আনমনে হাসি চলে আসে
.
ঢিং ঢং ঢিং !!
.
দেয়াল ঘড়ির এলার্মে বেজে উঠল। সকাল ৭ টা বাজছে। আমি রান্না ঘরে দাঁড়িয়ে । আচ্ছা, প্রিয়ন্তি কি আমার হাতে চা দেখলে অবাক হবে? আজ দিনটিতে প্রিয়ন্তিকে চমকে দিতে চাই আমি।
.
রুমের দরজা লাগিয়ে রেখে গিয়েছিলাম আমি। চা হাতে নিয়ে দরোজা খুলতেই দেখলাম প্রিয়ন্তি উঠে বসেছে। তার হাতে ফোন , কি দেখে হাসিছিল যেন! আমাকে দেখে ফোন একপাশে রেখে অবাক হয়ে তাকালো। তার অবাকের কারণ আমি জানি। আজ অনেকদিন পর তার সকালটা শুরু হচ্ছে আমার হাতের চা দিয়ে। হাসলাম আমি , আমাকে দেখে প্রিয়ন্তির ঠোঁটেও হাসির রেখা ফুটল। প্রিয়ন্তির ঠোট বড় একটা তিল। সেই তিলটি তার হাসির সৌন্দয্য হাজার গুণে বাড়িয়ে দেয়।
.
আমি সামনে গিয়ে চায়ের কাপ বাড়িয়ে দেই দিকে । প্রিয়ন্তি হেসে নেয় । বাহুতে জড়িয়ে ধরে কপালে চুমু দেই আমি। প্রিয়ন্তির চেহারায় তখনো হাসির রেখাটা রয়ে যায়।
.
– আজ অফিসে নেই? _ প্রিয়ন্তি জিগেস করে । উত্তরে হাসি আমি। অফিস আজ ছুটি । বিশেষ দিনটির কথা মনে করিয়ে দেবো কিনা ভাবলাম একবার। পরক্ষণেই সে চিন্তা বাদ দিতে হলো। অনেক দিন প্রিয়ন্তিকে সারপ্রাইজ দেয়া হয় না !
.
– কি রে কোথায় হারিয়ে গেলে? _ আমার চোখের সামনে হাত নাড়িয়ে জানতে চায় প্রিয়ন্তি।
.
– তোমাকে কেউ বলেছিল ঘুম থেকে উঠার পর তুই পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর মেয়েটি। !!
.
– তুমি কি তোমার বউয়ের সাথে ফ্লার্ট করবে অভ্র? ভুর কুচকে জানতে চায় প্রিয়ন্তি পরক্ষনে হেসে দেয়
.
– বুড়ো হয়ে গেলেও আমি ফ্লার্টিং করব তোমার সাথে _ প্রিয়ন্তির পাশে বসতে বসতে বলি আমি
.
প্রিয়ন্তি চায়ের কাপে চুমুক দেয় , আমি তাকিয়ে থাকি। আচ্ছা , এ মেয়ের মধ্যে এমন কি মায়া আছে যা আমাকে আচ্ছন্ন করে রাখে?
.
প্রিয়ন্তির সাথে বিয়ে হয়েছে আজ তিন বছর হতে চলল। বিয়ের পর প্রিয়ন্তি আর আমি দুজনকে তুমি করে বলি। এটা প্রিয়ন্তির ইচ্ছে । অথচ আমার “তুই” করে বলতাম।
.
– প্রিয়ন্তি
.
– হুম
.
– তোমার আলমারীতে একটা ড্রেস রাখা আছে । ফ্রেস হয়ে নাও। নাস্তা সেরে রেডি হবে । আজ সারাদিন ঘুরব আমরা।
.
– তোমার কি হযেছে অভ্র?
.
– কি হবে?
.
– এইতো সকাল সকাল উঠলে , চা বানিয়েছ। ঘুরার প্ল্যান। এসব কেন?
.
– এমনিতেই _ হেসে বলি আমি। যা বলেছি করো। প্রিয়ন্তিকে আর কিছু না বলে দাঁড়িয়ে থাকে । আমি উঠে দাঁড়ায় । প্রিয়ন্তি নিশ্চয় কার্ভাড খুলে সেখানে থাকা গিফট গুলো দেখে অবাক হবে !

[]
.
আকাশে মেঘ ডাকছে । বোধহয় বৃষ্টি নামবে ! স্কুলে থাকতে খুব ভিজতাম আমরা। প্রিয়ন্তির সাথে তখন অল্পস্বল্প কথা হতো। একবার ঝুম বৃষ্টি , ছাতা না নেয়ায় স্কুলে যাওয়ার পথে দাঁড়িয়ে ছিলাম গাছের নিচে। মাঝ পথে প্রিয়ন্তি স্কুলের পথে যেতেই আমাকে দেখে থামল । সত্যি বলতে , প্রিয়ন্তিকে দেখলেই আমি একটি জড়তায় আটকে যেতাম । প্রিয়ন্তি পাশে এসে দাঁড়াল
.
– দাঁড়িয়ে আছ কেন?
.
– আমি তোতলাতে তোতলাতে বললাম বৃষ্টি ।
.
আমার তোতলানো দেখেই বোধহয় হাসল প্রিয়ন্তি। চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলাম আমি । নিজের উপরই রাগ হচ্ছিল খুব । সে কি বাঘ না ভালুক যাকে দেখে তোতলাতে হবে !
.
– ভেতরে এসো … ছাতি দেখিয়ে বলে প্রিয়ন্তি । আমাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ব্যাগ হাতে টান দেয় সে। আমি কাচুমুচু মুখ করে একই ছাতিতে ঠাই নেই। সেদিন যাওয়ার পথে আমার দিকে তাকিয়ে মুখ টিপে হাসছিল প্রিয়ন্তি। আমি আড় চোখে তাকিয়ে ছিলাম ।
.
– অভ্র __
উপরের রুম থেকে প্রিয়ন্তি ডাক দেয় । আমি নাস্তা টেবিলে সাজিয়ে উপরে উঠি। ডাইনিং রুম থেকে তখন খিচুরীর ঘ্রাণ আসছে । খিচুরী খুব পছন্দ প্রিয়ন্তির ।
.
রুমে ঢুকেই কিছুক্ষণ তাকিয়ে ছিলাম প্রিয়ন্তির দিকে । পড়নে নীল শাড়ি কপালে নীল টিপ। চোখে কাজল দেয়া । নিজেই নিজের ছবি তুলছিল । তুলে মোবাইলটা কিসব লিখল । আমি দরোজায় কড়া নাড়তেই চমকে তাকালো । হাসলাম আমি , প্রিয়ন্তিও হাসছে
.
– ভয় পাইয়ে দাও তুমি !
.
– আমি কি করলাম?
.
– কড়া নাড়তে হয়?
.
– তুমি ছবি তোলায় ব্যাস্ত ছিলে।
.
প্রিয়ন্তি চুপ হয়ে যায় । আয়নায় নিজেকে দেখে । আমি প্রিয়ন্তির দিকে তাকিয়ে ভাবি , স্রষ্টার সবচেয়ে সুন্দর সৃষ্টিটি আমার পাশে দাঁড়িয়ে ।
.
– কি দেখছ তুমি?
.
– তোমার কপালের টিপ
.
– উফফ বলো না এটা বাঁকা হয়েছে। আমি যেমনটা দেখছি ঠিক ই আছে । _ আহ্লাদি কন্ঠে বলে প্রিয়ন্তি । আমি হাসি , প্রত্যেকবার প্রিয়ন্তি কপালের টিপ ঠিক জায়গাতেই বসায় । আমি তাকে রাগাতেই বলি ঠিক জায়গাতে নেই টিপ । বলার পর প্রিয়ন্তির আহ্লাদি কন্ঠে , “ঠিক করে দাও” শুনতে আমি রোজ এমন মিথ্যে বলতে রাজি।
.
প্রিয়ন্তি কাছে এসে দাঁড়ায় । হাতে নতুন নীল টিপ।
.
– নাও , ঠিক করে লাগিয়ে দাও
.
আমি প্রিয়ন্তির হাত থেকে টিপ নিয়ে লাগিয়ে দেয়। প্রিয়ন্তির কাজল দেয়া চোখ দুটোই নিজেকে দেখার চেষ্টা করি। প্রিয়ন্তি হেসে বলে ,
– কি দেখছ?
.
– আমাকে , _ চোখ অন্য দিকে সরিয়ে বলি আমি । প্রিয়ন্তি নিজকে আমার থেকে সরিয়ে নিয়ে হাসে
_ ঢং _ বলেই ড্রেসিং টেবিলের দিকে ফিরে প্রিয়ন্তি । আমি পকেট থেকে থেকে প্রিয়ন্তির পছন্দের ফুলের মালাটি বের করে খোপায় লাগিয়ে দেয়
.
আয়নায় প্রিয়ন্তির অবাক হওয়া চেহারা দেখে বুকের ভিতরে কোথাও যেন হুহু করে উঠল।
.
তখন প্রিয়ন্তি খুব ভাল বন্ধু হয়ে উঠেছে। আমার বন্ধুর জগত বলতেই প্রিয়ন্তি । স্কুলের বিশাল অনুষ্ঠান । সে অনুষ্ঠানে প্রিয়ন্তির নাচার কথা । প্রিয়ন্তি ভাল নাচতে জানতো । সত্যি বলতে , প্রিয়ন্তি প্রোগ্রামে নাচবে শুনে ভেতর থেকে আমি উচ্ছিসিত ছিলাম । আমার সব উচ্ছাস পানসে হয়ে গেলো প্রিয়ন্তি কালো মেঘের মতো হয়ে থাকা মুখটি দেখে
.
– কি রে বসে আছিস যে ! অবাক হয়ে বললাম আমি
.
– উফ কথা বলিস না তো অভ্র । আমি কিছুই করব না
.
– করবিনা মানে কি? তুই নাঁচছিস না আজ?
.
– উহু
.
তখন সবে এইটে উঠেছি। প্রিয়ন্তির প্রতি গভীর টান অনুভব করতাম। তার ঝগড়া হলে মন খারাপ হতো। স্কুলে না এলে অস্থিরতায় কাটাতাম দিনটি । সেদিন প্রিয়ন্তির চোখে জল দেখে খারাপ লাগল খুব। কিছু না বলে উঠে এসে খোঁজ নিলাম । প্রিয়ন্তির নাচের কস্টিউমে বেলী ফুলের মালা খোঁপায় থাকবে । প্রিয়ন্তি যে ফুল এনেছিল তা চুরি হয়ে গেছে। তাই তার মন খারাপ । আনমনে হাসলাম আমি। এই ছোট ব্যাপার নিয়ে কেউ কাঁদে । প্রিয়ন্তিকে বললাম না কিছুই আর । শো শুরু হতে তখন ঘন্ট দেড় এক বাকি। ততক্ষণে ফুলের মালা আনা যাবে।
.
কাট ফাটা রোদে ঘেমে আমি চুপসে গেছি। কপাল ভাল দিচ্ছিল না সেদিন। বহু খুঁজে যখন মালা পেয়েছি ততক্ষণে ঘন্টা পার হয়ে গেছে । মাঝ পথে নষ্ট যাওয়া গাড়ি ছেড়ে হেটেই আসতে হলো। সত্যি বলতে কি হেটে নয় , দৌড়ে এসেছিলাম।
.
যখন মালা হাতে রুমে ঢুকেছি তখন অন্যরা অনুষ্ঠানের নাচের প্রস্তুতি নিচ্ছে । রিহার্সাল রুমে এক কোণে বসে ছিলো পাগলীটি । আমি সামনে দাড়িয়ে হাঁপাতে লাগলাম । চেহারা আর শরীর থেকে ঘাম বেয়ে পড়ছে । প্রিয়ন্তি অবাক হয়ে আমার হাতের বেলী ফুলের মালা গুলোর দিকে তাকিয়ে আছে। প্রিয়ন্তির সেদিনের হাসিটা আমি ভিতরে একটা জায়গা তৈরী করে নিলো । যে জায়গায় আমি ছোট্ট একটি রাজ্য সাজালাম । যে রাজ্যের পুরোটা জুড়ে প্রিয়ন্তি !
.
– আজ তোমার কি হয়েছে বলবে অভ্র?
.
– কিছু না প্রিয়ন্তি । আজ তোমাকে অনেক সুন্দর লাগছে ।
.
– হয়েছে এইবার থাম
.
– নিচে এসো প্রিয়ন্তি _ হেসে বললাম আমি । প্রিয়ন্তি আমার সাথে হাটা ধরে
.
[]
.
_ কখন করলে এসব! _ ডাইনিং এ খিচুরী দেখে অবাক হয়ে হেসে বলে প্রিয়ন্তি । আমি তার অবাক হওয়ার দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে থাকি।
.
– তুমি যখন উপরে সাজছিলে ।
.
– থ্যাংক ইউ .. বলে আমার বুকে মাথা রাখে প্রিয়ন্তি । দুহাতে নিজের বাহুতে প্রিয়ন্তিকে নেয়ার আগে থেমে যায় কেনো যেন
– খেতে বসো তাড়াতাড়ি বের হবে_
_ কোথায় যাচ্ছি আমরা? _ খাবার মুখে দিয়ে প্রিয়ন্তির প্রশ্ন আমি শুধু হাসলাম
.
সত্যি বলতে কি বের হয়ে প্রিয়ন্তিকে নিয়ে যে জায়গটায় যাচ্ছি তা অনেক পুরনো । আমাদের পুরোনো স্মৃতি, কিছু স্বপ্নকথার গল্পের প্রিয় স্থান ।
.

.
প্রিয়ন্তির চেহারায় একটা অদৃশ্য মায়ায় ছেয়ে যায় । আমি তাকিয়ে থাকি , বাতাসে তার চুল উড়ছে। চুল উড়ার দৃশ্য আমাকে আচ্ছন্ন করতে লাগল । আমি হা হয়ে তাকিয়ে থাকি। আকাশে মেঘ জমছে , আমি খুব করে চাই বৃষ্টি হোক। আজ বিশেষ একটি দিন। বৃষ্টি নিশ্চয় প্রিয়ন্তির খুশির মাত্রাটা বাড়িয়ে দেবে !
.
– কি দেখছ তুমি? _ আমার দিকে তাকিয়ে বলে প্রিয়ন্তি। আমি সংবতি ফিরে পেয়ে হাসলাম।
.
– তোমর চুল গুলো অনেক সুন্দর প্রিয়ন্তি_ প্রিয়ন্তির থেকে চেহারা অন্যদিকে সরিয়ে বললাম আমি। প্রিয়ন্তি আমার দিকে তাকালো
.
– অভ্র !
.
– বলো শুনছি
,
– আমাকে খুব ভালোবাস?
.
আমি প্রিয়ন্তির দিকে তাকালাম। প্রিয়ন্তি তখন অন্যদিকে তাকিয়ে। সত্যি বলতে , প্রিয়ন্তিকে আমি ভালোবাসি । অসম্ভব ভালোবাসি।
.
“ভালোবাসি” ব্যাপারটা বুঝতে শিখেছি ক্লাস নাইনে উঠে । একেবার শেষের দিকে প্রিয়ন্তিকে ছাড়া আমার কিছুই ভাল লাগত না। স্কুলে এসেই আমি আড়ালে প্রিয়ন্তিকে খুঁজতাম । সমাবেশে যখন দাঁড়াতাম আমি তখন চোখ থাকত মেয়েদের সারির নারিকেল গাছটির দিকে । ঐদিকটাই দাঁড়াত প্রিয়ন্তি । চুলে বেনী করে আসতো সে। চেহারায় সর্বক্ষনিক হাসি লেগেই থাকত । আমার গল্পকথার রাজ্যে প্রিয়ন্তির সে হাসি কতশত স্বপ্নের বীজ বুনত !
.
আকাশে তখন মেঘের গর্জন । প্রিয়ন্তি মাথা তুলে তাকালো। বৃষ্টির ফোটা প্রিয়ন্তির গালে পড়তেই হাসল সে ।
.
– অভ্র , স্কুলে থাকতে কত ভিজেছি আমরা । মনে আছে?
.
– আমার সব মনে আছে প্রিয়ন্তি।
.
বৃষ্টির দিনে খুব ভিজতাম আমরা। বৃষ্টি হলেই স্কুল বারান্দায় দৌড়ে আসতো প্রিয়ন্তি। হাত বাড়িয়ে বৃষ্টি স্পর্শ করতো । আমি সে দৃশ্যটিও গভির আগ্রহ নিয়ে তাকাতাম ।
.
একবার ক্লাসে টিচার এলো না। বাহিরে বৃষ্টি হচ্ছিল খুব । প্রিয়ন্তি আমার দিকে তাকিয়ে চোখ নাচিয়ে বলল কিছু একটা । আমি ইশারা বুঝে হাসলাম ।
.
ক্লাসের পিছনের দিকে জানালায় গ্রীল গুলো অনায়েসে খোলা যেতো। সেদিন সেদিকটাই স্কুল পালিয়েছিলাম দুজন । বৃষ্টিতে হাটতে হাটতে হঠাত্ প্রিয়ন্তি কিছু একটা দেখে থামল
.
– আমার কদম ফুল লাগবে রে_ প্রিয়ন্তি মুখ কালো করে বলেছিল সেদিন
.
আমি সামনে তাকালাম । স্কুলের পিছনের দিকটায় কদম ফুলের গাছটিতে কদম ফুল গুলো একটু বেলি সুন্দর । নিতে হলে গাছ বেয়ে উঠতে হবে । আমি গাছে চড়তে জানতাম না । তার উপর বৃষ্টিতে গাছ পা পিছলে পরে যাওয়ার সম্ভবনা ছিলো। আমার ফ্যাকাসে হয়ে যাওয়া মুখের দিকে তাকিয়ে প্রিয়ন্তি বলল
.
– হয়েছে , আর ভয় পেতে হবে না।
.
– ভয় পাবো কেন?
.
– তুই গাছটিতে উঠতে পারবিনা অভ্র !
.
প্রিয়ন্তির কথা শুনে রাগ হলো খুব। পারব না কেন? নিজের মনকেই জিগেস করলাম । পরক্ষনে গাছের দিকে তাকিয়ে ফ্যাকাসে হয়ে গেল মুখটা । প্রিয়ন্তি তখন গাছের উপর ডালটিতে কদম ফুল গুলোর দিকে তাকিয়ে আছে বিষ্ময় নিয়ে । প্রিয়ন্তির সে চেহারার দিকে তাকিয়ে কি মনে করে যেন উঠে দাঁড়ালাম
.
– অভ্র ! ফিরে আস , লাগবা না আমার … প্রিয়ন্তি তখন পিছন থেকে ডাকছিল । আমি তাকায়নি, আমার চোখে তখন কদমফুলটি হাতে পাওয়ার পরের মুহুর্তে প্রিয়ন্তির হাসিটি ভাসছে …
.
কদম ফুল গুলো যখন প্রিয়ন্তির হাতে দিলাম তখন তার চোখে রাজ্যের বিষ্ময় । প্রিয়ন্তির চেহারায় হাসি । আমি সে হাসির দিকে তাকিয়ে ছিলাম অপলক।
.
“অভ্র তোর হাতের অবস্থা দেখেছিস?”_ চিত্কার দিয়ে বলল প্রিয়ন্তি । পরক্ষণে হাতে তীব্র ব্যাথা অনুভব করলাম । গাছে উঠতে গিয়ে চামড়া ছিলে রক্ত পরছে । প্রিয়ন্তি তার ব্যাগে থাকা রুমাল বের করে হাতে বাঁধতে লাগল । সে দৃশ্য দেখে মনে হয়েছিল প্রিয়ন্তি আমাকে ভালোবাসে ।
.
– অভ্র ! চুপ করে আছ কেন?_ প্রিয়ন্তির কথায় ভাবনা থেকে ফিরলাম ।
.
“আচ্ছা প্রিয়ন্তি , রুদ্র তোমার প্রথম ভালোবাসা?_ প্রিয়ন্তির দিকে তাকিয়ে কি মনে করে যেন বললাম। প্রিয়ন্তি না তাকিয়ে মুখ অন্য দিকে ফিরালো । আকাশে তখন মেঘ গর্জন তুলে ডাকছে।
.
[]
.
সেদিন ভিষণ বৃষ্টি হচ্ছিলো । ক্লাসে তখনো কেউ আসেনি । ছাতা হাতে স্কুলের পাশের রাস্তা ধরে হাটছি। কিছুদূর যেতেই থমকে দাঁড়ালাম । প্রিয়ন্তি দাঁড়িয়ে , সাথে কেউ একজন । সে কেউ একজনের নাম রুদ্র , প্রিয়ন্তির ভালোবাসা
.
“জানিস অভ্র তোকে বলব করেও বলা হয়নি । রুদ্র সাথে আমার বছর দুইয়ের প্রেম” _ আমার দিকে তাকিয়ে হেসে বলেছিল প্রিয়ন্তি । আমি কি ভেবে যেন হেসেছিলাম।
.
রিক্সার টুংটাং শব্দে ভাবনা থেকে ফিরলাম । প্রিয়ন্তি তাকিয়ে আছে আমার দিকে
.
– অভ্র ! হঠাত্ রুদ্রের কথা কেনো জিগেস করলে?
.
আমি প্রিয়ন্তির দিকে ফিরলাম। যথেষ্ট অসস্থি প্রিয়ন্তির চেহারায় । আমি হেসে বললাম , “এমনিতেই …
.
বাকি রাস্তাটুকুতে আমরা কেউ কারো সাথে কথা বলিনি। রিক্সা তখন সিআরবি রাস্তায় ঢুকছিল তখন প্রিয়ন্তি চেহারায় হাসি । প্রিয়ন্তি সে হাসির অর্থ জানা আছে আমার। আমাদের প্রিয় একটি জায়গা এটি।
.
রিক্সা থেকে নেমে আমরা দুজন হাটছি গুড়িগুড়ি বৃষ্টিতে। প্রিয়ন্তি চেহারায় খুশির ছাপটা স্পষ্ট বুঝে নেয়া যায় । মোবাইলে রিং হচ্ছিল তার। আমার দিকে তাকিয়ে ফোনটি ব্যাগে গুজে রাখল সে
.
– রুদ্র জায়গাটি ঠিক আগের মতোই আছে। তাই না?
.
– হ্যা প্রিয়ন্তি ! শুধু আমরা ছাড়া।
.
প্রিয়ন্তি মুখের হাসি কোথায় যেন হারিয়ে গেলো । আমার দিকে তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ , বলল না কিছুই ।
.
প্রিয়ন্তির ভালোবাসার মানুষটি আমি নয় জানার পর নিজেকে গোছাতে শুরু করলাম । একটা ব্যাপার মাথায় গেথে গেলো , যেভাবেই হোক প্রিয়ন্তি থেকে দূরে থাকতে হবে।
.
পরিক্ষার তখন বেশিদিন বাকি নেই । স্কুল থেকে বিদায় নিতে হবে। ততক্ষণে প্রিয়ন্তির থেকে অনেকক্ষানি দূরত্ব! আমি ভেবে রেখেছি , স্কুলের শেষ দিনটায় আমাদের শেষ দেখা হবে।
.
স্কুলের বিদায়ের দিনটি আমার খুব মনে পরে । সন্ধায় যখন ১০ টি বছরের স্মৃতিকে পিছে ফেলে ফিরছিলাম তখন আমার চোখ প্রিয়ন্তিকে খুঁজছিলো। প্রিয়ন্তির সাথে দেখা হলো বাড়ি ফেরার ঠিক আগ মুহুর্তে । আমার দিকে তাকিয়ে হাত বাড়িয়ে দিলো। হাত মিলানোর সময় কে জানতো স্রষ্টা অন্য কিছু ভেবে রেখেছিলেন …
.
– আজ কোথায় এত হারাচ্ছ অভ্র? _ হাত নাড়িয়ে জানতে চায় প্রিয়ন্তি । আমি হেসে বললাম_ অতিতে
.
প্রিয়ন্তি মুখ বাকিয়ে হাসল। আমরা যে জায়গাটায় বসে আছি তার কিছু দূরে ছাউনীতে একজন ঝুড়িতে হরেক রকম রেশমী চুড়ি নিয়ে বসে আছে
.
– আমার চুড়ি লাগবে _ সেই দিকটায় দেখিয়ে বলল প্রিয়ন্তি। আমি কিছু না বলে উঠে গেলাম। প্রিয়ন্তির জন্য রেশমী চুড়ি কেনার সখ আমার বহু আগের ।
.
স্কুলের বিদায় দেয়ার পর থেকে প্রিয়ন্তির সাথে আমার দেখা হয়নি। নিজেকে তিনটা মাসে গুটিয়ে নিয়েছিলাম সবকিছু থেকে। কলেজে যেদিন প্রথম গেলাম তখন মনে একটাই ইচ্ছে ছিলো , নতুন করে শুরু করতে হবে আমাকে । একদম নতুন করে ।
.
বন্ধুরা সবাই যখন ভাল ভাল কলেজে ভর্তি হলো আমি নিজেকে লুকাতে প্রাইভেট কলেজ বেছে নিলাম । কলেজের প্রথম দিনটির কথা আজো মনে আছে । ওরিয়েন্টেশন ক্লাসে ঢুকে বসে আছি। পিছন দিক থেকে কেউ একজন এসে আমার চোখ বুজে ধরল । ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই দেখলাম প্রিয়ন্তি দাঁড়িয়ে । স্রষ্টার রসিকতায় নিজেকে সামলে নিতে সময় লেগেছিল অনেক
.
– প্রিয়ন্তি সেদিন ওরিয়েন্টেশনে তোমার সাথে দেখা না হলেই ভালো হতো _
.
প্রিয়ন্তি এনে দেয়া রেশমী চুড়ি গুলো পড়ছিল হাতে । আমি সেদিকে তাকিয়ে বললাম কথাটি। প্রিয়ন্তি আমার দিকে অবাক হয়ে তাকালো
.
– হাহাহা , দেখা না হলো তোমার পাগলামো থেকে বাঁচতাম _ পরিস্থিতি সামাল দিতে বললাম আমি। প্রিয়ন্তির চেহারায় পরিবর্তন এলো না।
.
[]
.
আমি আর প্রিয়ন্তি একটা ক্যাফেটেরিয়া বসে আছি। কফি কাপে চুমুক দিলো প্রিয়ন্তি । চেহারায় চিন্তার ছাপ আছে এখনো। তাকে চমকে দেয়ার জন্য ওয়েটার তাকে একটি বাক্স দিয়ে গেলো । হাসলাম আমি , প্রিয়ন্তির চেহারায় এখন হাসি ফুটবে
.
– এটা কি অভ্র?
.
– আমি কি করে বলব?
.
প্রিয়ন্তি ভুর কুচকে তাকালো । বাহিরে তখন ঝুম বৃষ্টি । প্রিয়ন্তির সামনের বাক্সটিতে এক গুচ্ছ কদম।
.
প্রিয়ন্তি বাক্সটি খুলে আমার দিকে তাকালো । তার চোখের হাসিটি ঠিক পড়ে নেয়া যায়। আমার দিকে সেই চোখ নিয়ে তাকিয়ে ছিলো অনেক্ষণ। আমি বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারিনি । দৃষ্টি সরিয়ে নিলাম।
.
প্রিয়ন্তির হাতে কদম গুলো মুঠোবন্দী করে রেখেছে । আমি আর প্রিয়ন্তি পাশাপাশি হাটছি। সামনে আইসক্রিমের গাড়ি দেখে চোখ নাচিয়ে হাসল প্রিয়ন্তি। দুজনেই হাসলাম অতিতের কথা ভেবে ।
.
কলেজে উঠার পর প্রিয়ন্তিকে এড়িয়ে চলতাম। প্রিয়ন্তি ব্যাপারটা বুঝতে পেরে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিল আমার থেকে। একদিন খেয়াল করলাম প্রিয়ন্তি অনেক দিন হয়ে গেলো ক্লাসে আসছে। ভাবলাম , কি হলো মেয়েটার? ফোনে না পেয়ে চিন্তা হলো খুব। মনের সাথে তর্কে হেরে প্রিয়ন্তির বাড়ির পথ ধরলাম ।
.
সেদিন প্রিয়ন্তির বাসায় আমাকে দেখে প্রিয়ন্তির মা অবাক হলেন। সে স্কুলে থাকতে গিয়েছিলাম আর যাইনি।
_ অভ্র! কি মনে করে আন্টির কথা মনে পড়ল? _ হেসে বললেন প্রিয়ন্তির মা ।
উত্তরে হাসলাম আমি। আন্টি হেসে দরোজা থেকে সরে গিয়ে বাসায় যাওয়ার জায়গা করে দিলেন।
_ আন্টি প্রিয়ন্তি কোথায়?
_ ওর রুমেই আছে …
.
প্রিয়ন্তির রুমের দিকে পা বাড়ালাম। মনে রাজ্যের প্রশ্ন । হঠাত্ আমাকে দেখে প্রিয়ন্তি কিছু ভাববে না তো?
.
প্রিয়ন্তির রুমে ঢুকে তাকে দেখে অবাক হলাম খুব । চেহারা বিধ্বস্থ, রাতে ঘুম হয়নি তা দেখে বুঝে নেয়া যায় । চোখের নিচে কালি জমেছে । আমাকে দেখে উঠে বসল শোয়া থেকে ।
.
– কি খবর তোর? _ কন্ঠস্বর যথেষ্ট স্বাভাবিক রেখে জানতে চাইলাম
.
– ভালো !
.
ভুর কুচকে তাকালাম আমি। প্রিয়ন্তি কিছু না বলে উঠে বারান্দায় গেলো । পিছু পিছু আমি উঠলাম প্রিয়ন্তির সাথে
.
[]
.
হুট করে আসা মানুষ গুলো হুট করে হারিয়ে যায় । রুদ্রের সাথে করা বিচ্ছেদের গল্প প্রিয়ন্তির মুখ থেকে শোনার পর আমার কেনো যেন একটুও কষ্ট হচ্ছিল না । বলার পর চুপ হয়ে গেল প্রিয়ন্তি
.
বারান্দায় অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলাম আমরা দুজন। কেউ কারো সাথে কথা বলছিলাম না। কিসের যেন জড়তা । একটা সময় নিরবতা ভাঙ্গল প্রিয়ন্তির কান্নার শব্দে । প্রিয়ন্তিকে সেবার ঐভাবে কাঁদতে দেখে ভেতরটা হুহু করে কেঁদে উঠল । কেন জানি না , প্রিয়ন্তির হাতটি স্পর্শ করলাম। প্রিয়ন্তি তখনো কাঁদছিল।
.
আকাশে কোথায় যেন মেঘ গর্জন তুলে ডাকল । আমি চমকে তাকালাম । প্রিয়ন্তি আমার পাশে বসা , দুটো সময়ের মাঝে প্রিয়ন্তির এখন বিস্তর তফাত্ । সেদিনের মতো আমার হাতটি বাড়িয়ে দিয়ে প্রিয়ন্তির হাত স্পর্শ করি। অনুভুতিটা ভিন্ন একেবারে!
.
ঐদিনটার পর প্রিয়ন্তির সাথে দিনগুলো যেন স্কুলে কাটানো প্রিয় দিনগুলোর মতো । পুরোটা কলেজ ঘুড়ে বেড়াতাম আমরা। কলেজ গেইটে দাঁড়িয়ে থাকতাম আমার পাগলী প্রিয়ন্তির জন্য। একই সাথে ক্লাসে যেতাম দুজন। ক্লাসে শান্ত ছেলেটা হঠাত্ বাকপটু হয়ে গেলো। প্রিয়ন্তি আমার করা ছোটছোট পাগলামো দেখে অবাক হাসতো । এত কিছুর পরেও প্রিয়ন্তিকে বুঝতে দেইনি তাকে নিয়ে আমার ছোট্ট একটি রাজ্য আছে যার পুরোটা জুড়ে সে।
.
_ অভ্র আইসক্রিম খাবো !
.
সিআরবির রাস্তা ঘেষে হাটছিলাম। গুড়িগুড়ি বৃষ্টিতে মৃদু বাতাস শীত করছে । এর মাঝে প্রিয়ন্তির কথায় ভাবনা থেকে ফিরে হাসলাম। হাসির পিছনে কারন ছিলো ।
.
কলেজ গন্ডি পেরিয়ে তখন ভার্সেটিতে উঠেছি। এক সকালে প্রিয়ন্তি জ্বর নিয়ে ক্যাম্পাসে এলো। প্রিয়ন্তি ক্যাম্পাসে আসার পর ঝুম বৃষ্টি নামলো। প্রিয়ন্তি বসে ছিলো বারান্দায়। আমি বাহিরে দাঁড়িয়ে বৃষ্টিতে। প্রিয়ন্তি তাঁকিয়ে ছিলো মনখারাপ করে। সত্যি বলতে কি, আমি প্রিয়ন্তিকে জ্বালাতে বৃষ্টিতে ভিজছিলাম। একটা সময় প্রিয়ন্তি আর না পেরে উঠে এলো
.
– কি রে তুই বৃষ্টিতে কেন?
.
– তোর সাথে ভিজব অভ্র ,
.
– তোর জ্বর , যা এখান থেকে ।
.
প্রিয়ন্তি রাগী রাগী চেহারায় তাকাল । আমি চুপ হতেই হাসল প্রিয়ন্তি । ঝুম বৃষ্টিতে ভিজলাম খুব। মাঝ পথে আইসক্রিম দেখে , নিলাম । সেইদিন ঝুম বৃষ্টিতে জ্বর নিয়ে আইসক্রিম খাওয়া পাগলী মেয়েটার চেহারার উচ্ছাসটা আমার আজো চোখে ভাসে…
.
– অভ্র , বলছি আইসক্রিম খাবো।
.
আমি হেসে কথা না বাড়িয়ে আইসক্রিম নিলাম। কোথায় যেন বাজ পড়ে ঝুম বৃষ্টি নামল। সে বৃষ্টিতে হাসছিলাম দুজন দুজনের পাগলামো । প্রিয়ন্তির হাসির দিকে তাকিয়ে ভাবলাম , হাসির পিছনে কতশত গল্প থাকে । প্রতরণার গল্প, ভালো লাগার গল্প , বিরহের গল্প আর? কিছু ভালোবাসার গল্প।
.

.
রিক্সায় করে যখন বাড়ি ফিরছিলাম তখন ভিজে চুপসে গেছি। বাসায় এসে ঢুকতেই প্রিয়ন্তি হাঁচি দিলো। কি মনে করে যেন হাসলাম দুজন।
.
– আজ তোমার সারপ্রাইজড শেষ হলো অভ্র?
.
– উহু! _বলে এপাশ ওপাশ মাথা দুলালাম আমি
.
সারপ্রাইজড এখনো শেষ হয়নি। আরো অনেকটাই বাকি।
.
– আরো কিছু আছে? _অবাক হয়ে জানতে চায় প্রিয়ন্তি। আমি মুচকি হাসি
.
– বলো অভ্র _ প্রিয়ন্তির চেহারায় বিষ্ময় ।
.
– উপরে যা রাখা আছে তা ঠিক সেইভাবে পরে তৈরী হয়ে এসো _ প্রিয়ন্তিকে বলে অন্য রুমে চলে এলাম আমি । প্রিয়ন্তি তখন অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে ।
.
আজ এই রুমটিতে পুরোটা লাল। প্রত্যেকটা ক্যান্ডেলের রঙ ও লাল। চারপাশে ক্যান্ডেলের মাঝে ছোট একটা টেবিলে খাবার সাজানো । প্রিয়ন্তির এই আবহাওয়াটা খুব পছন্দের।
.
প্রিয়ন্তি তার একটি জন্মদিন কখনো ভুলবে না । তার জন্মদিনে এমন ই করে সারপ্রাইজড দিয়েছিলাম। আমার দেয়া গিফট ছিলো ছোট্ট একটা ডায়েরী। প্রিয়ন্তি জুড়ে গল্প ।
.
একটা সময় মনে হলো প্রিয়ন্তিকে ভালোবাসার কথা বলা দরকার। প্রিয়ন্তি যেদিন ডায়িরীটা পড়ে নিয়ে এলো পড়নে ছিলো লাল শাড়ি কপালে লাল টিপ । খুব মায়াবী লাগছিল তাকে । আমাকে দেখে কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল
.
– এতটা ভালোবাসিস? _ আমি শুধু হেসেছিলাম।
.
সেদিন প্রিয়ন্তির দেয়া থাপ্পর দেয়ার কথা মনে পড়লে আমার আজও হাসি পাই । প্রিয়ন্তিকে সেইদিন গভীর ভালোবাসায় জড়িয়ে ধরেছিলাম। মনে পড়ে সেইদিন রাতে খুব কেঁদেছিলাম যদিও কান্নার কারণটা খুশির । আমি দুইবার কেঁদেছি এমন । একবার সেইদিন আর শেষবারেরটা গতকাল রাতে। আমি আর কাঁদবনা …
.
[]
.
প্রিয়ন্তি যখন রুমে ঢুকল তখন রুমের চারদিকে মোমের আলো। সেই আলোয় আমি স্বর্গ থেকে নেমে আসা এক অপ্সরীকে দেথেছিলাম, আমার প্রিয়ন্তি ..
.
লাল শাড়িতে প্রিয়ন্তিকে মানিয়েছে খুব। কপালে ছোট্ট লাল টিপ। এইবার প্রিয়ন্তি বসানো টিপ নিয়ে অভিযোগ নেই । চোখে হালকা কাজল দেয়া । গোলাপী ঠোঁটের উপর তিলটা তার সৌন্দর্য্য বাড়িয়ে দিচ্ছিল। খোলা চুলে ঘ্রানে আমি হারাচ্ছিলাম কোথায় যেন। আমি সামনে এগিয়ে গিয়ে প্রিয়ন্তির হাত ধরলাম, বাড়িয়ে দিলো সে ।
.
– অভ্র! তুমি পাগল হয়ে গেছ
.
– বউয়ের জন্য পাগল হয়েছি পরকীয়া তো করছিনা? _ চোখ টিপে বললাম আমি। হাসল প্রিয়ন্তি। আমি প্রিয়ন্তির দিকে ওয়াইনের গ্লাসটি এগিয়ে দেই। প্রিয়ন্তি হাত বাড়িয়ে নেই সেটি।
.
– প্রিয়ন্তি
.
– বলো
.
– আজ কেনো এতো কিছু করলাম বলো তো
.
প্রিয়ন্তি কিছুক্ষণ চুপ হয়ে থাকে। কিছুতে মনে করতে পারে না।
.
– কেনো?
.
প্রিয়ন্তির পাল্টা প্রশ্নে হাসলাম আমি। মোটেও অবাক হয়নি
.
– প্রিয়ন্তি , দিনটি অনেক স্পেশাল। মাথায় ছোটছোট বেণী করে আসা মেয়েটির পিছু পিছু নিয়ে ছিলাম এইদিনটিতে। ঝুম বৃষ্টিতে এই দিনেই ভিজেছিলাম প্রথম। ভালোবাসি বলার পরে এইদিনে চড় মেরে বুকে জড়িয়েছিলে আমাকে ।
.
প্রিয়ন্তি অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলো আমার দিকে । আমি ম্লান হাসলাম। প্রিয়ন্তির হাত ধরে পাশে থাকা সোফায় বসলাম। সামনে এলইডি স্ক্রিন প্রিয়ন্তি আর আমার ছবি একে একে ভাসছে । সেই ছোট্ট থেকে আজ অবদি। সেই ছোট্ট রাজ্যের গল্পের টুকরো স্মৃতি গুলো । প্রিয়ন্তি স্মৃতিগুলোর দিকে অবাক বিষ্ময়ে তাকিয়ে ওয়াইনে চুমুক দিতে থাকলো। আমি তাকিয়ে থাকি প্রিয়ন্তির দিকে। প্রিয়ন্তির চোখ ঝাপসা হয়ে আসতে লাগলো ধিরে ধিরে। ঘুমে লুটিয়ে পড়ার আগে সেই ঘুমন্ত মায়াবী চেহারাটির দিকে আমি শেষবারের মতো গভীর ভালোবাসা নিয়ে তাকালাম।
.

.
প্রিয়ন্তির মাথে দুলছে । বুঝলাম জ্ঞান ফিরছে তার । রুমে তখন দরজা সব বন্ধ শুধু পূর্ব দিকের জানালাটি ছাড়া। আকাশ দেখে বোঝার উপায় নেই আজ সারারাত বৃষ্টি হয়েছিল।
.
প্রিয়ন্তির হাত আর পা দুটো শক্ত করে বাধা আছে চেয়ারটিতে। সে যেদিকে বসে আছে তার সামনে ড্রেসিং টেবিল। সে চোখ খুলে পরিস্থিতি বুঝতে কিছুটা সময় নিলো। ড্রেসিং টেবিলের দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। অস্ফুট কন্ঠস্বর ভেসে এলো কানে। সে স্বরে ভয় মিশ্রিত। প্রিয়ন্তির কন্ঠস্বর কাঁপছে ।
.
প্রিয়ন্তির দিকে তাকালাম আমি। প্রিয়ন্তির সে কালো চুল গুলো আগের মতো সুন্দর দেখাচ্ছে না। ছোটছোট কাটছাট চুলে ভয়ংকর লাগছিল প্রিয়ন্তিকে।
.
– ইশশশশশ _ শব্দ করো না প্রিয়ন্তি। শান্ত হও ..
.
প্রিয়ন্তির আয়নায় নিজেকে দেখছে তখনো। বুঝে উঠতে পারছে না কি হতে যাচ্ছে তার সাথে ।
.
– কেমন দেখাচ্ছে প্রিয়ন্তি?_ প্রিয়ন্তির দিকে তাকিয়ে জিগেস করলাম আমি। প্রিয়ন্তি তাকিয়ে রইল । সে দৃষ্টিতে যথেষ্ট ভয় দেখতে পাচ্ছি আম ।
.
টিভি স্ক্রিনে তখনো আমাদের ছবি গুলো চলছিল। সেগুলো অফ করলাম আমি। দেখতে বিরক্ত লাগছে ।
.
– ছবি গুলো বড্ড বেশি বিরক্তর তাই না প্রিয়ন্তি? _ প্রিয়ন্তি কিছু বলল না ।
.
– তোমার পছন্দের কিছু ছবি দেখবে প্রিয়ন্তি?? _ তাকে চুপ করে থাকতে দেখে বললাম আমি।
.
টিভি স্ক্রিনে তখন নতুন ছবি ভাসছে । অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে প্রিয়ন্তি। আমি প্রিয়ন্তির পাশে ইজি চেয়ারে বসে দুলছি ।
.
টিভি স্ক্রিনে প্রিয়ন্তি আর রুদ্রের ছবি। ঘনিষ্ট দুজনের চেহারায় হাসি। রুদ্রের বাহুতে প্রিয়ন্তিকে দেখে আমার কষ্ট হচ্ছিল না কেন যেন ।
.
ছবি গুলো প্লে হচ্ছে একের পর এক। প্রিয়ন্তির দৃষ্টি তখন নিচে। কাঁদছিল সে। সে কান্নার অশ্রু কোন অনুভুতি জন্মাতে পারেনি আমার ।
.
আমি ইজি চেয়ার থেকে উঠে প্রিয়ন্তির সামনে হাটু গেড়ে বসলাম। সমস্ত শক্তি দিয়ে ডান হাত ধরে তাকালাম তার দিকে
.
– লজ্জার কিছু নেই প্রিয়ন্তি। দেখছনা তুমি? _ চিত্কার দিয়ে বলি আমি। প্রিয়ন্তি তখন কাঁদতে থাকে । কন্ঠে অস্ফুট স্যরি বের হয়ে আসে । স্বজোড়ে আঘাত করি আমি। প্রিয়ন্তির ঠোঁট ফেটে রক্ত ঝড়ে ।
.
প্রিয়ন্তির সাথে রুদ্রের পরিচয় ফের হুট করে । যেদিন প্রথম বুঝলাম প্রিয়ন্তির মোবাইলে রুদ্রের ফোন বিন্দুমাত্র বিচলিত হইনি আমি। বিশ্বাস ছিলো , খুব বিশ্বাস ছিলো।
.
– প্রিয়ন্তি , পৃথিবীতে জঘন্যতম অপরাধ কোনটি জানো?
.
প্রিয়ন্তিকে প্রশ্নটি করি আমি। প্রিয়ন্তি দুই হাতে জোড় দিয়ে ছুটার চেষ্টা করে। চুল ধরে হেচকা টানে আমার দিকে ফেরায় প্রিয়ন্তিকে। আমার চোখের দিকে তাকিয়ে চুপ হয়ে যায় প্রিয়ন্তি। তাতে আজ শুধু ঘৃণায় দেখতে পাবে সে ।
.
– রুদ্রের সাথে কতবার বিছানায় গিয়েছ প্রিয়ন্তি?
.
কথাটি বলতে আটকায় এটুকুও । টিভিস্ক্রিনে তখন রুদ্র আর প্রিয়ন্তির কন্ঠস্বর ভাসছে । কি বলে যেন হাসছিল দুজন। প্রিয়ন্তির হাসির দিকে চোখ যায়। একটাবারের জন্য সে হাসিটির জন্য মায়া জন্মায় নিই ।
.
– এমন কেন করলে?
.
– আমার ভুল হয়েছে অভ্র ! প্লিজ ক্ষমা করে দাও
.
“ক্ষমা” শব্দটি খুব বিশ্রী শোনায়। প্রিয়ন্তির ঠোঁটের উপর তিলটির দিকে চোখ আটকে যায় আমার। এই তিলটি না থাকলে প্রিয়ন্তি হাসির মায়ায় কেউ আটকাবেনা।
.
আমার হাতে প্লাস দেখে প্রিয়ন্তির চেহারা ফ্যাকাসে হয়ে আসে। কি করতে যাচ্ছি আমি বুঝেছ যেন। হাত দুটো ছাড়াতে নাড়াচাড়া করে পরক্ষণে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে চুপ হয়ে যায়। আমার প্রিয়ন্তির পিছে গিয়ে কানে পাশে মুখ নেই
.
– প্রিয়ন্তি তোমার স্কুলে সেই ফেস্টিবলের কথা মনে পড়ে? খোপায় দেয়া ফুলের মালা চুড়ি হয়ে যাওয়ায় কেঁদেছিলে? ঘামে ল্যাপ্টে থাকা শরীরে যখন নতুন ফুলের মালা খোপায় পড়ানোর পরের হাসিটি?
.
প্রিয়ন্তি গুজড়ে কাঁদতে থাকে। নিজের ভুল বুঝতে পারে যেন। আমার চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পরে। সেই অশ্রু পুরোটায় ঘৃনা ভরা।
.
– তোমার ঠোটের উপরের তিলটি তোমার হাসিতে মায়ায় ছড়িয়ে দেয়। আমি সে মায়া থেকে কখনো বের হতে পারিনি।
.
প্রিয়ন্তির তিলে প্লাস বসিয়ে টান দিতেই উঠে এলো। ঠোট দুটো লাল রক্তে চুপসে গেছে। প্রিয়ন্তির চিত্কার দিয়ে থেমে যায়। কাঁদার শক্তি হারায় যেন। এটুকুও কষ্ট লাগছে না আমার। চেয়ার সামনে এনে তাঁকিয়ে থাকি প্রিয়ন্তির দিকে।
.
– খুব কষ্ট লাগছে প্রিয়ন্তি?? আমার তেমন কষ্ট হয়েছিল জানো? তোমার ভিতরে কখনো রক্তক্ষরন হয়েছে? তোমার এই ব্যাথা থেকেও তীব্র সেই ব্যাথা!
.
প্রিয়ন্তি ধীরে ধীরে মাথা তোলার চেষ্টা করে । লাল শাড়ি বেয়ে রক্তের ফোটে বৃষ্টি ভেজা কদম ফুলে পড়ে । আমি হাত বাড়িয়ে সেটি তুলে নেই
.
– প্রিয়ন্তি , তোমার মনে আছে স্কুল ফাকিয়ে দিয়ে তোমার জন্য কদম পেরেছিলাম? হাতে ছিলে রক্ত ঝড়ছিল আমার? তুমি সাদা রুমালে বেধে দিয়েছিলে সে হাত? _ কান্না আটকিয়ে বলি কথা গুলো প্রিয়ন্তি কিছু বলছে না
.
আমি ডান পকেট থেকে সেই দিনের রুমালটি বের করি। এতবছর পরেও যত্ন করে রেখে দিয়েছি সেটি। আমার হাতে সেটি দেখ কেঁদে দেয় প্রিয়ন্তি। এটুকু মায়া হয়না আমার । আমি ঐ রুমাল দিয়ে তার ক্ষত স্থানে চেপে ধরি। পরক্ষণে সরিয়ে নিয়ে চড় বসায় প্রিয়ন্তির গালে। প্রিয়ন্তির প্রতি মায়া বোকা বানিয়ে রেখেছিল আমাকে ।
.
প্রিয়ন্তি আর রুদ্রের ছবি যেদিন পেলাম , । প্রিয়ন্তির ঘুমন্ত চেহার দিকে তাকিয়ে ছিলাম সারারাত। প্রিয়ন্তির মায়ভরা চেহারার পিছনের দিকটি মিলাতে পারছিলাম না ।
.
প্রিয়ন্তির ফোনের দিকে তাকিয়ে চোখ আটকে যায় । হাত বাড়িয়ে নেই সেটি। সকালে প্রিয়ন্তির তোলা ছবি গুলো রুদ্রকে পাঠিয়ে রেখেছে সে । সকালে দেখে বুঝেছিলাম প্রিয়ন্তির চেহারায় অসস্থি দেখে।
.
– প্রিয়ন্তি তোমাকে দেখার অধিকার অন্য কে কেন দিলে? ঐ অধিকার তো শুধু আমার। _ প্রিয়ন্তির হাত বলি আমি। প্রিয়ন্তির হাত ছাড়ার চেষ্টা করে।
.
হাতে থাকা প্লাস দিয়ে প্রিয়ন্তির ডান হাতে বৃদ্ধা আংগুলে নোখে বসিয়ে হেচকা টান দেয় । রক্ত বের হয়ে আসে। চিত্কার দেয় প্রিয়ন্তি।
.
নখটা খুলে প্লার্সের সাথে চলে এসেছে। গোড়ার কাছে থেকে শেকড় পর্যন্ত উপড়ে গেছে। একটু একটু লাফাচ্ছে আঙুলটা। প্লার্সের সঙ্গে লাগানো নখটা একবার দেখলাম। নেইলপলিশের লালে মিশে যাওয়া অন্যরকম লাল। অদ্ভুত মায়াবী রঙ। ঘরের সঙ্গে মানিয়ে গেছে একেবারে।
.
প্রিয়ন্তির চিৎকারে ঘরে টেকা যাবে না মনে হচ্ছে। আরেকবার থাপ্পড় মারলাম, শুধুমাত্র ওর মুখ বন্ধ করানোর জন্য। আমার কথা এখনও শেষ হয়নি। কথা শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত মেয়েটাকে শান্ত রাখতে হবে। এখনও কিছুই দেখেনি সে, অবাক হওয়ার মতো কিচ্ছুটি না। আমার গল্প বলা এখনও শেষ হয়নি যে!
.
– কই, বললে না যে। ওর দিকে তাকিয়ে বললাম। পৃথিবীতে জঘন্য অপরাধ কোনটা?
.
শেষ মারটা খাওয়ার পর থেকে প্রিয়ন্তি ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ধরে শব্দ বন্ধ করার চেষ্টা করছে। অস্ফূট গোঙ্গানি তবুও বের হয়ে আসছে বার বার। আয়নায় নিজের চেহারাটা সে দেখতে পাচ্ছে। বাজি ধরে বলতে পারি ওই চেহারা দেখার ইচ্ছে ওর হচ্ছে না। তবে দেখতে হচ্ছে। দেখতে হবেও। যতোক্ষণ না অন্য কিছু করার অনুমতি দেব আমি।
.
– রুদ্রের সঙ্গে তোমার আবারও মিল হয়েছে সেটা আমাকে বললেও পারতে, প্রিয়ন্তি। বললাম তাকে। তারপর নিজের প্রশ্নটা উত্তর নিজেই দিলাম, পৃথিবীর জঘন্যতম অপরাধ একজন মানুষের বিশ্বাস নিয়ে খেলা করা।
.
প্রিয়ন্তি কোন কথা বললো না। গোঙ্গানির আওয়াজ বেড়ে যাচ্ছে। আরেকবার হাত তুললাম। নিমেষে থেমে গেলো শব্দটা। ম্যাজিক যেন! হাসি পেল আমার। হাহা করে হেসে ফেললাম। প্রিয়ন্তির চোখে এখন যন্ত্রণা, ভয়। ভয়ের পরিম্নাণটা যন্ত্রণা থেকে কয়েকগুণে বেশি।
.
– আমাকে যদি বলতে, আমি তোমাকে যেতে দিতাম। তোমার সুখই আমার সবকিছু ছিল, প্রিয়ন্তি। একসময়। মনে নেই, স্কুলের পাট চুকিয়ে তোমার থেকে সরে আসতে চেয়েছিলাম? আমি কাজটা আরেকবার করতে পারতাম। তুমি রুদ্রের সাথে থাকতে চাইলে আমি আটকাব কেন?
.
প্রিয়ন্তি কিছু বলছে না। বোবা বিস্ময়ে তাকিয়ে আছে।
.
– তুমি তা করলে না। আমার সাথে এক ছাদে থেকে আমাকেই ঠকালে। বিশ্বাসঘাতকতার শাস্তি কি জান তো?
– প্লিজ… কাঁদতে কাঁদতে উচ্চারণ করল আমার একসময়ের ভালবাসা। আমাকে ছেড়ে দাও, প্লিজ!
– তোমার জন্য আরেকটা চমক বাকি থেকে গেছে যে, দেখবে না? যেতে চাইছ কেন? এসো আমার সাথে।
.
চেয়ারের সঙ্গে নিজেকে নিয়ে টানাহ্যাচড়া করছে এখন আমার স্ত্রী। পালিয়ে যেতে চাইছে আমার কাছ থেকে। দূরে। কেন সে পালিয়ে যেতে চাইছে?
চেয়ারের পেছন দিকটা ধরে ঠেলা দিলাম। মেঝের সাথে বিদঘুটে শব্দ করে হেঁচড়ে চলল চেয়ারটা।
.
বাথরুমের চৌকাঠটা তিন ইঞ্চি উঁচু। ওখানটা পার করার জন্য প্রথমে চেয়ারের সামনের দুই পা ঢোকাতে হলো। তারপর পেছনের দু’পা। প্রিয়ন্তির চিৎকার এখন বাথরুমের ছোট্ট গণ্ডিতে প্রতিধ্বনী তুলছে। আরেকবার হাত তুলতেই থেমে গেল ওই চিৎকার। নাকি সামনের দৃশ্যটা দেখে? আমি নিশ্চিত হতে পারলাম না। এতদিন ওর সাথে প্রেম করেও এই ব্যাপারটা আমি আজও নিশ্চিত হতে পারিনি।
.
প্রিয়ন্তি বাথটাবের দিকে তাকিয়ে আছে।
তামার বাথটাবটা ওর প্রিয় ছিল খুব।
গোসল করতো লম্বা সময় নিয়ে। কতদিন ওর সাথে আমিও নেমেছি এখানে। দু’জনে যতটা না গোসল করেছি তার চেয়ে বেশি করেছি খুনসুটি। আজ প্রিয়ন্তির মুখে বাথটাব দেখে হাসি ফুটছে না। মেঝেতে রাখা বড় দুটো ড্রামই এর কারণ।
.
একটা ড্রামের মুখ খুললাম আমি।
– হাউড্রফ্লুরিক এসিড, প্রিয়ন্তি। দাম অনেক।
– অভ্র, কাজটা কর না। অভ্র প্লিজ।
.
একদম সুস্থ মানুষের মত কথা বলছে এখন সে। মৃত্যুভয় তাকে জাকিয়ে ধরেছে একেবারে।
– এই এসিডের দুটো বৈশিষ্ট্য আছে। শুনবে প্রিয়ন্তি?
– অভ্র, প্লিজ, শান্ত হও। আমাকে ছেড়ে দাও। হাত খুলে দাও আমার। আমি কাওকে বলব না আজকের কথা।
– এক. প্লাস্টিকের সাথে এই এসিড বিক্রিয়া করে না। আর করে না তামার সাথে। যেমন আমাদের বাথটাব। বিক্রিয়া করবে না এটা এই টাবের সাথে।
– অভ্র, আমি বলব রান্নাঘরে খুব খারাপ অ্যাকসিডেন্ট করে এমনটা হয়েছে। আমি বলব এটা। প্লিজ…
– দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্যটা শোন তাহলে। এই এসিড মানুষের হাড়োকে পুরোপুরি দ্রবীভূত করে ফেলে। পুরোপুরি। একটা কণাও অবশিষ্ট থাকে না এতে ডুবে গেলে। পানি হয়ে যায়। মানে, পানির মতো আরকি।
.
ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল প্রিয়ন্তি। এতক্ষণও কাঁদছিল, তবে চোখের পানির বেগ আরও বেড়ে গেছে হঠাত করে!
– রুদ্রের সাথে আমি আর যোগাযোগ রাখব না, আমার মায়ের কসম, অভ্র। অভ্র…
ঘুষিটা খুব জোরে মারলাম। নাকের হাড় ভাঙ্গার শব্দ পরিষ্কার কানে এল। একেবারে মাথার ভেতর ঢুকে গেছে যেন নাকটা। বিচ্ছিরি ভঙ্গিতে চ্যাপ্টা হয়ে গেছে। মুখ থেকে দমকে রক্ত বের হয়ে এল ওর।
– মা … মা গো-
আর্তচিৎকার দিচ্ছে প্রিয়ন্তি, ওর দেহটা দুলছে ফলা তোলা সাপের মত, বাথরুমের ভেতর থেকে বের হয়ে গেলাম আমি। বেডরুম থেকে ওর ফোনটা নিয়ে বের হয়ে আসলাম আবার।
এখনও সমানে চিৎকার দিচ্ছে সে। আল্লাহকে ডাকছে, মাকে ডাকছে। সে মনে হয় জানেও না কাকে কাকে ডাকছে এখন। যন্ত্রণা ওকে পাগল করে দিয়েছে।
– এই যে রুদ্রের নাম্বার। আমি এখন ওকে একটা মেসেজ দেব।
প্রিয়ন্তির চিৎকার থেমে গেছে। আমার অন্য হাতে একটা ছুরি ধরা।
-তোমার জন্য আনিনি আমি এটা। অভয় দেওয়ার ভঙ্গিতে বললাম, মেসেজ টাইপ করছি এক হাতে। “অভ্র আজ রাতে থাকছে না। আসবে তুমি?” – উচ্চারণ করলাম মেসেজটা।
– আহ…
কিছু বলতেই পারছে না অকর্মণ্য মেয়েটা।
– আসবে ও। তোমার শরীরে একবার অভ্যস্ত হলে কেউ সেটা এড়াতে পারবে না। আমি জানি ও আসবে।
– অভ্র রে…
ওর পেছনে দাঁড়িয়ে দুই পোঁচে দড়ি দুটো কেটে ফেললাম।
চমকে আরেকটা চিৎকার দিল সে। গলা ভেঙ্গে গেছে। এটা হল একটা ভাঙ্গা গলার চিৎকার।
.
পরমুহূর্তে একটা ধাক্কা দিলাম। একটু জোরেই।
ধাক্কা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাথরুম থেকে বের হয়ে এসেছি।
.
ছলাত করে শব্দ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এসিডের যে ফোঁটাগুলো ছিটকে বের হল, তারা আমার শরীরটা নাগালে পেল না।
শিস বাজাতে বাজাতে এগিয়ে যাচ্ছি ড্রউং রুমের দিকে। কয়েক মিনিট খেলা দেখবো। আজকে ব্রাজিলের সাথে উরুগুয়ের ম্যাচ আছে।
.
পেছনে আর কোন চিৎকার শোনা যাচ্ছে না।
.

.
প্রিয়ন্তির মা আমার হাত ধরে কাঁদছে খুব। কান্না ধরে রাখতে পারছি না আমিও। বাসা ভর্তি মানুষ। একজন পুলিশও আছে। সে আমার থেকে একটু আগে ইন্টারভিউ নিয়েছে। বিষণ্ন মুখে ইন্টারভিউ দেওয়ার এক পর্যায়ে কেঁদেও ফেলেছি। সহানুভূতির দৃষ্টিতে তাকিয়েছে পুলিশ অফিসার। লোকটার নাম রায়হান। যথেষ্ট ভদ্র একজন মানুষ। বাড়ি ঢুঁড়ে আলামত খুঁজেছে বটে, তবে পায়নি কিছুই। সেজন্যও ভদ্রতা দেখাতে পারে।
.
বন্ধুদের অনেকে এসেছে। ওরা আমার ব্যাপারটা পুরোপুরিই জানে। স্কুল থেকে ওদের চোখের সামনেই তো প্রিয়ন্তির জন্য কত পাগলামি করেছি। আমাকে শক্ত হতে বলছে কেউ। সাহস যোগাচ্ছে। কেউ কেউ প্রিয়ন্তিকে খুঁজে এনে দেওয়ার প্রতিজ্ঞা করছে। কেউ কেউ উদাহরণ দিচ্ছে আরও অনেকের। যারা এমন পরিস্থিতিতে পড়েছিল কিন্তু পরে সংসার করেছে বহুদিন, সুখে।
আমি তাদের কথা শোনার ভান করে যাচ্ছি।
.
বৃষ্টি পড়ছে।
রাস্তায় নেমে একটা সিগারেট ধরাল রায়হান।
ওপরতলার ভদ্রলোকের জন্য মায়া হচ্ছে তার। লোকটা একেবারে সহজ সরল। ক্লাস সিক্স থেকে নাকি মেয়েটার পেছনে পড়ে ছিল। এ যুগে কয়জন করে?
.
হতাশায় মাথা নাড়ল রায়হান।
সহজ সরল হবে এতে আশ্চর্যের কি?
সহজ সরল মানুষ ছাড়া আর কার বউ পুরানো প্রেমিকের হাত ধরে পালিয়ে যায়?
গল্পশেষে সহজ সরলেরা কদাচিৎ জেতে। এটা সেই কদাচিৎ-এর মধ্যে পড়া কোন ঘটনা না।
.
রায়হান জানত না, তার ধারণা সঠিক নয়।

~~লিখা ; আশরাফ মামুন~~

জীবনটা জয় করতেই হবে

Post ID # 007

অনেক বছর আগে , আমরা তখন সম্ভবত মাত্র এমবিবিএস থার্ড ইয়ারে উঠেছি। আমাদের এক লেকচারার ক্লাসের এক মেয়ে ব্যাচমেটকে প্রপোজ করেন এবং হুটহাট উনাদের বিয়ে হয়ে যায়।

সেই স্যার খুবই ভালো মানুষ ছিলেন , ভদ্র , বিনয়ী , সহজ সরল , নরম স্বভাবের। তাও এত সিনিয়র প্লাস স্যার হয়ে ছাত্রীকে প্রোপোজ করার ব্যপারটায় আমরা হাসাহাসি করতাম। তখন তো আমরা মাত্র থার্ড ইয়ারে পড়তাম , যা দেখি ফানেলের মাঝে দিয়ে দেখতাম , পেরিফেরাল এক জেলা শহরে এতো বড় দুনিয়া দেখার সুযোগ কোথায়???

আর যেহেতু দুষ্টু ছেলে ছিলাম , সেই স্যারের সাথে দেখা হলে ফাজলামো করতাম।

” কি স্যার , এটা কি করলেন? দুলা তো ভাই হয় , আপনি তো দুলা স্যার হয়ে গেলেন ”

স্যারও হেসে বলতেন ,
” কি এতো স্যার স্যার করিস। ভাই ডাক ভাই ”

কিন্তু কে শুনে কার কথা!

স্যার কখনও রাগ করতেন না, হাসতেন। লোকটার ব্যবহার অমায়িক বলতে যা বোঝায় ঠিক তাই ছিলো।

আমার সেই ব্যাচমেট এবং উনার বিবাহিত জীবন এতটাই সিম্পল এবং সুন্দর ছিলো যে এক সময় আমরা যারা তাদের নিয়ে মশকরা করতাম , তারাই বছর ঘুরতে না ঘুরতে সুখী দম্পতির উদাহরণ দিতাম তাদের দাম্পত্য জীবনকে।

এর মাঝে তাদের একটি ফুটফুটে মেয়ে হলো। সিম্পলি হ্যাপি ফ্যামিলি বলতে যা বুঝায়।

এভাবেই কেটে যাচ্ছিলো দিনগুলো।

তো আমাদের তখন ইন্টার্নশীপ শেষ। একদিন হুট করে শুনলাম সেই স্যার এক্সিডেন্ট করেছেন।
স্যার সাইকেল চালিয়ে হাসপাতালে আসতেন। মেডিকেলের জাস্ট গেইটটা হলো হাইওয়ের উপর। সেই গেইটের সামনে একটি ট্রাক স্যারের সাইকেলটাকে মেরে দেয়।

সাথে সাথে স্যারকে হাসপাতালে নেয়া হয় , হেড ইঞ্জুরী বুঝতে পেরে এয়ার এম্বুলেন্স ডেকে ঢাকা রেফার করা হয়।

কিন্তু অনেক চেষ্টার পরও স্যারকে বাচানো যায়নি। হাসপাতালেই স্যার মৃত্যুবরণ করেন।

স্যারের মৃত্যুর পর আমরা খুব ভয়ে ছিলাম আমাদের সেই ব্যাচমেটকে নিয়ে। মেয়েটা অনেক বেশি সেন্সেটিভ ছিলো।

আমরা ভয় পাচ্ছিলাম সে ভেঙ্গে পড়বে বা উল্টাপাল্টা কিছু করে বসতে পারে।

দিন যেতে থাকে , তাদের সন্তান বড় হতে হতে থাকে। আমার সেই বান্ধবী ছবি এডিট করে ফ্যামিলি ছবি বানাতো , স্যার , সে ও তাদের মেয়ে। বানিয়ে ছবিগুলো ফেইসবুকে দিতো।

পিচ্চি মেয়েটার বিভিন্ন বয়সে তার বাবার সাথে এডিট করা ছবি আছে , কিন্তু তার মনে বাবার কোন স্মৃতি আছে কি না আমার জানা নাই।

এসব দেখে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হতাম। কারন মেয়েটা সেই মুহূর্তটা থেকে বের হতে পারছিলো না। সহস্রাব্দ বসে ছিলো সেই একটি মুহূর্তে…

প্রত্যেকটি মানুষের ভালবাসার অভিব্যক্তি ভিন্ন ভিন্ন হয় , এটি ছিলো তার ভালবাসার অভিব্যক্তি , সত্য নিগুড় ইস্পাত কঠিন ভালবাসা।

কিন্তু আজ যখন জানতে পারলাম সে জীবনটাকে ব্যালেন্সড ভাবে সামনে নিয়ে যাচ্ছে , চাকরি করছে , ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবছে… ব্যপারটা জেনে অদ্ভুত রকমের একটা স্বস্তি পেলাম।

জীবন মানুষকে সব শিখিয়ে দেয় এবং জীবনে সব নিয়েই এগিয়ে চলতে হয়।

এটা আপনার উপর নির্ভর করবে যে আপনি আপনার কষ্টগুলোকে দূর্বলতা ভাবেন নাকি শক্তি।

আল্লাহ পৃথিবীর প্রতিটি ভালবেসে আহত হওয়া হৃদয়কে শক্তি দিক।

বেচে থাকা মানেই লড়ে যাওয়া , লড়ে যাওয়া মানেই জয়ের জন্য লড়া।

জীবনটা জয় করতেই হবে…

-কার্টেসিঃ জামান সানি

আমিইতো তার অর্ধাঙ্গিনী

Post ID # 006

আমার ফেমিলির সাথে আজ প্রায় ৪ বছর আমার কোনো যোগাযোগ নেই। কারণ আমি তাদের পছন্দ করা ছেলেকেই বিয়ে করেছি!!!!
কি কিছু বুঝতে পারছেন না?
আচ্ছা খুলেই বলি।
২০০৮ সাল। আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়ন কালে পারিবারিক ভাবে আমার বিয়ের জন্য একটা ছেলে দেখা হয়। নাম শাহেদ, ঢাকায় ব্যাবসা করে।
যাইহোক একদিন বিকেলবেলা আমাদের বাসায় শাহেদ, তার মা বাবা, দুলাভাই সহ বেশকিছু মেহমান আসল। প্রত্যেকটা মেয়ের জিবনে এটাই স্বাভাবিক।
শাড়ি পরিয়ে আমাকে তাদের সামনে আনা হল। পাত্র / পাত্রী দেখতে আসলে যা হয় আর কি তা বর্ননা দেয়ার কিছু নাই। অবশেষে আমার হাতে ৬টা ৫০০ টাকার নোট গুঁজে দিয়ে শাহেদের আম্মা আমাকে বিদায় দিল।
মেয়ে তাদের পছন্দ হয়েছে। অবশেষে কথাবার্তা। আমি তখন অনার্স ২য় বর্ষের ছাত্রী। যেহেতু শাহেদ BCS করা ছিল তাই তার ইচ্ছা ছিল তার বউ নুন্যতম অনার্স পাশ হোক। সবার সম্মতিক্রমে বিয়ে ২ বছর পিছানো হল।
এরি মধ্যে শাহেদের সাথে আমার আলাপ চারিতা শুরু হয়ে গেল।
🙂 জানো নিধি তোমাকে আমার কেন এত পছন্দ হয়েছে?
:@- না!
🙂 তোমার ওই গেজ দাঁতটাত কারনে। জানো তুমি যখন হাসো তখন ওই দাঁত টা তোমার সৌন্দর্য কে আরো হাজার গুন বাড়িয়ে দেয়।
:@- তাই?
শাহেদের সাথে আমার ও কথা বলতে তেমিন আপত্তি ছিল না। কারন কিছু দিন পর যার সাথে আমার বিয়ে তাকে এখন থেকেই বুঝা দরকার। ১ বছরের মাথায় আমাদের আর পায় কে? গভীর প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছি দুজন। অবশ্য আমাদের দুইজনের ফেমিলির বিষয় টা জানা ছিল।
শাহেদ মাঝেমাঝে ঢাকা থেকে রাজশাহী তে আসতো আমার সাথে দেখা করতে।
২০১০ সালের এপ্রিল এর ১৯ তারিখ রাজশাহী আসার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় ১টা পা হারায় শাহেদ।
আমার পরিবার থেকে সরাসরি আমাদের বিয়ের বিষয় টা মানা করে দেওয়া হল। শাহেদ ও আমাকে ফোন করে বলেছিল যে :-
নিধি যদি তুমি চাও তবে সরে যেতে পারো, বিশ্বাস কর আমি একটু ও কষ্ট পাবো না।
আমার ফাইনার পরিক্ষার আগ পর্যন্ত প্রায় ৬ মাস শাহেদের সাথে আমার আর যোগাযোগ হয়নি। সে ও আমাকে ফোন করেনি, ভেবেছিলাম যে ছেলে ১মিনিট আমার সাথে কথা না বলে থাকতে পারতো না সে ৬ মাস কেমনে আছে?
আমি যে বুঝিনা তা নয়।
যাই হোক ডিসেম্বরের ৪ তারিখ আমার পরিক্ষা শেষ হল।
সে দিন বিকেলেই আমি সরাসরি শাহেদের বাসায় গিয়ে উঠলাম।
কেরাস হাতে বারান্দায় দাড়িয়ে ছবি আকছে সে,
গেজ দাঁত ওয়ালা ১টা মেয়ে মুখ আর সে মুখ নিধির ছাড়া আর কারো নয়।
আজ ৪ বছর আমাদের বিয়ে হয়েছে,
শাহেদের হয়তো একটা অঙ্গ নেই, তাতে কি আমি তো আছি,
আমিইতো তার অর্ধাঙ্গিনী।

​অতঃপর আমি বিবাহিত

Post ID # 002

৫ দিন হল দেশে আসলাম। মাত্র ২৫ দিন এর জন্য আসা। তাও আসতাম না যদি না আব্বু বলত তোমার আম্মু অসুস্থ।
কিন্তু আসার পর দেখলাম আম্মু পুরাই সুস্থ। আর আমাকে দেশে আনানোর বড় কারণ হচ্ছে বিয়ে। মানে আমার নাকি বিয়ের বয়স হইছে তাই।

আজ আব্বু আম্মু মেয়ে দেখতে গেছে। বিয়ের দিনও পাকা করে আসছে। মোটকথা মেয়ে তাদের আগেই পচন্দ করা।
আমি কিছুই বলিনি কারণ বলেও লাভ হবে না।আব্বু যেখানে আমি সেখানে নাই। তাই রাজি হতেই হল।Read More »